Views Bangladesh Logo

দুধের শিশু থেকে ৬ বছরের শিশু: কারাগারে নিরপরাধ শৈশব

দালতের বারান্দায় একজন মা তার ৪৬ দিনের শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন। চারদিকে আইনজীবীদের আনাগোনা, পুলিশের পায়চারি, মামলার কাগজপত্রের ব্যস্ততা। সেই ব্যস্ততার মাঝে একটু পরেই ওই মাকে— সেই দুধের শিশুসহ — হাজতখানায় নামিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি কাঁদছেন।

এই কান্না কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতার প্রকাশ নয়। এই কান্না বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি নির্মম অভিযোগপত্র।

রাজধানীর তেজগাঁও থানার বিস্ফোরক আইনের একটি মামলায় গ্রেফতার হন ঢাকা মহানগর উত্তর যুব মহিলা লীগের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের নেত্রী শিল্পী বেগম। তার বিরুদ্ধে রয়েছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের এক কর্মীর বাড়িতে সশস্ত্র হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ। সেই অভিযোগ সত্যি হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সেটা বিবেকবান মাত্রই বলবে।

কিন্তু শিল্পী বেগমের দেড় মাসের কন্যাসন্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী? সেই শিশু কি হামলায় অংশ নিয়েছিল? সে কি কারো বাড়িতে ভাঙচুর করেছিল? না। সে কেবল জন্ম নিয়েছিল। এবং সেই ‘অপরাধে’ তাকে কারাগারে যেতে হয়েছে।

আদালতে তদন্ত কর্মকর্তা শিল্পী বেগমকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানান। তার আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি মানবিক বিবেচনায় জামিন চেয়ে বলেছিলেন, আসামির দেড় মাসের কন্যাসন্তান রয়েছে, তার অস্ত্রোপচার হয়েছে, যেকোনো শর্তে জামিন প্রার্থনা করছি। প্রথমে সেই আবেদন নামঞ্জুর হয়। মা ও শিশু— দুজনেই চলে যান কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে। পরে অবশ্য জামিন মিলেছে, মুক্তিও পেয়েছেন। কিন্তু প্রশ্নটা থেকে যাচ্ছে— প্রথমে জামিন নামঞ্জুর হয়েছিল কেন? একটি দেড় মাসের শিশুকে কারাগারে পাঠানোর আগে কি একবারও ভাবা হয়েছিল?

তেজগাঁওয়ের এই ঘটনার কিছুদিন আগেও কক্সবাজারের উখিয়ায় ঘটলো আরেকটি ঘটনা— যা পড়তে গিয়ে শরীর শিউরে ওঠে।

উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের শেখপাড়ায় এক রাতে পুলিশি অভিযান চালানো হয়। এক আসামি হাতকড়া পরা অবস্থায় পালিয়ে গেছেন— এই অভিযোগে পুলিশ তার বাড়িতে হানা দেয় এবং গ্রেফতার করে পরিবারের সদস্যদের। গ্রেফতার হন একজন ৭৫ বছরের বৃদ্ধ, দুই গৃহবধূ— এবং মাত্র ছয় বছরের একটি শিশু।

একটু ভাবুন। হাতকড়া পরা একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে পালাতে সাহায্য করেছে একটি ছয় বছরের শিশু— এই অভিযোগ কি কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ করতে পারেন? এই যুক্তি কি কোনো সভ্য দেশের আদালতে এক মিনিটও টিকবে? না। কিন্তু শিশুটি তো ততক্ষণে কারাগারে চলে গেছে। যুক্তি পরে, কারাগার আগে— এটাই কি এখন আমাদের আইনের নীতি?

পুলিশ বলছে, শিশুটিকে ‘আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার করা হয়নি।’ তার মা নাকি ‘স্বেচ্ছায়’ তাকে সঙ্গে নিয়েছেন। এই ভাষ্য কি সত্যি মানা যায়? মাকে গ্রেফতার করো, তারপর বলো শিশু ‘স্বেচ্ছায়’ কারাগারে গেছে। একজন মায়ের পক্ষে কি সম্ভব তার ছয় বছরের সন্তানকে রাস্তায় ফেলে রেখে কারাগারে যাওয়া? রাষ্ট্র এই অসম্ভব পরিস্থিতি তৈরি করে, তারপর বলে মা ‘স্বেচ্ছায়’ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটি রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার সবচেয়ে ভদ্র ভাষা।

ভিউজ বাংলাদেশের এক প্রতিবেদনে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল সরাসরি বলেছেন, ‘বাস্তব পরিস্থিতিতে একজন মায়ের পক্ষে সন্তানকে ফেলে যাওয়া সম্ভব নয়, ফলে এটিকে স্বেচ্ছায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বলা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’

স্থানীয়রা বলছেন ভিন্ন কথা— আসামি পালানোর ‘খেসারত’ দিতেই নিরীহ পরিবারকে আটক করা হয়েছে। এটি আইনের প্রয়োগ নয়, এটি প্রতিশোধ। এবং এই প্রতিশোধের আগুনে পুড়েছে একটি ছয় বছরের শিশুর শৈশব।

