তবে কী ফাতেমার মৃত্যুর অপেক্ষাতেই ছিল বাগেরহাট প্রশাসন?
বাগেরহাটে হযরত খান জাহান আলী (র.) মাজার সংলগ্ন দিঘিতে সাত বছরের শিশু ফাতেমা আক্তারের মৃত্যুকে শুধু একটি দুর্ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এই মৃত্যুর আগে একাধিক সতর্ক বার্তা ছিল। রয়েছে অতীতের প্রাণহানির ঘটনাও।
বাগেরহাটের সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিজেও বলেছিলেন কুমিরের সেই দিঘি অরক্ষিত রাখা হবে না। সেই বিষয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেবেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কেন এতদিনেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? তাহলে কী শিশু ফাতেমার মৃত্যুর অপেক্ষাতেই ছিল বাগেরহাটের প্রশাসন?
গত ৮ এপ্রিল সেই দিঘীতে একটি আহত কুকুরকে টেনে নিয়ে যায় কুমির। পরে সেখান থেকে কুকুরটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনা সারা দেশে আলোড়ন তোলে।
ওই সময় মাজারটিতে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, শুধু কুকুর কাণ্ডই নয়, এর আগেও কুমিরের শিকার হয়ে দুজন মানুষ মারা যান।
এ বিষয়ে গত ১৫ এপ্রিল ভিউজ বাংলাদেশে ‘শুধু কুকুর নয়, দু’জন মানুষকেও দিঘিতে টেনে নিয়েছিল মাজারের কুমির'-এ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হয়। এর আগে গত ১৩ এপ্রিল ‘কুমির থাকা সেই দীঘিটি আর কতদিন অরক্ষিত থাকবে’-এ শিরোনামে ভিউজ বাংলাদেশে আরেকটি সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল।
এসব ঘটনা ও সংবাদ প্রকাশের পরও দেখা যায়, দিঘির চারপাশে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। শিশু-কিশোররা পানিতে খেলছিল, মানুষ গোসল করছিলেন, কেউ কেউ হাত-মুখ ধুচ্ছিলেন। অথচ সবার জানা ছিল সেখানে একটি কুমির রয়েছে। যা স্থানীয়রা জানতেন, প্রশাসন জানত, মাজার কর্তৃপক্ষও জানত। তবুও নিরাপত্তা বলয়ের বাহিরেই ছিল কুমিরের সেই দিঘি।
দিঘিতে কুকুর কাণ্ডের পর তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান বাগেরহাট সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)
মোসা. আতিয়া খাতুন।
‘কুমির থাকা সেই দীঘিটি আর কতদিন অরক্ষিত থাকবে’- এ শিরোনামে ভিউজ বাংলাদেশে প্রকাশিত সংবাদে ইউএনও বলেছিলেন, ‘এখানে ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয় আছে। সেই বিশ্বাস থেকেই অনেকে গোসল করেন, পানি স্পর্শ করেন। এমনকি বোতলে করে পানি নিয়ে যান। এ অবস্থায় হঠাৎ করে নিষেধাজ্ঞা দিলে মাজারভক্তরা বিষয়টি ভালোভাবে নাও নিতে পারেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মানুষের গোসল বা পানি সংগ্রহের জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হবে, যেখানে কুমিরটি যেতে পারবে না।’
তবে ইউএনও’র সেই বক্তব্য ফাতেমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আর বাস্তবায়ন হয়নি। এরমধ্যেই ঝরে গেল ফাতেমার প্রাণ। ফাতেমার মৃত্যুর পরই বুধবার (৩ জুন) দিঘি থেকে কুমিরটিকে সরিয়ে খুলনা বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে।
এর আগে, গত সোমবার (১ জুন) রাত সাড়ে ৮টার দিকে দিঘিটির মহিলা ঘাট থেকে শিশু ফাতেমাকে কামড় দিয়ে টেনে নিয়ে যায় কুমির। পরে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
এখন প্রশ্ন উঠে, দিঘিতে দুজন মানুষ ও একটি কুকুরের মৃত্যুও কী কুমিরের বিষয়ে সতর্ক হওয়ার সংকেত ছিল না? নাকি প্রশাসন ফাতেমার মৃত্যুর অপেক্ষাতেই ছিল?
ফাতেমার মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মাজারের ওই দিঘির একটি পরিচিত ঘটনা। সেই ঝুঁকি জেনেও মানুষকে অরক্ষিত অবস্থায় পানিতে নামতে দেওয়া বাগেরহাট প্রশাসনের চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয়।
যদি বলা হয়, সেখানে ভক্তদের ধর্মীয় অনুভূতির একটি বিষয় ছিল। তবে এখন কেন দিঘি থেকে কুমিরটিকে সরানো হলো? ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ। তবে তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু মানুষের জীবন রক্ষার চাইতে বড় কোনো অনুভূতি আর থাকতে পারে না। যদি প্রশাসন মনে করে ভক্তদের প্রতিক্রিয়ার ভয়ে নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ এতদিনে নেওয়া হয়নি তাহলে সেটি প্রশাসনিক ব্যর্থতারই সহজ স্বীকারোক্তি। রাষ্ট্রের দায়িত্ব মানুষের জীবন রক্ষা করা। কারো বিশ্বাসকে প্রাধান্য দিয়ে কাউকে হত্যা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়।
ফাতেমার মৃত্যুর পর দিঘি থেকে কুমির সরানো হলো। এই পদক্ষেপ কী আগে নেওয়া যেত না? আগেই যদি দিঘিটি অরক্ষিত রাখা না হতো বা কুমিরটি যদি সরানো হতো তাহলে সেখানে ফাতেমার মৃত্যু হতো না।
ফাতেমার এই ঘটনাকে শুধুই দুর্ঘটনা বলে চালানো যাবে না। এতে জেলা প্রশাসনের দায়িত্ব অবহেলার বিষয়টি আড়াল হয়ে যাবে। সেই দিঘিতে কুমিরের শিকার হয়ে আগেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সেইসাথে সংবাদ মাধ্যমে সতর্ক বার্তার পরও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে ফাতেমার মৃত্যুর দায় এড়ানোর সুযোগ বাগেরহাট প্রশাসনের নেই।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে