আইন
ইয়াসমিন ট্র্যাজেডির ৩০ বছর
ইয়াসমিন হত্যার তিন দশক পেরিয়েও যে সংকটের বিরুদ্ধে দিনাজপুর রুখে দাঁড়িয়েছিল, তা নিঃশেষ হয়নি; বরং কোনো কোনো দিক থেকে তা আরও ভয়ংকর মুখ নিয়ে সামনে এসেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ‘নারী ও কন্যা নির্যাতন: ২০২৫ সমীক্ষা’-র একটি তথ্য বিশেষভাবে হৃদয় কাঁপিয়ে দেয়: এই সমীক্ষা অনুযায়ী, ধর্ষণের শিকার কন্যাশিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ছয় থেকে নয় বছর বয়সীরা। যে বয়সে শিশুর কোলে থাকার কথা পুতুল, সেই বয়সেই সে হয়ে উঠছে পাশবিকতার শিকার, এর চেয়ে গভীর সামাজিক লজ্জা আর হয় না। সংগঠনটির সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, ২০২৬ সালের কেবল প্রথম পাঁচ মাসেই (জানুয়ারি থেকে মে) ১ হাজার ৩৫ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৫০ জন ধর্ষণ, ৬৫ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং ১৮ জন ধর্ষণের পর হত্যার শিকার। আর এই সংখ্যা কেবল সংবাদপত্রে প্রকাশিত ঘটনার; অভিযোগহীন, চাপা পড়ে থাকা ঘটনার প্রকৃত সংখ্যা যে এর বহু গুণ, তা সহজেই অনুমেয়।
ইয়াসমিন ট্র্যাজেডির ৩০ বছর
১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট, ভোর। দিনাজপুর শহরের রানীগঞ্জ মোড়ে ব্র্যাক অফিসের সামনে রাস্তার ধারে পড়ে ছিল এক কিশোরীর নিথর, রক্তাক্ত দেহ। তার নাম ইয়াসমিন আক্তার। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য বিবরণ অনুযায়ী তার বয়স ছিল মাত্র চৌদ্দ বছর। এই বয়সে যে মেয়েটির হাতে থাকার কথা ছিল পাঠ্যবই, ভোরের আলোয় তার নিথর দেহ পড়ে রইল শহরের রাস্তায়। ঢাকার এক বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করত সে; আগের দিন বাসে চেপে মায়ের কাছে ফিরছিল দিনাজপুরে। বাড়ি সে ফিরেছিল ঠিকই, কিন্তু মায়ের বুকে নয়, শহরের রাস্তায় একটি লাশ হয়ে।
নারী অভিবাসী কর্মীদের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করুন
রেহানা আক্তার (২৬), ঢাকার কেরানীগঞ্জ মহকুমার ইব্রাহিমপুর গ্রামের একজন দরিদ্র ও তালাকপ্রাপ্তা বাংলাদেশী নারী। তার দুটি নাবালিকা কন্যাসন্তান রয়েছে। যৌতুক দিতে না পারায় স্বামীর দ্বারা তালাকপ্রাপ্ত হওয়ার পর, বেঁচে থাকার আর কোনো উপায় তিনি খুঁজে পাননি। একবার তার এক প্রতিবেশী তাকে উচ্চ বেতনের একটি আকর্ষণীয় চাকরির জন্য বিদেশে যাওয়ার পরামর্শ দেন। রেহানা তার জমি বিক্রি করে একটি এনজিও থেকে ঋণ নেন। তিনি তার প্রতিবেশীর মাধ্যমে একটি অজানা রেফারেল এজেন্সির এজেন্টকে সেই টাকা দেন। কয়েক মাস পর তিনি তথাকথিত “ফ্রি ভিসা”-র নামে গন্তব্য দেশে পাড়ি জমান।
শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হোক
একজন শিশু যখন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন শুধু তার শরীর বা মনই ক্ষতবিক্ষত হয় না; ক্ষতবিক্ষত হয় রাষ্ট্রের বিবেকও। কিন্তু সেই শিশুই যখন ন্যায়বিচারের আশায় বছরের পর বছর আদালতের সিঁড়ি ভাঙে, একই ঘটনার বর্ণনা বারবার দিতে বাধ্য হয় কিংবা অভিযুক্তের উপস্থিতিতে আতঙ্কে কুঁকড়ে যায়, তখন বিচারব্যবস্থাও অনিচ্ছাকৃতভাবে সেই নির্যাতনেরই অংশ হয়ে ওঠে। বিচার বিলম্বিত হলে শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি পিছিয়ে যায় না, একজন শিশুর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসাও বিলম্বিত হয়। তাই শিশু নির্যাতনের বিচার আর সাধারণ মামলার গতিতে চলতে পারে না।
তবে কী ফাতেমার মৃত্যুর অপেক্ষাতেই ছিল বাগেরহাট প্রশাসন?
