শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হোক
একজন শিশু যখন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন শুধু তার শরীর বা মনই ক্ষতবিক্ষত হয় না; ক্ষতবিক্ষত হয় রাষ্ট্রের বিবেকও। কিন্তু সেই শিশুই যখন ন্যায়বিচারের আশায় বছরের পর বছর আদালতের সিঁড়ি ভাঙে, একই ঘটনার বর্ণনা বারবার দিতে বাধ্য হয় কিংবা অভিযুক্তের উপস্থিতিতে আতঙ্কে কুঁকড়ে যায়, তখন বিচারব্যবস্থাও অনিচ্ছাকৃতভাবে সেই নির্যাতনেরই অংশ হয়ে ওঠে। বিচার বিলম্বিত হলে শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি পিছিয়ে যায় না, একজন শিশুর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসাও বিলম্বিত হয়। তাই শিশু নির্যাতনের বিচার আর সাধারণ মামলার গতিতে চলতে পারে না।
বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের ভয়াবহতা নিয়ে প্রায়ই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। কঠোর আইন, কঠিন শাস্তি, এমনকি মৃত্যুদণ্ডের দাবিও ওঠে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আড়ালেই থেকে যায়—যদি বিচারই দ্রুত শেষ না হয়, তবে কঠোর আইনের কার্যকারিতা কোথায়? অপরাধীর সবচেয়ে বড় সাহস আইনের দুর্বলতা নয়; বিচারের দীর্ঘসূত্রতা। যতদিন সে জানবে একটি মামলা বছরের পর বছর চলতে পারে, ততদিন শাস্তির ভয় তার কাছে অনেকটাই নিষ্প্রভ থাকবে। অন্যদিকে নির্যাতিত শিশু ও তার পরিবার ধীরে ধীরে বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা হারায়। অনেকেই শেষ পর্যন্ত মামলা চালিয়ে যাওয়ার সাহসও হারিয়ে ফেলেন। এর ফলে বিচারহীনতার একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতের অপরাধকে আরও উৎসাহিত করে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশে ‘শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ বিশেষ ট্রাইব্যুনাল’ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার সময় এসেছে। বিশ্বের বহু দেশ ইতিমধ্যে এই পথেই হেঁটেছে। কোথাও এর নাম Special Court, কোথাও Special Tribunal, আবার কোথাও Fast-track Court—কিন্তু উদ্দেশ্য একটাই: শিশু নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার মামলার দ্রুত বিচার, শিশুবান্ধব সাক্ষ্যগ্রহণ এবং সময়মতো রায় কার্যকর করা। এসব দেশ উপলব্ধি করেছে, শিশুর জন্য ন্যায়বিচার মানে শুধু সঠিক রায় নয়; সময়মতো রায়ও ন্যায়বিচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ভারতে Protection of Children from Sexual Offences (POCSO) Act, 2012-এর অধীনে গঠিত Special POCSO Courts-এ শিশুকে অভিযুক্তের মুখোমুখি না করেই সাক্ষ্য গ্রহণ, in-camera শুনানি এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্নের বিধান রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার Sexual Offences Courts বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিচারক, প্রসিকিউটর এবং ভিকটিম সাপোর্ট সার্ভিসের মাধ্যমে শিশু ও নারীর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করে। ফিলিপাইনে শিশু নির্যাতন, শিশু পাচার ও শিশু যৌন শোষণের মামলার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে বিশেষ আদালত ও শিশুবান্ধব বিচারব্যবস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঙ্গরাজ্যে আলাদা ট্রাইব্যুনাল না থাকলেও Child Advocacy Center মডেলের মাধ্যমে পুলিশ, প্রসিকিউটর, চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী ও সমাজকর্মীরা সমন্বিতভাবে কাজ করেন, যাতে শিশুকে একই ঘটনার বর্ণনা বারবার দিতে না হয় এবং বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত ও মানবিকভাবে সম্পন্ন হয়।
এই অভিজ্ঞতাগুলো প্রমাণ করে, শিশু সুরক্ষায় সফল দেশগুলো শুধু আইন কঠোর করেনি; তারা বিচারপ্রক্রিয়াকেও শিশুকেন্দ্রিক করেছে। কারণ একজন শিশু আদালতের আনুষ্ঠানিকতা বোঝে না; সে বোঝে ভয়, লজ্জা ও অনিশ্চয়তা। তাই বিচারব্যবস্থাকে শিশুর মানসিক ও বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াই আধুনিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রয়েছে, যেখানে শিশু ধর্ষণসহ নানা গুরুতর অপরাধের বিচার হয়। শিশু আদালতও রয়েছে, তবে সেটি মূলত আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়া শিশুদের জন্য; নির্যাতনের শিকার শিশুদের জন্য নয়। ফলে শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো বিভিন্ন আদালতে ছড়িয়ে পড়ে এবং দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কোনো বিশেষ বিচারিক কাঠামো তৈরি হয় না। বাস্তবে বিচারকদের বিপুলসংখ্যক ভিন্ন ধরনের মামলা একসঙ্গে পরিচালনা করতে হয়, যার প্রভাব পড়ে শিশু-সংক্রান্ত মামলার গতির ওপরও।
এখন প্রয়োজন এমন একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, যার একমাত্র দায়িত্ব হবে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতার বিচার। শিশু নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, নির্যাতনের ফলে মৃত্যু, অনলাইন যৌন শোষণ, শিশু পাচার এবং শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অন্যান্য গুরুতর অপরাধ এই ট্রাইব্যুনালের একক এখতিয়ারে আনা যেতে পারে। তদন্তের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা, বিচার সম্পন্নের সুস্পষ্ট সময়সীমা, শিশুবান্ধব সাক্ষ্যগ্রহণ কক্ষ, ভিডিও সাক্ষ্য, একবারই সাক্ষ্য রেকর্ডের ব্যবস্থা, বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিচারক ও তদন্ত কর্মকর্তা, সাক্ষী সুরক্ষা, মনোসামাজিক সহায়তা, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আপিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও সময়সীমা নির্ধারণ করা জরুরি, যাতে কোনো শিশুর ন্যায়বিচার বছরের পর বছর ঝুলে না থাকে।
এ ধরনের ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা মানে শুধু নতুন একটি আদালত গঠন নয়; এটি হবে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের ঘোষণা। এর মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা যাবে—শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার মামলায় দীর্ঘসূত্রতা, অবহেলা কিংবা গাফিলতির কোনো স্থান নেই। দ্রুত বিচার যেমন অপরাধীর শাস্তির নিশ্চয়তা বাড়াবে, তেমনি নির্যাতিত শিশু ও তার পরিবারের মধ্যেও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখবে।
শিশুরা রাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বল নাগরিক; তাই তাদের জন্যই সবচেয়ে শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা থাকা উচিত। একটি সভ্য সমাজের মানদণ্ড শুধু অপরাধের জন্য কী শাস্তি নির্ধারণ করেছে, তা নয়; বরং কত দ্রুত, কত সংবেদনশীলভাবে এবং কত নিশ্চিতভাবে সেই শাস্তি কার্যকর করতে পারে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা এখন আর কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়, সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অঙ্গীকার। শিশুর শৈশব কোনো মামলার ফাইলের নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারে না। রাষ্ট্র যদি সত্যিই শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখার অঙ্গীকার করে, তবে সেই অঙ্গীকারের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ হবে—প্রতিটি শিশু নির্যাতনের মামলায় দ্রুত, সংবেদনশীল এবং নিশ্চিত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
মতামত দিন