Views Bangladesh Logo

এটাই কি এনজিও কার্যক্রমের আসল চেহারা?

Shamiul Alim

শামীউল আলীম

সাদা ধবধবে ইস্ত্রি-করা পাঞ্জাবি পরে যখন এনজিওর শীর্ষ কর্তারা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সেমিনার কক্ষে সুশাসন, মানবাধিকার আর টেকসই উন্নয়নের কথা বলে গলা ফাটান, তখন বাইরে তপ্ত রোদে ঘামতে থাকা প্রান্তিক মানুষের পিঠের চামড়া কতটা নুনছাল হয়ে যায়, তার এক জঘন্য নজির সৃষ্টি হলো সিরাজগঞ্জের তাড়াশে। ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি দিতে না পারার 'অপরাধে' দেড় বছরের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে কোল থেকে কেড়ে নিয়ে এক মাকে জেলে পাঠানো হয়েছে। অথচ খাতা-কলমে হিসাব বলছে, বিবাদের প্রকৃত অঙ্কটা ছিল মাত্র দুইশত টাকা।

হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। দুটি একশত টাকার নোট— যা দিয়ে হয়তো ওই সংস্থার কর্তাদের এক কাপ কফিও হয় না, সেই টাকার জন্য তারা বেছে নিয়েছে প্রতিহিংসার পথ। জান্নাতি খাতুন নামক পঁচিশ বছরের এক তরুণী মায়ের এই কারাবাস কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের হাজারো 'জান্নাতি'দের কান্নার প্রতিধ্বনি, যাঁরা দারিদ্র্য বিমোচনের নামে গড়ে-ওঠা বাণিজ্যিক দানবদের জাঁতাকলে প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছেন।

অঙ্কের নিষ্ঠুরতা ও দারিদ্র্যের অপরাধীকরণ
ঘটনাটি একটু তলিয়ে দেখা দরকার। জান্নাতির স্বামী আব্দুর রাজ্জাক ওই এনজিওতেই (টিএমএসএস) চাকরি করতেন। নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী তাঁকে নগদ ২৪ হাজার ৮০০ টাকা জামানত রাখতে হয়েছিল। পরে স্ত্রীর নামে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেওয়া হয়, যার অর্ধেক পরিশোধও করা হয়েছিল। যৌক্তিক ও স্বাভাবিক নিয়ম ছিল— পাওনা ঋণের সঙ্গে ওই জামানত সমন্বয় করা। সেটি করলে পাওনা দাঁড়ায় মাত্র ২০০ টাকা।

এখানেই সামনে আসে আইনের চরম অপব্যবহারের বিষয়টি। টিএমএসএস এই মামলাটি করেছে নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট আইন ১৮৮১-এর ধারা ১৩৮ ব্যবহার করে। অথচ মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) ২০১৮ সালের সার্কুলারে স্পষ্টভাবে ব্লাংক চেক নিতে নিষেধ করেছে।

এ প্রসঙ্গে দেশের বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেনের আইনি দর্শনের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক মানুষের বিচার পাওয়ার অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর আইনি লড়াইয়ের মূল নির্যাস থেকে আমরা জানি — দেওয়ানি প্রকৃতির ঋণ-বিরোধকে চেক ডিজঅনারের (১৩৮ ধারা) মতো ফৌজদারি মামলায় রূপান্তর করা কেবল আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার নয়; এটি দরিদ্র মানুষকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করার এবং হয়রানি করার এক সুপরিকল্পিত হাতিয়ার।

অন্যদিকে, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার এমন অপব্যবহারকে অপরাধবিজ্ঞানীরা ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেন। আইন ও অপরাধ গবেষক মো. আরিফুল কবীরের গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণের আলোকে বলা যায়, ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদে ফেলে যখন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রান্তিক মানুষকে আইনি কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, তখন তাকে 'ক্রিমিনালাইজেশন অব পভার্টি' বা 'দারিদ্র্যের অপরাধীকরণ' বলা হয়। এটি নিছক অর্থ আদায় নয়, বরং একটি ভয়ংকর প্রাতিষ্ঠানিক ট্রমা।

উন্নত বিশ্বের আয়না: আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?
টিএমএসএস-এর মতো এনজিওরা মূলত উন্নত বিশ্বের দাতা সংস্থাগুলোর অর্থায়নে পরিচালিত হয়। কিন্তু বিচিত্র বিষয় হলো, দাতা দেশগুলোর মানবিক মানদণ্ড তারা এ দেশে প্রয়োগ করে না।

উন্নত বিশ্বের চিত্রটা একটু খেয়াল করুন। যুক্তরাজ্যে (CPS Guidelines) বা নর্ডিক দেশগুলোতে (নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড) কোনো মায়ের কোলে শিশু থাকলে বড় কোনো অপরাধেও তাকে সাধারণত গ্রেপ্তার করা হয় না। সেখানে ঋণের দায়ে কাউকে জেলে পাঠানো তো কল্পনাতীত; বরং এটিকে দেখা হয় একটি নিছক 'সিভিল ডিসপিউট' বা দেওয়ানি বিরোধ হিসেবে। জার্মানিতে Mutterschutz আইনের অধীনে একজন নবজাতকের মা আদালতি প্রক্রিয়ায় বিশেষ সুরক্ষা পান। কানাডায় বিচারকের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে শিশুর 'সর্বোচ্চ মঙ্গল' (Best Interest of the Child) নিশ্চিত করার।