বাগেরহাটে হযরত খান জাহান আলী (র.) মাজার সংলগ্ন দিঘিতে সাত বছরের শিশু ফাতেমা আক্তারের মৃত্যুকে শুধু একটি দুর্ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এই মৃত্যুর আগে একাধিক সতর্ক বার্তা ছিল। রয়েছে অতীতের প্রাণহানির ঘটনাও।
শিশুর নিরাপত্তায় পরিবার নাকি রাষ্ট্র বেশি দায়ী?
প্রতিদিন সংবাদমাধ্যম খুললেই শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা, অপহরণ কিংবা শিশুশ্রমের মতো ভয়াবহ খবর চোখে পড়ে। সম্প্রতি রামিসা হত্যাকাণ্ডসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা সমাজকে আবারও গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। কখনও স্কুলে, কখনও বাসায়, কখনও রাস্তায়—শিশুরা যেন কোথাও পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
এটাই কি এনজিও কার্যক্রমের আসল চেহারা?
সাদা ধবধবে ইস্ত্রি-করা পাঞ্জাবি পরে যখন এনজিওর শীর্ষ কর্তারা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সেমিনার কক্ষে সুশাসন, মানবাধিকার আর টেকসই উন্নয়নের কথা বলে গলা ফাটান, তখন বাইরে তপ্ত রোদে ঘামতে থাকা প্রান্তিক মানুষের পিঠের চামড়া কতটা নুনছাল হয়ে যায়, তার এক জঘন্য নজির সৃষ্টি হলো সিরাজগঞ্জের তাড়াশে। ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি দিতে না পারার 'অপরাধে' দেড় বছরের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে কোল থেকে কেড়ে নিয়ে এক মাকে জেলে পাঠানো হয়েছে। অথচ খাতা-কলমে হিসাব বলছে, বিবাদের প্রকৃত অঙ্কটা ছিল মাত্র দুইশত টাকা।
রাষ্ট্র কি তার নাগরিকদের অভিভাবকত্ব হারিয়েছে?
একটি রাষ্ট্রের শক্তির মাপকাঠি তার জিডিপি বা মেগা প্রকল্প নয়, বরং তার সবচেয়ে অসহায় নাগরিকটি বিপদের দিনে কতটা সুরক্ষা পায়— তাতেই নিহিত থাকে তার প্রকৃত পরিচয়। গাজীপুরের কালিয়াকৈরের উত্তর লস্করচালা গ্রামে ৯ বছরের শিশু আর ১৮ মাসের দুগ্ধপোষ্য সন্তান নিয়ে একজন বিধবা মা যখন রাতভর কবরের পাশে আশ্রয় নেন, তখন আমাদের উন্নয়নের সব তকমা এক লহমায় ফিকে হয়ে যায়। এই দৃশ্য কেবল হাড়হিম করা নিষ্ঠুরতার গল্প নয়, বরং এটি আমাদের রাষ্ট্রের ‘অভিভাবক’ সত্তার এক চরম নৈতিক পরাজয়।
দুধের শিশু থেকে ৬ বছরের শিশু: কারাগারে নিরপরাধ শৈশব
আদালতের বারান্দায় একজন মা তার ৪৬ দিনের শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন। চারদিকে আইনজীবীদের আনাগোনা, পুলিশের পায়চারি, মামলার কাগজপত্রের ব্যস্ততা। সেই ব্যস্ততার মাঝে একটু পরেই ওই মাকে— সেই দুধের শিশুসহ — হাজতখানায় নামিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি কাঁদছেন।
বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা
বাংলাদেশে নারী ও কিশোরীদের প্রতি সহিংসতা একটি গভীর সামাজিক উদ্বেগের বিষয়। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে সহিংসতার শিকার হন, যার মধ্যে অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতা ও যৌন সহিংসতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন জরিপ ও প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী তাদের জীবদ্দশায় অন্তত এক ধরনের অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।