কেন দিনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় পাঠাচ্ছে দিল্লী?
দিনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় আসছেন। এই খবরে বেশ কৌতূহল, উত্তেজনা ঢাকার কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে। ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে অনেকেই এসেছেন, ভবিষ্যতেও অনেকে আসবেন। কিন্তু দিনেশ ত্রিবেদী দায়িত্ব গ্রহণের আগেই এখন পর্যন্ত ঢাকায় দায়িত্ব পালন করা ভারতের হাইকমিশনারদের মধ্যে ‘অনন্য’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। কারণ তিনি পেশাদার কূটনীতিক নন, কোনও উচ্চপদস্থ আমলাও নন, বরং ভারতের রাজনীতির মাঠের শীর্ষ পর্যায়ের একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি এর আগে লোকসভার সদস্য ছিলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। আবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেসেরও প্রথম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। অতএব কেন এ ধরনের একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকে দিল্লী থেকে ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে, তা নিয়ে কৌতূহল কিংবা প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
দিনেশ ত্রিবেদীর রাজনৈতিক জীবন বড় বৈচিত্র্যময়। আশির দশকে ভারতীয় কংগ্রেসের কর্মী ও নেতা হিসেবে তার রাজনীতিতে হাতে খড়ি। এরপর ১৯৮৮ সালে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং বা ভিপি সিং এর জনতা পার্টিতে যোগ দিয়ে গুজরাটের একটি আসন থেকে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন ১৯৯০ সালে। এরপর ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস গঠিত হলে তিনি সেখানে যোগ দিয়ে প্রথম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এখানে বলে রাখা ভাল দিনেশ ত্রিবেদী গুজরাটি বংশোদ্ভুত হলেও তার জন্ম নয়া দিল্লীতে এবং তিনি বেড়ে উঠেছেন কলকাতায়। এ কারণে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়ে ২০০৯ সালের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুর থেকে লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হতে তাকে খুব বেশী কষ্ট করতে হয়নি। তৃণমূল কংগ্রেস সেবার জাতীয় নির্বাচনে মনমোমহন সিং এর নেতৃত্বাধীন ইউপিএ (ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স) জোটে যোগ দিয়েছিল। ২০১১ সালে ইউপিএ সরকারের কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে মমতা বন্দোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করলে দিনেশ ত্রিবেদী তার স্থলাভিষিক্ত হন। তবে তিনি খুব বেশীদিন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকতে পারেননি। রেলের ভাড়া নিয়ে মতভেদের কারণে দলের চাপে তাকে কয়েক মাস পরই রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হয় এবং তৃণমূল কংগ্রেসের আরেক প্রভাবশালী নেতা মুকুল বোস সেই দায়িত্ব পান।
২০২১ সালে দিনেশ ত্রিবেদী যোগ দেন ক্ষমতাসীন বিজেপিতে। আরও আগে থেকেই তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০১৮ সাল থেকেই কানাঘুষা ছিল দিনেশ ত্রিবেদী তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যাচ্ছেন। ২০২১ সালে সেটা বাস্তবে পরিণত হয়। এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, পেশাদার কূটনীতিকের বদলে কেন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ? বিশেষ করে এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যিনি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারে নেতৃত্ব দেওয়া চারটি রজনৈতিক দলের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে যুক্ত থেকেছেন। কোন প্রেক্ষাপটে নিজের ঘনিষ্ঠ একজন রাজনৈতিক নেতাকে ঢাকায় পাঠাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি?
