শিশুর নিরাপত্তায় পরিবার নাকি রাষ্ট্র বেশি দায়ী?
প্রতিদিন সংবাদমাধ্যম খুললেই শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা, অপহরণ কিংবা শিশুশ্রমের মতো ভয়াবহ খবর চোখে পড়ে। সম্প্রতি রামিসা হত্যাকাণ্ডসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা সমাজকে আবারও গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। কখনও স্কুলে, কখনও বাসায়, কখনও রাস্তায়—শিশুরা যেন কোথাও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। প্রযুক্তির এই যুগে বাস্তব জগতের পাশাপাশি অনলাইন জগতেও শিশুরা নানা ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব কার—পরিবারের, নাকি রাষ্ট্রের?
একটি শিশুর জীবনে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারই শিশুর প্রথম আশ্রয়, প্রথম বিদ্যালয় এবং নিরাপত্তার প্রথম বলয়। একটি শিশু কীভাবে কথা বলবে, মানুষকে বিশ্বাস করবে, বিপদ চিনবে কিংবা নিজের সমস্যার কথা প্রকাশ করবে—এসবের ভিত্তি গড়ে ওঠে পরিবার থেকেই। তাই শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রথম দায়িত্ব নিঃসন্দেহে পরিবারের ওপর বর্তায়।
বর্তমানে অনেক পরিবার সন্তানকে ভৌত সুবিধা দিলেও মানসিক সময় দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশেষ করে চাকরিজীবী মা–বাবার ব্যস্ততার কারণে অনেক শিশু দিনের বড় একটি সময় তত্ত্বাবধানহীন অবস্থায় কাটায়। ফলে অনেক সময় শিশুরা ইচ্ছামতো চলাফেরা করে, অনিরাপদ পরিবেশে মিশে যায় এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তোলে। রাস্তার ফাস্টফুড ও অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে শিশুরা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এছাড়া বাবা–মা কর্মব্যস্ত জীবনে সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগের সুযোগ হারাচ্ছেন। ফলে শিশুর আচরণে পরিবর্তন, মানসিক চাপ কিংবা নির্যাতনের ইঙ্গিত অনেক সময় পরিবারের চোখ এড়িয়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক লজ্জা বা ভয়ের কারণে নির্যাতনের ঘটনাও গোপন রাখা হয়, যা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করে।
শিশুর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পরিবারকে শুধু আবেগগত আশ্রয় দিলেই হবে না, সচেতনও হতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, অনলাইনে কী দেখছে বা কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে—এসব বিষয়ে নজর রাখা জরুরি। শিশুকে ‘না’ বলতে শেখানো, নিজের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করা এবং বিপদে কথা বলার পরিবেশ তৈরি করাও পরিবারের দায়িত্ব।
তবে শুধু পরিবার সচেতন হলেই কি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত সম্ভব? বাস্তবতা বলছে, না। কারণ শিশুরা শুধু ঘরে নয়, সমাজেও বসবাস করে। স্কুল, রাস্তা, গণপরিবহন, খেলার মাঠ কিংবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—সব জায়গায় নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
রাষ্ট্রের প্রধান কাজ হলো আইন ও নিরাপত্তা কাঠামোর মাধ্যমে নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, পাচার বা শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে বিভিন্ন আইন থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ দেখা যায় না। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ কিংবা প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অনেক অপরাধী শাস্তি এড়িয়ে যায়। এতে রামিসা হত্যাকাণ্ডসহ অন্যান্য শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের শিশু আইন ২০১৩ শিশুদের সুরক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন। এই আইনে ১৮ বছরের নিচে সবাইকে শিশু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং তাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার বিধান রাখা হয়েছে। শিশুদের প্রতি নির্যাতন, অবহেলা, শোষণ ও সহিংসতা কঠোরভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পাশাপাশি শিশুদের বিচার প্রক্রিয়ায় আলাদা, শিশু-বান্ধব আদালত ও গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবুও বাস্তবতা হলো, শুধু আইন থাকা যথেষ্ট নয়—তার কার্যকর বাস্তবায়নই মূল বিষয়। আইন থাকলেও বিচারহীনতা বা ধীর বিচারপ্রক্রিয়া অনেক সময় অপরাধকে উৎসাহিত করে।
শিশুদের জন্য নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নির্যাতন প্রতিরোধ ব্যবস্থা, সাইবার নিরাপত্তা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অনেক সময় নির্যাতনের শিকার শিশু ন্যায় বিচারের চেয়ে সামাজিক চাপেই বেশি ভুগে। এই পরিস্থিতি বদলাতে রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ও মানবিক ভূমিকা নিতে হবে।
বিশেষ করে অনলাইনভিত্তিক অপরাধ বর্তমানে শিশুদের জন্য বড় হুমকি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল বা যৌন হয়রানির ঘটনা বাড়ছে। অভিভাবকরা সব সময় প্রযুক্তিতে দক্ষ নাও হতে পারেন। তাই শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সক্রিয় নীতি ও নজরদারি জরুরি।
তবে বাস্তবতা হলো, পরিবার ও রাষ্ট্র—কেউ একা শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। পরিবার সচেতন হলেও যদি সমাজে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায় এবং রাষ্ট্র আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হয় তাহলে শিশুকে সুরক্ষিত রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার রাষ্ট্র শক্তিশালী আইন করলেও যদি পরিবার সন্তানকে অবহেলা করে তাহলেও শিশু ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
শিশুর নিরাপত্তা মূলত একটি যৌথ দায়িত্ব। পরিবার শিশুকে ভালোবাসা, সচেতনতা ও সাহস দেবে; রাষ্ট্র দেবে নিরাপদ পরিবেশ, কার্যকর আইন ও দ্রুত বিচার। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সমাজকেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ শিশুর নিরাপত্তা শুধু একটি পরিবারের বিষয় নয়; এটি পুরো জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।
শিশুরা নিরাপদ থাকলে সমাজ নিরাপদ হবে, রাষ্ট্র এগিয়ে যাবে। তাই দায়িত্ব কার বেশি—এই বিতর্কের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব কতটা আন্তরিকভাবে পালন করছে। কারণ শিশুর নিরাপত্তায় পরিবার কিংবা রাষ্ট্র—কোনো এক পক্ষের ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজের ব্যর্থতায় পরিণত হয়।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে