রাষ্ট্র কি তার নাগরিকদের অভিভাবকত্ব হারিয়েছে?
একটি রাষ্ট্রের শক্তির মাপকাঠি তার জিডিপি বা মেগা প্রকল্প নয়, বরং তার সবচেয়ে অসহায় নাগরিকটি বিপদের দিনে কতটা সুরক্ষা পায়— তাতেই নিহিত থাকে তার প্রকৃত পরিচয়। গাজীপুরের কালিয়াকৈরের উত্তর লস্করচালা গ্রামে ৯ বছরের শিশু আর ১৮ মাসের দুগ্ধপোষ্য সন্তান নিয়ে একজন বিধবা মা যখন রাতভর কবরের পাশে আশ্রয় নেন, তখন আমাদের উন্নয়নের সব তকমা এক লহমায় ফিকে হয়ে যায়। এই দৃশ্য কেবল হাড়হিম করা নিষ্ঠুরতার গল্প নয়, বরং এটি আমাদের রাষ্ট্রের ‘অভিভাবক’ সত্তার এক চরম নৈতিক পরাজয়।
ঘটনাটি আমাদের সামনে এক কঠিন সত্য হাজির করেছে। সুজন মাহমুদের অকাল মৃত্যুর পর তার স্ত্রী সোনিয়া বেগমকে যখন উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে ঘরছাড়া করা হয়, তখন তা আর ঘরোয়া বিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি সরাসরি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিক অধিকারের ওপর কুঠারাঘাত।
‘সালিশি’ সংস্কৃতির আড়ালে বিচারহীনতা
কালিয়াকৈরের এই ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা ছিল বিস্ময়কর রকমের নির্লিপ্ত। আইনের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও পুলিশের পক্ষ থেকে যখন ‘মীমাংসার’ কথা বলা হয়, তখন বুঝতে হবে— আমরা আইনের শাসন নয়, বরং ‘মজবুত’দের শাসন কায়েম করছি। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০-এর ধারা ১০ অনুযায়ী, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির নিজ আবাসস্থলে অবস্থানের অধিকার প্রশ্নাতীত। অথচ সেই আইনকে তোয়াক্কা না করে যখন একজন নারীকে কবরের পাশে রাত কাটাতে হয়, তখন সেই আইনের অস্তিত্ব কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
থানার ‘মীমাংসা’ করার প্রবণতা আসলে অপরাধীকে সুরক্ষা দেওয়ার একটি কৌশল মাত্র। রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সালিশির টেবিলের দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন ভুক্তভোগীর আর্তনাদ আরও দীর্ঘায়িত হয়। এটি এক ধরনের কাঠামোগত নিপীড়ন, যেখানে রক্ষকই পরোক্ষভাবে ভক্ষকের সুযোগ তৈরি করে দেয়।
সম্পত্তির লালসা ও ক্ষয়িষ্ণু সামাজিক মূল্যবোধ
আমাদের সমাজকাঠামোতে উত্তরাধিকার বা ওয়ারিশি সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ নতুন কিছু নয়। কিন্তু সেই বিরোধ মেটাতে যখন দুধের শিশুকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং মৃত ব্যক্তির কবরের পাশে তার পরিবারকে রাত কাটাতে বাধ্য করা হয়, তখন বুঝতে হবে— আমরা সামাজিক মূল্যবোধের একদম তলানিতে এসে ঠেকেছি। মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, সুজন মাহমুদের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে তার স্ত্রী ও সন্তানদের অধিকার সুনির্দিষ্ট। কিন্তু ক্ষমতার দাপটে সেই আইনি অধিকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যেভাবে তাদের উচ্ছেদ করা হলো, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়।
সাংবাদিকতা যখন হুমকির মুখে
এই ঘটনার আরও একটি উদ্বেগজনক দিক হলো সত্য প্রকাশে বাধা দেওয়া। সংবাদকর্মীরা যখন আক্রান্তের পাশে দাঁড়িয়ে সত্য তুলে ধরতে চেয়েছেন, তখন তাদের হুমকি প্রদান করা হয়েছে। এটি একটি সুসংগঠিত চক্রের কাজ, যারা মনে করে রাষ্ট্র ও সমাজ তাদের মুঠোয়। প্রশাসনের নাকের ডগায় সাংবাদিকদের ভয় দেখানো মানে হলো— একটি নির্দিষ্ট মহল নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে বলে প্রকাশ্যে ঘোষণা করছে। আর এই ধৃষ্টতার নেপথ্যে প্রশাসনের নির্লিপ্ততা এক ধরনের মৌন সম্মতি হিসেবেই বিবেচিত হয়।
রাষ্ট্রের প্রতি তিনটি জরুরি প্রশ্ন
এই ট্র্যাজেডি আমাদের সামনে তিনটি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে:
প্রথমত, রাষ্ট্রের যে সুরক্ষা-বলয় থাকার কথা, সংকটকালে তা সোনিয়া বেগমের দরজায় পৌঁছাতে কেন ব্যর্থ হলো?
দ্বিতীয়ত, পারিবারিক সুরক্ষা আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে স্থানীয় কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা কেন নেই?
তৃতীয়ত, উন্নয়নের মেগা আখ্যানের আড়ালে এতিম শিশুদের কান্নার শব্দ কি আমরা আদৌ শুনতে পাচ্ছি?
প্রতিকার ও প্রত্যাশা
এই ঘটনার প্রতিকার কেবল সোনিয়া বেগমকে ঘরে ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং অপরাধীদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করা দরকার, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সম্পদলোভী ব্যক্তি বিধবা বা এতিমের ওপর হাত তোলার সাহস না পায়। কফিল উদ্দিনসহ সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি উপজেলা সমাজসেবা ও মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাত্ত্বিক দায়বদ্ধতার খোলস ছেড়ে মাঠ পর্যায়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
উন্নয়নের বিশাল ইমারত কখনো কোনো এতিম শিশুর চোখের জল মুছে দিতে পারে না। সোনিয়া বেগমরা যখন বিচার চেয়ে স্বামীর কবরের পাশে দাঁড়ান, তখন সেই বিচারহীনতার দায় আমাদের সবার। রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে— সে কেবল শক্তিশালী বা বিত্তবানদের জন্য নয়, বরং প্রতিটি অসহায় নাগরিকের নিরাপদ আশ্রয়। গাজীপুরের এই ট্র্যাজেডি যেন বিচারহীনতার ডাস্টবিনে হারিয়ে না যায়; বরং এটি হোক আমাদের ঘুণে ধরা প্রশাসনিক ও বিচারিক কাঠামো সংস্কারের এক সুদৃঢ় সূচনা।
স্মরণ রাখতে হবে, যে মাটি একজন মৃত মানুষকে ধারণ করে, সেই মাটিই একদিন জীবন্ত অপরাধীদের বিচার করে। আমরা কি সেই বিচারের জন্য প্রস্তুত?
মো. শামীউল আলীম শাওন
লেখক ও উন্নয়নকর্মী (শ্রেষ্ঠ যুব সম্মাননাপ্রাপ্ত)
প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি, ইয়ুথ অ্যাকশন ফর সোশ্যাল চেঞ্জ (YASC), রাজশাহী

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে