দেশ ও রাজনীতি
‘কারিডোরে’ পৃথিবী জুড়ছে পথ, আমরা খুঁজছি দিশা
পৃথিবীর মানচিত্র মেলে ধরলে এখন মনে হয়, বড়সড় একটি বাড়িতে মেরামতের কাজ চলছে। কেউ পাহাড় কেটে রেল বসাচ্ছে, কেউ মরুভূমিতে সড়ক টানছে, কেউ বন্দরের সঙ্গে বন্দর জুড়ছে। চীন ইউরোপে পৌঁছানোর পথ বাড়াচ্ছে, ভারত আরব উপদ্বীপ হয়ে পশ্চিমে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। কাজাখস্তান, তুরস্ক, লাওস—সবাই নিজের উঠান দিয়ে বাণিজ্যের চলাচল বাড়াতে ব্যস্ত। বাংলাদেশ বসে আছে এমন এক মোড়ে, যার চারদিকে সম্ভাবনা। শুধু আমাদের যাত্রার ঠিকানাটি এখনও পরিষ্কার নয়।
প্রাচ্য থেকে বিউপনিবেশায়নের যুগে শিক্ষকদের মর্যাদার প্রশ্ন
গুরু থেকে এআই শিক্ষার এক ধারাবাহিক বিবর্তন সমাজকে এক কঠিন প্রশ্নের মুখে দ্বার করিয়ে রেখেছে। মানুষ নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে, শিক্ষা-শিক্ষকের সম্পর্ক কিভাবে কাজ করে? শিক্ষার সংজ্ঞা কি তথ্যের অবাধ প্রবাহ-স্বশিক্ষা-সুশিক্ষা? নাকি তথ্য মুখস্থের সংকলন আয়ত্তে রাখাই মেধাবীর চূড়ান্ত মাপকাঠি?
বাংলাদেশের প্রতিটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন ‘রিলায়াবিলিটি ইঞ্জিনিয়ারিং’ পড়ানো উচিত
বাংলাদেশ প্রতি বছর হাজার হাজার প্রকৌশলী তৈরি করে। কিন্তু দেশের উন্নতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রশ্ন তাদের খুব কমই শেখানো হয়—আর তা হলো: গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাগুলো যাতে নষ্ট না হয়, সেটা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়?
গণতন্ত্রের পায়ের কাছে গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকে আফগান উদ্বাস্তু জীবন
দিনটি ছিল ১৬ আগস্ট ২০২১। তার আগের দিন তালেবান কাবুল দখল করেছে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের শেষ অধ্যায় তখনও চলছে। কাবুলের হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সেদিন যে দৃশ্য তৈরি হয়েছিল, সেটিকে শুধু বিশৃঙ্খলা বললে সম্ভবত কম বলা হয়। সেটি ছিল একটি দেশের মানুষের হঠাৎ বুঝতে পারা—নিজের মাটিতেও আর নিরাপদ থাকার নিশ্চয়তা নেই।
নেপালের দুর্যোগ-কূটনীতি: হিমালয়ের বিপর্যয় কেন রাজনৈতিক লড়াইয়ের মঞ্চ
২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে একটি বিশাল হিমবাহ ও শিলাধসের ফলে সৃষ্ট পানির স্রোত ভুটেকোশি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকা দিয়ে নেমে আসে। মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে যায় বহু গ্রাম, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং চীনের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ গিরং সীমান্ত ক্রসিং। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পর নেপালে মৃতের সংখ্যা ১,৩০০ ছাড়িয়েছে, নিখোঁজ রয়েছেন আরও কয়েক হাজার মানুষ। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে প্রায় ৯,০০০ মানুষের মৃত্যুর পর এটিই দেশটির সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ। তবে এই মানবিক বিপর্যয়ের বাইরেও বন্যাটি নেপালের ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং সদ্য ক্ষমতায় আসা একটি অনভিজ্ঞ সরকারের জনমত ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের সামনে ভূগোলের নতুন পাঠ
পৃথিবী এখন বড়ই অস্থির। চারদিকে যুদ্ধের দামামা, শক্তির নতুন বিন্যাস, পুরোনো মানচিত্রে নতুন করে ঘষামাজা। মানচিত্রেরও একটি নীরব ভাষা আছে। শান্তির সময়ে যে মরুভূমি, পাহাড় কিংবা স্থলবেষ্টিত অঞ্চলকে নিছক কয়েকটি রঙের খোপ বলে মনে হয়, যুদ্ধ শুরু হলেই তার দাম নতুন করে নির্ধারিত হয়। তখন একটি বন্দর আর শুধু বন্দর থাকে না, রেললাইন হয়ে ওঠে কৌশলগত সম্পদ, একটি প্রণালি হয়ে ওঠে বিশ্বের জ্বালানি-শিরা, আর প্রতিবেশী রাষ্ট্র কখনো বাজার, কখনো করিডর, কখনো নিরাপত্তার ঢাল।
ইয়াসমিন ট্র্যাজেডির ৩০ বছর
ইয়াসমিন হত্যার তিন দশক পেরিয়েও যে সংকটের বিরুদ্ধে দিনাজপুর রুখে দাঁড়িয়েছিল, তা নিঃশেষ হয়নি; বরং কোনো কোনো দিক থেকে তা আরও ভয়ংকর মুখ নিয়ে সামনে এসেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ‘নারী ও কন্যা নির্যাতন: ২০২৫ সমীক্ষা’-র একটি তথ্য বিশেষভাবে হৃদয় কাঁপিয়ে দেয়: এই সমীক্ষা অনুযায়ী, ধর্ষণের শিকার কন্যাশিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ছয় থেকে নয় বছর বয়সীরা। যে বয়সে শিশুর কোলে থাকার কথা পুতুল, সেই বয়সেই সে হয়ে উঠছে পাশবিকতার শিকার, এর চেয়ে গভীর সামাজিক লজ্জা আর হয় না। সংগঠনটির সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, ২০২৬ সালের কেবল প্রথম পাঁচ মাসেই (জানুয়ারি থেকে মে) ১ হাজার ৩৫ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৫০ জন ধর্ষণ, ৬৫ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং ১৮ জন ধর্ষণের পর হত্যার শিকার। আর এই সংখ্যা কেবল সংবাদপত্রে প্রকাশিত ঘটনার; অভিযোগহীন, চাপা পড়ে থাকা ঘটনার প্রকৃত সংখ্যা যে এর বহু গুণ, তা সহজেই অনুমেয়।
সমুদ্রের বুকে বন্দর, দিগন্তে শক্তির ছায়া
য়তনে বিশাল কিন্তু স্বভাবে শান্ত। ভারত মহাসাগরকে দূর থেকে দেখলে এমনটাই মনে হয়। নীল জল। দীর্ঘ নৌপথ। সারি সারি বাণিজ্যিক জাহাজ। কিন্তু গত এক দশকে দৃশ্যটি বদলেছে। সমুদ্রের চারদিকে শুরু হয়েছে বড় বড় নির্মাণকাজ। কোথাও গভীর সমুদ্রবন্দর। কোথাও দীর্ঘ রানওয়ে। কোথাও সামরিক ঘাঁটি। সরকারি ভাষায় এগুলো বাণিজ্য, যোগাযোগ ও নিরাপত্তার প্রকল্প। তবে বন্দর নির্মাণের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত হিসাবও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
ইয়াসমিন ট্র্যাজেডির ৩০ বছর
১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট, ভোর। দিনাজপুর শহরের রানীগঞ্জ মোড়ে ব্র্যাক অফিসের সামনে রাস্তার ধারে পড়ে ছিল এক কিশোরীর নিথর, রক্তাক্ত দেহ। তার নাম ইয়াসমিন আক্তার। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য বিবরণ অনুযায়ী তার বয়স ছিল মাত্র চৌদ্দ বছর। এই বয়সে যে মেয়েটির হাতে থাকার কথা ছিল পাঠ্যবই, ভোরের আলোয় তার নিথর দেহ পড়ে রইল শহরের রাস্তায়। ঢাকার এক বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করত সে; আগের দিন বাসে চেপে মায়ের কাছে ফিরছিল দিনাজপুরে। বাড়ি সে ফিরেছিল ঠিকই, কিন্তু মায়ের বুকে নয়, শহরের রাস্তায় একটি লাশ হয়ে।
একাত্তরের কালোছায়া বেলুচিস্তানে: মানচিত্র বদলায়, কৌশল বদলায় না
পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে ‘শান্তি’ শব্দটির একটি অস্বস্তিকর অতীত আছে। দেশটির রাজনীতিতে নির্বাচন হয়, সংসদ বসে, প্রধানমন্ত্রী শপথ নেন; কিন্তু ক্ষমতার পাশেই অদৃশ্য এক কাঁচের চেয়ারে বসে থাকে দেশটির সামরিক বাহিনীর প্রধান যিনি ক্ষমতার দিক থেকে দেশটির নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও শক্তিশালী। আর যখন কেন্দ্রের সঙ্গে কোনো প্রান্তের রাজনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ে, তখন কথোপকথনের জায়গা খুব দ্রুত দখল করে নেয় নিরাপত্তার ভাষা। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে আমরা এই ভাষা শুনেছি, দেখেছিও। এখন পাকিস্তানের পশ্চিম প্রান্তের বেলুচিস্তানের দিকে তাকালে সেই পুরোনো অভিধানের কয়েকটি পাতাই যেনো সবার সামনে খুলে যায়।