আমরা সবাই জানি, একজন পেশাদার কূটনীতিক বা আমলাকে দায়িত্ব পালন করতে হয় সুনির্দিষ্ট বিধিমালার ভেতরে থেকে। একজন আমলা চাইলেও সেই বিধিমালার সীমারেখা ভাঙ্গতে পারেন না। যেমন ধরুন যুগ্ম-সচিব পদমর্যাদার কেউ ভারতের হাইকমিশনার হলেন এবং তিনি পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে দেখা করলেন। তাদের আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিষয়ক কোন একটি প্রস্তাব আসল। সেই প্রস্তাব কয়েক স্তর পার হয়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাবে এবং এর জন্য এক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসও লাগতে পারে। কিন্তু দিনেশ ত্রিবেদীর মত একজন সিনিয়র রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সম্পর্ক রয়েছে। ফলে হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নিলেও দিনেশে ত্রিবেদী বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের যে কোন বিষয় সরাসরি তার দেশের প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে পারবেন এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াও সম্ভব হবে।
দিনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগের পর থেকে ভারতের একাধিক গণমাধ্যমে খবর এসেছে যে দিনেশ ত্রিবেদী দীর্ঘদিন ধরেই নিয়মিত লন্ডনে যাওয়া আসা করেন। সেই সুবাদে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার এক ধরনের ঘনিষ্ঠ এবং পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ফলে যে কোন ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও তিনি সরাসারি কথা বলতে পারবেন। সম্ভবত, তারেক রহমান এবং নরেন্দ্র মোদি-দুই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও দিনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকার হাইকমিশনার হিসেবে মনোনীত করার নেপথ্যে বড় একটি কারণ। এটা দুই দেশের সম্পর্কন্নোয়নে নিঃসন্দেহে বড় সুযোগ সৃষ্টি করবে।
আমরা জানি ড. মুহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ক্রমাগত শীতল হয়েছে। যেহেতু আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি সরকারের সুসম্পর্ক ছিল এবং ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতেই আশ্রয় নেন, সে কারণে ড. ইউনূস সরকারের সঙ্গে শুরুতেই সম্পর্ক ভাল হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু একটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৃহত্তম এবং নিকটবর্তী প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার সেটাও ড. ইউনূস সরকারকে নিতে দেখা যায়নি। বরং সরকারের কোন কোন উপদেষ্টা, সরকারঘনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবী বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানের সমন্বয়কদের কাউকে কাউকে ভারতবিরোধী লাগামহীন ও উদ্ভট বক্তব্য দিতে দেখা গেছে যা দুই দেশের সম্পর্ককে অনেক বেশী শীতল করেছে। অন্তবর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন এক সময় পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন। তিনি অবসরে যাওয়ার পর কূটনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন এবং দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় রাজনীতি ও কূটনীতির কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ফলে তার পক্ষেও ভারতের সঙ্গে অর্থবহ দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চালানো সম্ভব ছিল না।
বরং তৌহিদ হোসেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পরও ভারতীয় বিভিন্ন নীতির বিষয়ে সমালোচনামুখর এবং পাকিস্তানের বিষয়ে অতি প্রশংসাসূচক বক্তব্য দিতে দেখা যায়। একজন পেশাদার কূটনীতিক হিসেবে কোন একটি গুরুত্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার পর কথা বলার ক্ষেত্রে কূটনৈতিক নান্দনিকতার যে সহজাত বিষয়টি থাকা দরকার, সেটা তৌহিদ হোসেনের মধ্যে যথেষ্টই আছে। কিন্তু শুধু ভারত প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলেই তাকে নান্দনিক হওয়ার বদলে একটু বেশী আবেগী হয়ে উঠতে দেখা গেছে, সেই আবেগ দুই দেশের সম্পর্কে শীতলতার বরফ না গলিয়ে বরং আরও জমাট বাঁধতেই সাহায্য করেছে, ফলে তার মেয়াদে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোনভাবেই স্বাভাবিক হয়নি ।
অথচ যে কোন যুক্তিতেই ভারতের মত বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাাবিক রাখা যে কোন সরকারের কূটনীতিতে প্রাধান্যের তালিকায় থাকা উচিত। কারণ বিশ্ব রাজনীতি এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশ। বিশ্ব অর্থনীতিতে পাঁচ নম্বর দেশ। আমরা অবশ্যই আমাদের আত্মমর্যাদাকে সমুন্নত রেখে, নিজস্ব স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার কথা বিবেচনা করব। কিন্তু নিকটতম প্রতিবেশীর সঙ্গে বড় ধরনের বৈরিতার সম্পর্ক কি কোন সরকারের জন্যই গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে? পাশের ঘরের প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক যতই অম্ল-মধুর হোক না কেন, যে কোন সংকটে প্রথম প্রতিবেশীকেই এগিয়ে আসতে হয় কিংবা প্রতিবেশীর কাছেই যেতে হয়, এটাই মানব সভ্যতার শাশ্বত রীতি। এইতো জটিল জ্বালানি সংকটের সময়ও সবার আগে প্রতিবেশী ভারতকেই পাশে পাওয়া গেছে। এটাই নিদারুণ বাস্তবতা। আবেগকে বাস্তবতার উপরে স্থান দিয়ে কখনই কূটনীতিতে সাফল্য আসে না।
ড. মুহম্মদ ইউনূস সরকারের আমলে বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য ভারত সরকার ভিসা সীমিত করার যে নীতি নিয়েছিল, তার ফলে বাংলাদেশের নাগরিকদের যথেষ্ট সংকটে পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে যাদেরকে চিকিৎসা ও ব্যবসার প্রয়োজনে নিয়মিত ভারতে যেতে হয়, তাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ইউরোপের অনেক দেশের ভিসা সেন্টার ভারতে। ফলে শিক্ষার্থীসহ নানা প্রয়োজনে অনেকের সামনে জরুরি গুরুত্ব থাকলেও তারা ইউরোপের অনেক দেশে যেতে পারেননি। এর নেতিবাচত প্রভাব ইউরোপে বৈধভাবে জনশক্তি রপ্তানির উপরও প্রভাব পড়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়াসহ ইউরোপের যেসব দেশে ভারতের এয়ারলাইন্স ব্যবহার করে কম খরচে যাওয়ার যে সুযোগ ছিল, সেটাও বন্ধ হয়ে যায়। সম্পর্কের শীতলতার জন্য হয়ত ভারতেরও ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু অর্থনীতির কোন সূচকেই কি তা বাংলাদেশের চেয়ে বেশী হওয়া সম্ভব? অথচ অন্তবর্তী সরকারের আমলে বুদ্ধিজীবী তকমাধারী কেউ কেউ ভারতের ব্যাপক ক্ষতির হিসেব করেছে খুবই হাস্যকরভাবে।
এ ধরনের একটি প্রেক্ষাপটে দিনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কন্নোয়নে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘ দিনের ঝুলে থাকা তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদন এবং গঙ্গা চুক্তি নবায়ন করার বিষয়টি এ সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ দু’টির জন্যই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কারণ এক সময়ের মমতা বন্দোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ এবং বর্তমানে নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ দিনেশ ত্রিবেদীর পক্ষেই এ দু’টি চুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর সেতুবন্ধন হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব।
বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় পারদর্শী দিনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশ সীমান্তের খুব কাছে ব্যারাকপুর থেকে লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ফলে তিনি এই সীমান্ত সংকটগুলো ভালে করে জানেন। দু’দেশের সীমান্ত ঘিরে কী ধরনের সংকট আছে, সেসব সংকট মোকাবিলায় কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে, সেটা একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে দিনেশ ত্রিবেদী খুব ভাল করেই জানেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে শীতলতা কাটাতে ইতিবাচক উদ্যেগ নিতে দেখা গেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সাম্প্রতিক ভারত সফরই তার প্রমাণ। আমরা আশা করি পারস্পরিক ইতিবাচক মনোভাবের মধ্য দিয়ে নিকটতম দুই প্রতিবেশীর পরীক্ষিত সম্পর্ক আবারও উষ্ণতা পাবে, দুই দেশের জনগণই উপকৃত হবে।
রাশেদ মেহেদী: সম্পাদক, ভিউজ বাংলাদেশ

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে