বিচার যখন ছিনিয়ে আনতে হয়: ১ম পর্ব
ইয়াসমিন ট্র্যাজেডির ৩০ বছর
১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট, ভোর। দিনাজপুর শহরের রানীগঞ্জ মোড়ে ব্র্যাক অফিসের সামনে রাস্তার ধারে পড়ে ছিল এক কিশোরীর নিথর, রক্তাক্ত দেহ। তার নাম ইয়াসমিন আক্তার। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য বিবরণ অনুযায়ী তার বয়স ছিল মাত্র চৌদ্দ বছর। এই বয়সে যে মেয়েটির হাতে থাকার কথা ছিল পাঠ্যবই, ভোরের আলোয় তার নিথর দেহ পড়ে রইল শহরের রাস্তায়। ঢাকার এক বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করত সে; আগের দিন বাসে চেপে মায়ের কাছে ফিরছিল দিনাজপুরে। বাড়ি সে ফিরেছিল ঠিকই, কিন্তু মায়ের বুকে নয়, শহরের রাস্তায় একটি লাশ হয়ে।
বাংলা উইকিপিডিয়া ও সমকালীন সংবাদভাষ্য অনুযায়ী, দশমাইল এলাকায় অপেক্ষারত ইয়াসমিনকে ভোররাতে একটি নৈশ টহল পুলিশ ভ্যান শহরে তার মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তুলে নেয়। পাশের চা-দোকানিকেও তারা আশ্বস্ত করেছিল, মেয়েটিকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া হবে। যাদের উর্দি দেখলে বিপন্ন মানুষ আশ্রয় খোঁজে, সেই তিন পুলিশ সদস্যই তাকে ধর্ষণ করে হত্যা করে এবং দেহ রাস্তায় ছুড়ে ফেলে চলে যায়। রাষ্ট্রের রক্ষক এখানে পরিণত হলো ঘাতকে; আর সেই অপরাধ আড়াল করতে রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা স্তর প্রথম থেকেই যেভাবে তৎপর হয়ে উঠল, সেই বিশ্বাসভঙ্গের ক্ষতই ইয়াসমিনের গল্পকে নিছক একটি অপরাধের সংবাদ থেকে একটি জাতির বিবেকের প্রশ্নে রূপান্তরিত করে দেয়।
এই একটি ভোর কেবল একটি দরিদ্র পরিবারের সর্বনাশ হয়ে থেমে থাকেনি। এটি বাংলাদেশের নারী আন্দোলন, রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক এবং ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক রক্তাক্ত বাঁক হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। একটি জনপদ তার শোককে রূপান্তরিত করল রুদ্ররোষে। রাজপথ ভিজল প্রতিবাদকারীর রক্তে; এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র বাধ্য হলো তার নিজের তিন কর্মচারীকে ফাঁসিকাঠে ঝোলাতে। সেই থেকে ২৪ আগস্ট বাংলাদেশে পালিত হয়ে আসছে ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে। একটি তারিখ, যা একই সঙ্গে গভীর বেদনার ও অটল প্রতিরোধের।
ত্রিশ বছর পর ইয়াসমিনের নাম আমরা মূলত একটি বিজয়গাথা হিসেবে স্মরণ করি, সেই বিরল মুহূর্ত হিসেবে যখন ‘আইন সবার ঊর্ধ্বে’ কথাটি নিছক বাণী না থেকে বাস্তব হয়ে উঠেছিল। এই স্মরণ যথার্থ। এই বিচার রাষ্ট্র তার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দেয়নি, দিতে বাধ্য হয়েছিল। একটি গোটা জেলাসহ সারা বাংলাদেশ যদি রাজপথে না নামত, প্রতিবাদ দমনে সাতটি তাজা প্রাণ যদি না ঝরত, একটি স্থানীয় সংবাদপত্র যদি বিদ্যুৎহীন অন্ধকারেও মাথা নত করতে অস্বীকার না করত, এবং প্রায় নয় বছর ধরে সামাজিক ও আইনি চাপ যদি অব্যাহত না থাকত, তবে একজন কিশোরীর এই নির্মম হত্যাকাণ্ডেরও বিচার হতো কি না, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। প্রশ্নটি তাই কেবল ‘আমরা ইয়াসমিনকে মনে রেখেছি কি না’ নয়; প্রশ্নটি হলো, যে ন্যায়বিচার আদায় করতে একটি জনপদকে রক্ত ঢালতে হয়, তাকে আমরা রাষ্ট্রের সাফল্য বলব, নাকি ব্যর্থতার প্রমাণ। কারণ যে বিচার পেতে গণঅভ্যুত্থান লাগে, তা নিয়ম নয়, নিয়মের করুণ ব্যতিক্রম।