তাহলে বাংলাদেশে কেন উল্টো চিত্র? যে এনজিওরা বিদেশি অর্থে শিশু অধিকারের সেমিনার করে, তারাই আবার শিশুকে মায়ের কোল থেকে টেনেহিঁচড়ে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবেও এটি স্পষ্ট অপরাধ। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (CRC) — যেখানে বাংলাদেশ স্বাক্ষরকারী — তার ৩ ও ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, শিশুকে কোনোভাবেই তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে আলাদা করা যাবে না। আবার জাতিসংঘের ব্যাংকক রুলস (২০১০) অনুযায়ী, শিশু-নির্ভরশীল মায়েদের ক্ষেত্রে কারাদণ্ড হবে সর্বশেষ বিকল্প। জান্নাতির ক্ষেত্রে এই বৈশ্বিক অঙ্গীকারগুলো চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে।

'পাঁচতারা' এনজিও বনাম মৃত নদী
যে এনজিওর জন্ম হয়েছিল দারিদ্র্য বিমোচনের নামে, তারা আজ বগুড়ায় পাঁচতারা হোটেল বানায়, বাণিজ্যিক মেডিকেল কলেজ চালায়, এমনকি বিলাসবহুল হেলিকপ্টার সার্ভিসও পরিচালনা করে। অভিযোগ আছে, বগুড়ার মৃতপ্রায় করতোয়া নদীর দীর্ঘশ্বাসের পেছনে এই আগ্রাসী দখলনীতিরই হাত রয়েছে।

যে এনজিওর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সম্পদ শত শত কোটি টাকা, তারা ২০০ টাকার জন্য একজন নারীকে জেলে পাঠায় — এর চেয়ে বড় প্রহসন আর কী হতে পারে? ২০০ টাকার জন্য যে এনজিও শিশুকে তার মায়ের স্তন্যপান থেকে বঞ্চিত করে, তাদের এই বিপুল অর্থ-বিত্তের উৎস নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিবিড় অনুসন্ধান হওয়া কি জরুরি নয়?

বিবেকের দাবি ও রাষ্ট্রের দায়
জান্নাতি খাতুনের জামিন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে ক্ষত তৈরি হলো তা কি কেবল জামিনে মুছে যাবে? এই ব্যবস্থার শেকড় ধরে টান দেওয়া দরকার:

আইন সংশোধন:
ক্ষুদ্রঋণের বিরোধ থেকে নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট আইনের ১৩৮ ধারাকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে হবে। ঋণের দায়ে জেল — এই আদিম প্রথা বিলুপ্ত করা এখন সময়ের দাবি।

জামানত বাণিজ্য নিষিদ্ধকরণ: বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে কর্মীর কাছ থেকে 'সিকিউরিটি মানি' নেওয়া আইন করে বন্ধ করতে হবে। কোনো সরকারি বা বেসরকারি কর্পোরেট অফিসে যা হয় না, তা এনজিও খাতে চলতে পারে না। এটি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) মূলনীতিরও সরাসরি পরিপন্থী।

মিশন অডিট: এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর উচিত এসব 'পাঁচতারা' এনজিওর বাণিজ্যিক বিনিয়োগের উৎস এবং বিদেশি অনুদানের যথাযথ ব্যবহার কঠোরভাবে নিরীক্ষা করা।

চাইল্ড-সেফ অ্যারেস্ট প্রোটোকল: কোনো শিশুর প্রাথমিক পরিচর্যাকারীকে ছোটখাটো আর্থিক বিরোধে গ্রেপ্তার করা যাবে না — এটি পুলিশের প্রবিধানে এবং আইনি কাঠামোতে সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

শেষ কথা
সভ্যতার পরিমাপ হয় তার সবচেয়ে দুর্বল সদস্যকে সে কীভাবে রক্ষা করে তার ওপর। জান্নাতি খাতুনের সেই শিশুটি হয়তো বড় হয়ে এই ভয়ংকর ট্রমার কথা মনে রাখবে না, কিন্তু আমরা যারা নিজেদের সচেতন মানুষ দাবি করি, আমাদের কি ভুলে যাওয়া উচিত?

উন্নয়ন যখন দম্ভ আর শোষণের সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই উন্নয়নের ময়নাতদন্ত হওয়া জরুরি। রাষ্ট্র যদি আজ চুপ থাকে, তবে ভবিষ্যতে এমন হাজারো জান্নাতি আর তাদের অবুঝ শিশুরা এই 'এনজিওতন্ত্রের' জাঁতাকলে পিষ্ট হতেই থাকবে। উন্নয়ন হোক মানুষের জন্য, মানুষের লাশের ওপর দিয়ে নয়।

মো. শামীউল আলীম শাওন
উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী
প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি, ইয়ুথ অ্যাকশন ফর সোশ্যাল চেঞ্জ (ইয়্যাস), রাজশাহী


মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