এবার আইনের কথায় আসি। কারণ যারা বলবেন ‘আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে’— তাদের জন্য আইনই বলুক। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ বলছে, আইন অনুযায়ী ব্যবহার পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। ৩২ অনুচ্ছেদ বলছে, আইনের আশ্রয় ছাড়া কাউকে ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। ৩৫ অনুচ্ছেদ বলছে, কাউকে নির্যাতনের শিকার করা যাবে না।

ফৌজদারি আইনের সবচেয়ে মৌলিক নীতি হলো— একজন মানুষ কেবল তার নিজের কৃত অপরাধের জন্য দায়ী, তার পরিবারের অপরাধের জন্য নয়। এই নীতি কেবল বাংলাদেশের নয়, সমগ্র সভ্য পৃথিবীর।

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে। সেই সনদের ৩ অনুচ্ছেদ বলছে, শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব। ৩৭ অনুচ্ছেদ বলছে, কোনো শিশুকে নির্যাতন বা অমানবিক পরিবেশে রাখা যাবে না এবং কারাবাস হবে একেবারে শেষ বিকল্প। বাংলাদেশের শিশু আইন ২০১৩ বলছে, শিশুকে প্রাপ্তবয়স্কদের কারাগারে রাখা যাবে না।

এই আইনগুলো কি কেবল কাগজে লেখার জন্য? নাকি এগুলো মানার কথাও আছে?
ভিউজ বাংলাদেশের এক প্রতিবেদনে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় তার পরিবারের ওপর চাপানো বাংলাদেশের সংবিধান ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যদি কেউ সরাসরি অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ না থাকে, তাহলে তাকে গ্রেফতার করা সম্পূর্ণ বেআইনি।’ আর সিনিয়র আইনজীবী ওমর ফারুক বলেছেন, ‘একজন আসামি পালিয়ে গেলে তার পরিবারের সদস্যদের গ্রেফতার করা একটি প্রতিশোধমূলক আচরণ, যা আইনের শাসনের সঙ্গে যায় না।’

আইনজ্ঞরা বলছেন। সংবিধান বলছে। আন্তর্জাতিক সনদ বলছে। তবু শিশু কারাগারে যাচ্ছে। তাহলে কি আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে যে এই রাষ্ট্রে আইন আছে, কিন্তু আইনের শাসন নেই?

একটু ভাবি সেই শিশুদের কথা
তেজগাঁওয়ের দেড় মাসের শিশুটির কথা ভাবুন। এই বয়সে একটি শিশুর কী দরকার? মায়ের বুকের দুধ— যা তার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। নিরাপদ ঘুম— যার ওপর নির্ভর করে তার মস্তিষ্কের বিকাশ। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ— কারণ এই বয়সে যেকোনো সংক্রমণ প্রাণঘাতী হতে পারে। সময়মতো টিকা। নিয়মিত শিশুবিশেষজ্ঞের পরামর্শ।

আমাদের কারাগারে এর কোনটি নিশ্চিত? যে কারাগারে বন্দি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যই ন্যূনতম চিকিৎসা নেই, পরিষ্কার পানির সংকট আছে, গাদাগাদি ভিড় আছে, সংক্রামক রোগের ঝুঁকি আছে— সেই কারাগারে একটি দেড় মাসের শিশু কীভাবে সুস্থ থাকবে? প্রতিটি মুহূর্ত সেই শিশুর জন্য ছিল একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি। একটি বিপদ।

এবার উখিয়ার ছয় বছরের শিশুর কথা ভাবুন। ছয় বছর বয়স মানে স্কুলের প্রথম বছর। নতুন বন্ধু খোঁজার বয়স। মাঠে দৌড়ানোর বয়স। পৃথিবীকে বিস্ময় দিয়ে দেখার বয়স। এই বয়সে সে দেখেছে পুলিশের অভিযান, পরিবারের কান্না, কারাগারের দরজা।

মনোবিজ্ঞান বলছে, শৈশবে এই ধরনের ট্রমা— যাকে বলা হয় Adverse Childhood Experience বা ACE — মানুষকে সারাজীবন তাড়া করে। এই অভিজ্ঞতা উদ্বেগ, বিষণ্নতা, আস্থাহীনতা ও সম্পর্কের সমস্যা তৈরি করে। রাষ্ট্র এই শিশুর মনে যে ক্ষত তৈরি করল, তা হয়তো কখনো পুরোপুরি সারবে না।

এই ক্ষতির দায় কে নেবে? তদন্ত কর্মকর্তা? আদালত? সরকার? নাকি কেউ নয়— কারণ এটাকে বলা হবে ‘প্রক্রিয়া’।

বিকল্প কি ছিল না?
তেজগাঁওয়ের ঘটনায়— কঠোর শর্তে জামিন দেওয়া যেত। গৃহবন্দিত্বের আদেশ দেওয়া যেত। নিয়মিত থানায় হাজিরার শর্ত দেওয়া যেত। পাসপোর্ট জমা নেওয়া যেত। এর যেকোনো একটি করলেও শিশুটিকে কারাগারে যেতে হতো না। বহু মামলায়, এমনকি গুরুতর অভিযোগের মামলায়ও এই বিকল্পগুলো ব্যবহার করা হয়। তাহলে এখানে হলো না কেন?

উখিয়ার ঘটনায়— পরিবারের বিরুদ্ধে সহায়তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কী ছিল? ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল বলেছেন, ‘পুলিশ যদি দাবি করে যে পরিবারের সদস্যরা আসামিকে পালাতে সহায়তা করেছে, তাহলে সেই অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকতে হবে। শুধু মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হলে তা আদালতে টিকবে না।’ আর শিশুর ক্ষেত্রে— আদালতের মাধ্যমে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যেত। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে শিশুকে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা যেত।

বিকল্প ছিল। কিন্তু বিকল্প খোঁজার চেষ্টা হয়নি। কারণ মানবিক বিবেচনা এখানে ‘প্রক্রিয়া’র চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি।

আর সদ্যপ্রসূতি মায়ের শারীরিক অবস্থায় একজন নারীকে কারাগারে পাঠানো মানে তার শরীরকে শাস্তির যন্ত্রে পরিণত করা। নারী ও শিশু অধিকার সনদ, CEDAW এবং বাংলাদেশের নারী উন্নয়ন নীতি— সবই বলছে নারীর শারীরিক সুরক্ষা ও মর্যাদা রক্ষা রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা। সেই বাধ্যবাধকতা কোথায় গেল?

এই দুটি ঘটনা আলাদা। প্রেক্ষাপট আলাদা, অভিযোগ আলাদা, জায়গা আলাদা। কিন্তু এই দুটি ঘটনার মধ্যে একটি ভয়ঙ্কর মিল আছে— উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র একটি শিশুকে কারাগারে পাঠিয়েছে। এবং উভয় ক্ষেত্রেই সেই শিশু কোনো অপরাধ করেনি।

এটি একটি বিপজ্জনক নজির। আজ যদি এই ঘটনাগুলো বিচারহীনভাবে মিলিয়ে যায়, আগামীকাল আরেকটি শিশু কারাগারে যাবে, এবং রাষ্ট্র বলবে — ‘এ তো আগেও হয়েছে।’ ধীরে ধীরে এটি ‘নিয়ম’ হয়ে যাবে। এবং যেদিন এটি নিয়ম হবে, সেদিন আমাদের আর কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকবে না— মুখে মানবাধিকার বলার, শিশু অধিকারের কথা বলার।

আজ যারা নিশ্চুপ থাকবেন, তাদের একটি কথা মনে রাখা দরকার— আজ অন্যের শিশু গেছে, কাল ‘প্রক্রিয়ার শিকার’ হতে পারে যেকোনো শিশু।

রাষ্ট্রের কাছে দাবিগুলো জটিল নয়, অসম্ভবও নয়
সদ্যপ্রসূতি নারী ও নবজাতকের ক্ষেত্রে কারাগারের বাইরে বিকল্প ব্যবস্থা— জামিন, গৃহবন্দিত্ব বা নিয়মিত হাজির— বাধ্যতামূলক করতে হবে। আসামির পরিবারকে চাপ দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার এই প্রতিশোধমূলক সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। শিশু আইন ২০১৩ ও জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে— কেবল কাগজে নয়, প্রতিটি থানায়, প্রতিটি আদালতে। বিচারিক ব্যবস্থাকে আইনের পাশাপাশি মানবিকও হতে হবে। এবং এই দুটি ঘটনায় যারা দায়ী, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

একটি রাষ্ট্রের সভ্যতা পরিমাপ হয় তার আকাশচুম্বী ভবন দিয়ে নয়। উন্নয়ন পরিকল্পনার পুরুত্ব দিয়ে নয়। পরিমাপ হয় তার সবচেয়ে অসহায় মানুষটির সঙ্গে রাষ্ট্রের আচরণ দিয়ে। শিশুদের প্রতি আচরণ দিয়ে।

তেজগাঁওয়ের সেই শিশুটির জীবনের প্রথম পৃথিবী-দেখা হয়েছে হাজতখানার সিঁড়ি দিয়ে। উখিয়ার সেই ছয় বছরের শিশুটির শৈশব আটকে গেছে লোহার গেটের ভেতর। এই দুটি শিশুর চোখে রাষ্ট্র এখন কী— আশ্রয়, নাকি ভয়?

এই শিশুরা কোনো দলের সদস্য নয়। কোনো মামলার আসামি নয়। এরা শুধু শিশু— যাদের রক্ষা করার দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রের। সেই দায়িত্ব রাষ্ট্র পালন করেনি।

আমরা এমন বিচার চাই না, যেখানে শিশুর কান্না আদালতের করিডোরে হারিয়ে যায়। আমরা এমন রাষ্ট্র চাই না, যেখানে নবজাতককে ‘মামলার অনুষঙ্গ’ বানানো হয়। আমরা এমন আইন চাই না, যেখানে ছয় বছরের শিশুকে ‘প্রমাণের অভাবে’ কারাগারে পাঠানো হয়, তারপর বলা হয় সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে। কারাগার অপরাধীর জন্য হতে পারে। শিশুদের জন্য নয়। কখনোই নয়।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