সবচেয়ে অরক্ষিত জীবন এবং ধামাচাপার নির্মম অপচেষ্টা
ইয়াসমিন ছিলেন একজন কিশোরী গৃহকর্মী, সমাজের ক্ষমতা-কাঠামোয় প্রায় সবচেয়ে অরক্ষিত একটি প্রাণ, নারী, বয়সে কিশোরী, দরিদ্র এবং বিশাল শহরে একা। নব্বইয়ের দশকে গ্রাম থেকে শহরে দুমুঠো ভাতের সন্ধানে আসা এমন অসংখ্য কিশোরীর নিরাপত্তা রাষ্ট্রের বিবেচনায় কখনোই স্থান পায়নি। ইয়াসমিনের মৃত্যু এই প্রায়-অদৃশ্য জনগোষ্ঠীর ঝুঁকিকে হঠাৎ করে গোটা জাতির চোখের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিল। আর যে প্রতিষ্ঠানের কাছে তার সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা পাওয়ার কথা ছিল, সেই প্রতিষ্ঠানের হাতেই তার মৃত্যু আমাদের এক ভয়ংকর সত্যের মুখোমুখি করে: নিরাপত্তার প্রতিষ্ঠানটিই কখনো কখনো সবচেয়ে দুর্বলের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে উঠতে পারে।
একটি জঘন্য অপরাধকে জাতীয় সংকটে পরিণত করেছিল তার পরবর্তী ধামাচাপার অপচেষ্টা। অপরাধী যখন রাষ্ট্রের উর্দিধারী, তখন রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তর প্রথম প্রবৃত্তিতেই অপরাধ আড়াল করতে সচেষ্ট হয়। একাধিক সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশাসন প্রথমে ঘটনাটিকে নিছক ‘ছোটখাটো গোলমাল’ হিসেবে দেখাতে চেয়েছিল। এমনকি নিহত ইয়াসমিনকে ‘পতিতা’ আখ্যা দিয়ে অপরাধের নৈতিক দায় ভুক্তভোগীর কাঁধেই চাপিয়ে দেওয়ার নিন্দনীয় চেষ্টা হয়, এবং প্রমাণ বিকৃত করতে অন্য এক নারীকে ইয়াসমিন সাজিয়ে উপস্থাপনের অপচেষ্টার কথাও ওই প্রতিবেদনগুলোতে উঠে এসেছে। মৃত্যুর পরও একটি কিশোরীর এই চরিত্রহনন, এর চেয়ে নিষ্ঠুর অবিচার আর কী হতে পারে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের বিবরণ অনুযায়ী, দশমাইল মোড় থেকে শহরের রামনগরে মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেই ইয়াসমিনকে ভ্যানে তোলা হয়েছিল; সেই মা, শরিফা বেগম, পথ চেয়ে বসেছিলেন মেয়ের ফেরার অপেক্ষায়। কিন্তু মেয়ে ফিরল লাশ হয়ে, রানীগঞ্জ মোড়ে ব্র্যাক অফিসের সামনে। সন্তানহারা সেই মায়ের আর্তনাদ পরবর্তী তিন দশকে বহুবার শোনা গেছে; পৃথিবী যখন ধীরে ধীরে ভুলে গেছে, তখনো তিনি ভুলতে পারেননি। একজন মায়ের এই না-ভুলতে-পারার ভেতরেই আজও বেঁচে আছেন ইয়াসমিন।
এই অন্ধকারতম মুহূর্তে আলো হয়ে এসেছিল সংবাদপত্র। বাংলা উইকিপিডিয়া ও গণমাধ্যমের বিবরণ অনুযায়ী, স্থানীয় সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল দৈনিক ‘উত্তরবাংলা’ পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমানকে জানান, পুলিশ সদস্যরা এক কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে। সম্পাদক রহমান মেয়েটির পরিচয় নিশ্চিত করে সংবাদ প্রকাশ করতে চাইলে পুলিশ তাঁকে নিষেধ করে; আর প্রতিবেদন ঠেকাতে সেই রাতে পত্রিকা অফিসের বিদ্যুৎ সংযোগই কেটে দেওয়া হয়। কিন্তু সত্যকে অন্ধকারে চাপা দেওয়া যায়নি। প্রতিবেশীর কাছ থেকে বিদ্যুৎ ধার করে মতিউর রহমান ও তাঁর সহকর্মীরা ২৬ আগস্ট ছেপে দেন সেই ভয়ংকর সত্য। বিচারের প্রথম শর্ত সত্য প্রকাশ, আর সেই সত্য রাষ্ট্র সরবরাহ করেনি, বরং সক্রিয়ভাবে গলা টিপে ধরতে চেয়েছিল। মুক্ত সংবাদমাধ্যম না থাকলে ইয়াসমিনের কান্নাও হয়তো আরও অসংখ্য চাপা পড়ে যাওয়া কান্নার সঙ্গে মিশে চিরতরে হারিয়ে যেত।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক হয়তো এটাই যে, রাষ্ট্রের সেই চেপে দেওয়ার প্রবণতা তিন দশকেও পুরোপুরি যায়নি। ২০২৪ সালে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়াসমিনের জীবন নিয়ে নির্মিতব্য চলচ্চিত্র ‘আমি ইয়াসমিন বলছি’-র নির্মাণকাজ পুলিশের চাপে থমকে যায়। অভিনেত্রী বিদ্যা সিনহা সাহা মিম জানান, ঢাকা মহানগর পুলিশের তৎকালীন এক কর্মকর্তার বাধায় তিনি ইয়াসমিন চরিত্রে অভিনয় করতে পারেননি। যে ঘটনার বিচার একদা রাষ্ট্র মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল, তিন দশক পর সেই ঘটনার স্মৃতিটুকু পর্দায় তুলে ধরাও যখন বাধার মুখে পড়ে, তখন বোঝা যায়, ক্ষমতার কাছে ইয়াসমিন আজও এক অস্বস্তিকর নাম।
অভূতপূর্ব গণপ্রতিরোধ ও রক্তে ভেজা রাজপথ
সত্য প্রকাশ পাওয়ার পর দিনাজপুরকে আর দমিয়ে রাখা যায়নি। জমে থাকা ক্ষোভ মুহূর্তেই রূপ নিল স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলনে। সমকালীন ভাষ্য অনুযায়ী, বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালায়, পুলিশ ভ্যানে আগুন দেয়, এবং শহরের সড়কে সড়কে গড়ে তোলে কাঠ, ইট আর জ্বলন্ত টায়ারের ব্যারিকেড। এটি ছিল রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রতি জমে থাকা অবিশ্বাস আর অপমানের বিস্ফোরণ, যেখানে একটি কিশোরীর মৃত্যু হয়ে উঠেছিল একটি জনপদের সমষ্টিগত মর্যাদার প্রশ্ন।
কিন্তু আন্দোলন দমাতে গিয়ে রাষ্ট্র আরও রক্ত ঝরাল। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৭ আগস্ট হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়; সামু, কাদের ও সিরাজসহ সাতজন প্রাণ হারান এবং আহত হন তিন শতাধিক মানুষ। দ্য ডেইলি স্টারও নিহতের সংখ্যা সাত উল্লেখ করেছে। তবে সংখ্যাটি সূত্রভেদে ভিন্ন: বাংলা উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে গুলিতে সতেরো জন নিহত ও প্রায় একশ জন আহত হন, আবার বাংলা ট্রিবিউনের একটি প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা পাঁচ। এই সংখ্যাগত অনিশ্চয়তা নিজেই এক নীরব সাক্ষ্য। সাম্প্রতিক দেশকালের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে তিনজনের দেহ ও পরিচয় মিললেও বাকিদের লাশ ‘গুম’ হয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। রাষ্ট্র যখন কেবল নাগরিককে হত্যাই করে না, তার লাশ গোনাও অসম্ভব করে তোলে, তখন জবাবদিহির ঘাটতি ঠিক কতটা গভীরে প্রোথিত, তা আঁচ করা যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে দিনাজপুরে টানা তিন দিন কারফিউ জারি হয়। দ্য ডেইলি স্টারের বিবরণ অনুযায়ী, তৎকালীন পুলিশ সুপার আব্দুল মোতালেবসহ শহরের প্রায় সব পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার বা বরখাস্ত করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় তৎকালীন বিডিআরের হাতে; প্রত্যাহার করা হয় জেলা প্রশাসককেও। একটি গোটা জেলার পুলিশ প্রশাসনকে কার্যত ভেঙে নতুন করে সাজাতে হয়েছিল, এ থেকেই বোঝা যায় জনরোষের ঢেউ কতটা প্রবল ছিল।
এই আত্মদান আর প্রতিরোধকে স্মরণীয় করে রাখতেই ২৪ আগস্ট ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়; দিনাজপুরের মানুষ একে ভালোবেসে ডাকে ‘ইয়াসমিন দিবস’ নামে। ২০১২ সালে দিনাজপুরে গড়ে ওঠে একটি স্মৃতিসৌধ, আর প্রতিবছর দিনটি ঘিরে হয় আলোচনা সভা, দোয়া ও কালো ব্যাজ ধারণ। একটি সত্য এখানে মনে রাখা জরুরি: এই দিবস কোনো সরকারের দয়ার দান নয়, রাজপথ থেকে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এক স্বীকৃতি।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুই বিপরীত মুখ
একটি জাতীয় সংকট রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকৃত রূপ অনাবৃত করে দেয়। ইয়াসমিনের ঘটনায় ক্ষমতাসীন ও বিরোধী পক্ষের প্রতিক্রিয়া ছিল প্রায় সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে ইতিহাসের একটি নিষ্ঠুর পরিহাসও আছে। আল জাজিরার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জন্মই হয়েছিল এই দিনাজপুরে। অথচ সমকালীন ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর তিনি নিজের সেই জন্মশহরে যাননি; শোক প্রকাশ বা দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নিয়েই তিনি জাতিসংঘের চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে (বেইজিং, ৪-১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯৫) বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিতে চলে যান। বৈসাদৃশ্যটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে যখন আমরা দেখি, ৪ সেপ্টেম্বর দেওয়া সেই সম্মেলন-ভাষণে তিনি ছিলেন নারীর অগ্রযাত্রার পক্ষে উচ্চকিত। জাতিসংঘের নথিতে সংরক্ষিত সেই ভাষণে খালেদা জিয়া বলেন, তাঁরা বেইজিংয়ে মিলিত হয়েছেন ‘নারীর অগ্রযাত্রার প্রতি অঙ্গীকার নতুন করে ব্যক্ত করার’ অভিন্ন লক্ষ্যে, এবং তাঁর আশা যে ‘নারীর প্রতি শতাব্দীপ্রাচীন কুসংস্কার অবশেষে ভেঙে পড়ছে’। কিন্তু ঠিক তখনই দেশের মাটিতে একজন কিশোরী রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে ধর্ষিত ও নিহত হয়ে গোটা জাতিকে কাঁদাচ্ছিলেন। বেইজিংয়ের অলঙ্কারপূর্ণ প্রতিশ্রুতি আর দিনাজপুরের রক্তাক্ত বাস্তবতার এই বিপুল দূরত্বই সরকারপ্রধানের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ তাঁর এক প্রবন্ধের শিরোনামেই বেদনার সঙ্গে এই বৈপরীত্যকে তুলে ধরেছিলেন: ‘ইয়াসমিনের লাশের বোঝা কাঁধে নিয়েই প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং যেতে হচ্ছে’।
অন্যদিকে, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা দ্রুত দিনাজপুরে ছুটে যান এবং শোকার্ত-বিক্ষুব্ধ মানুষের পাশে দাঁড়ান। আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও দিনাজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপালের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই সময়ে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তিনি দিনাজপুরবাসীর পাশে থেকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ফলে ঘটনাটি দ্রুতই সরকারের বিরুদ্ধে জবাবদিহির এক বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে রূপ নেয়।
আইনি লড়াই: ছিনিয়ে আনা এক ন্যায়বিচার
জনরোষের চাপে বিচার শুরু হলেও পথটি ছিল দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ। সারাবাংলা ও আজকের পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তার কারণে মামলাটি দিনাজপুর থেকে রংপুরে স্থানান্তর করা হয়। রংপুরের বিশেষ আদালত ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ শেষে তিন অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য, এএসআই মইনুল হক, কনস্টেবল আব্দুস সাত্তার এবং পিকআপ ভ্যানের চালক অমৃত লাল বর্মণকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
রায় ও তা কার্যকরের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়ায় প্রায় সাত বছর, যা বিচারিক বিলম্বের এক নিদর্শন। বিবিসি নিউজসহ সংবাদমাধ্যমের বিবরণ অনুযায়ী, ২০০৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর রংপুর কারাগারে মইনুল হক ও আব্দুস সাত্তারের ফাঁসি কার্যকর হয়; একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর, প্রাণভিক্ষার আবেদন খারিজ হওয়ার পর, ফাঁসি কার্যকর হয় অমৃত লাল বর্মণেরও, যিনি মৃত্যুর আগে ভুক্তভোগীর পরিবারের কাছে অনুশোচনা প্রকাশ করেছিলেন। বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এটি এক বিরল দৃষ্টান্ত, যেখানে হেফাজতে সংঘটিত অপরাধের দায়ে রাষ্ট্রের নিজস্ব বাহিনীর সদস্যদের সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর হয়। তবে ন্যায়বিচারের এই বিজয়ের পাশেই রয়ে গেল একটি অসম্পূর্ণতা: বাংলা উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, প্রমাণ নষ্ট করার অভিযোগ থেকে দিনাজপুরের তৎকালীন পুলিশ সুপার ও থানার ওসিসহ পাঁচজন, এমনকি প্রথম ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকও খালাস পেয়ে যান। অর্থাৎ অপরাধ আড়াল করার চেষ্টার দায় কার্যত কারও ওপরই বর্তায়নি।
এই সাফল্যের গর্ভেই লুকিয়ে আছে এক অস্বস্তিকর সত্য। এই একটিমাত্র বিচার নিশ্চিত করতে যা যা মূল্য দিতে হয়েছিল, তার তালিকাটি হৃদয়বিদারক: একটি জেলার অভ্যুত্থান, সাতটি তাজা প্রাণ, একটি ভেঙে পড়া পুলিশ প্রশাসন এবং প্রায় এক দশকের অপেক্ষা। যে সমাজে জবাবদিহি স্বাভাবিক নিয়ম, সেখানে একটি হত্যার বিচার পেতে এত বিপুল রক্ত ও কান্নার মূল্য চোকাতে হয় না। ইয়াসমিনের বিচার তাই যতটা ব্যবস্থার জয়, তার চেয়ে বহু গুণ বেশি সাধারণ মানুষের অশ্রু ও রক্তে কেনা এক ফসল।
মতামত দিন