রাজনীতি ও জনপ্রশাসন
‘কারিডোরে’ পৃথিবী জুড়ছে পথ, আমরা খুঁজছি দিশা
পৃথিবীর মানচিত্র মেলে ধরলে এখন মনে হয়, বড়সড় একটি বাড়িতে মেরামতের কাজ চলছে। কেউ পাহাড় কেটে রেল বসাচ্ছে, কেউ মরুভূমিতে সড়ক টানছে, কেউ বন্দরের সঙ্গে বন্দর জুড়ছে। চীন ইউরোপে পৌঁছানোর পথ বাড়াচ্ছে, ভারত আরব উপদ্বীপ হয়ে পশ্চিমে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। কাজাখস্তান, তুরস্ক, লাওস—সবাই নিজের উঠান দিয়ে বাণিজ্যের চলাচল বাড়াতে ব্যস্ত। বাংলাদেশ বসে আছে এমন এক মোড়ে, যার চারদিকে সম্ভাবনা। শুধু আমাদের যাত্রার ঠিকানাটি এখনও পরিষ্কার নয়।
গণতন্ত্রের পায়ের কাছে গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকে আফগান উদ্বাস্তু জীবন
দিনটি ছিল ১৬ আগস্ট ২০২১। তার আগের দিন তালেবান কাবুল দখল করেছে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের শেষ অধ্যায় তখনও চলছে। কাবুলের হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সেদিন যে দৃশ্য তৈরি হয়েছিল, সেটিকে শুধু বিশৃঙ্খলা বললে সম্ভবত কম বলা হয়। সেটি ছিল একটি দেশের মানুষের হঠাৎ বুঝতে পারা—নিজের মাটিতেও আর নিরাপদ থাকার নিশ্চয়তা নেই।
নেপালের দুর্যোগ-কূটনীতি: হিমালয়ের বিপর্যয় কেন রাজনৈতিক লড়াইয়ের মঞ্চ
২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে একটি বিশাল হিমবাহ ও শিলাধসের ফলে সৃষ্ট পানির স্রোত ভুটেকোশি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকা দিয়ে নেমে আসে। মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে যায় বহু গ্রাম, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং চীনের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ গিরং সীমান্ত ক্রসিং। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পর নেপালে মৃতের সংখ্যা ১,৩০০ ছাড়িয়েছে, নিখোঁজ রয়েছেন আরও কয়েক হাজার মানুষ। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে প্রায় ৯,০০০ মানুষের মৃত্যুর পর এটিই দেশটির সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ। তবে এই মানবিক বিপর্যয়ের বাইরেও বন্যাটি নেপালের ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং সদ্য ক্ষমতায় আসা একটি অনভিজ্ঞ সরকারের জনমত ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের সামনে ভূগোলের নতুন পাঠ
পৃথিবী এখন বড়ই অস্থির। চারদিকে যুদ্ধের দামামা, শক্তির নতুন বিন্যাস, পুরোনো মানচিত্রে নতুন করে ঘষামাজা। মানচিত্রেরও একটি নীরব ভাষা আছে। শান্তির সময়ে যে মরুভূমি, পাহাড় কিংবা স্থলবেষ্টিত অঞ্চলকে নিছক কয়েকটি রঙের খোপ বলে মনে হয়, যুদ্ধ শুরু হলেই তার দাম নতুন করে নির্ধারিত হয়। তখন একটি বন্দর আর শুধু বন্দর থাকে না, রেললাইন হয়ে ওঠে কৌশলগত সম্পদ, একটি প্রণালি হয়ে ওঠে বিশ্বের জ্বালানি-শিরা, আর প্রতিবেশী রাষ্ট্র কখনো বাজার, কখনো করিডর, কখনো নিরাপত্তার ঢাল।
সমুদ্রের বুকে বন্দর, দিগন্তে শক্তির ছায়া
য়তনে বিশাল কিন্তু স্বভাবে শান্ত। ভারত মহাসাগরকে দূর থেকে দেখলে এমনটাই মনে হয়। নীল জল। দীর্ঘ নৌপথ। সারি সারি বাণিজ্যিক জাহাজ। কিন্তু গত এক দশকে দৃশ্যটি বদলেছে। সমুদ্রের চারদিকে শুরু হয়েছে বড় বড় নির্মাণকাজ। কোথাও গভীর সমুদ্রবন্দর। কোথাও দীর্ঘ রানওয়ে। কোথাও সামরিক ঘাঁটি। সরকারি ভাষায় এগুলো বাণিজ্য, যোগাযোগ ও নিরাপত্তার প্রকল্প। তবে বন্দর নির্মাণের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত হিসাবও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
একাত্তরের কালোছায়া বেলুচিস্তানে: মানচিত্র বদলায়, কৌশল বদলায় না
পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে ‘শান্তি’ শব্দটির একটি অস্বস্তিকর অতীত আছে। দেশটির রাজনীতিতে নির্বাচন হয়, সংসদ বসে, প্রধানমন্ত্রী শপথ নেন; কিন্তু ক্ষমতার পাশেই অদৃশ্য এক কাঁচের চেয়ারে বসে থাকে দেশটির সামরিক বাহিনীর প্রধান যিনি ক্ষমতার দিক থেকে দেশটির নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও শক্তিশালী। আর যখন কেন্দ্রের সঙ্গে কোনো প্রান্তের রাজনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ে, তখন কথোপকথনের জায়গা খুব দ্রুত দখল করে নেয় নিরাপত্তার ভাষা। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে আমরা এই ভাষা শুনেছি, দেখেছিও। এখন পাকিস্তানের পশ্চিম প্রান্তের বেলুচিস্তানের দিকে তাকালে সেই পুরোনো অভিধানের কয়েকটি পাতাই যেনো সবার সামনে খুলে যায়।
ইলিশের রাজনীতি: গুজব, নীরবতা ও বাস্তবতা
২০২৫ সালের অক্টোবরে, দুর্গাপূজার ঠিক আগে, ঢাকার কারওয়ান বাজারে এক কেজি ইলিশের দর উঠেছিল প্রায় ২,৯০০ টাকায়। অথচ যে জেলে মেঘনার মোহনায় সারা রাত জাল বেয়ে সেই মাছ তুলছেন, মাসের পর মাস তাঁর নিজের সন্তানের প্লেটে এক টুকরো ইলিশও ওঠে না। ব্যাপারটা এতটাই উল্টো যে দেশের অন্যতম শীর্ষ ইলিশ-বিজ্ঞানী আনিসুর রহমান পর্যন্ত প্রথম আলোকে বলেছেন, এবার ইলিশের দাম সত্যিই অস্বাভাবিক। এ দেশে ইলিশের প্রাচুর্য আছে। তারপরও এর এত দাম মেনে নেওয়া যায় না।১
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি: ক্ষমতা যার সীমিত, সুযোগ-সুবিধা বিস্তৃত
দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার। জাতীয় সংসদের সভাকক্ষে বেলা দুইটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ হবে। তবে সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এবারের নির্বাচন অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতার পর্যায়ে রয়েছে। বিএনপির প্রার্থী দলটির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন—ভোটের অঙ্কে এমন সম্ভাবনাই স্পষ্ট।
ছয় মাসে সরকারের পথচলা: প্রতিশ্রুতির ভার বনাম বাস্তবতার কষ্টিপাথর
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন তারেক রহমান। সেই দিন থেকে আজ পর্যন্ত সময়ের হিসাবে পেরিয়ে গেছে ঠিক ছয় মাস বা ১৮০ দিন। সংখ্যায় সময়টা হয়তো খুব বেশি নয়, কিন্তু একটি রাষ্ট্রের জন্য ছয় মাস কখনো কখনো এক দশকের সমান ভারী হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঝড় সামলে যখন কোনো সরকার নতুন করে রাষ্ট্রের হাল ধরে, তখন প্রথম ছয় মাস আর নিছক ক্যালেন্ডারের কয়েকটি পাতা থাকে না; তা হয়ে ওঠে জনআস্থা ও রাষ্ট্রক্ষমতার মধ্যকার এক নীরব পরীক্ষার মঞ্চ। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির খাতায় লেখা স্বপ্নগুলো বাস্তবের কঠিন মাটিতে কতটা শিকড় গাড়তে পেরেছে, আর কতটা রয়ে গেছে কেবল কালিতে লেখা শব্দ হয়ে; এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়েই শুরু হয় সরকারের আসল পরীক্ষা।
ভাঙা পাকিস্তানকে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন ভুট্টো
১৯৭৪ সালের জুন মাসের শেষ সপ্তাহে ঢাকা সফরে এসেছিলেন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। রাষ্ট্রীয় আচারের অংশ হলেও সে সময় ভুট্টো সাভার স্মৃতিসৌধে যেতে অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কঠোর অবস্থানে ১৯৭১ সালের শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে যেতে বাধ্য হন ভুট্টো। তবে চতুর ভুট্টো দাপ্তরিক পোশাক নয়, স্মৃতিসৌধে যান টি-শার্ট আর গলফ টুপি পরে। তাঁর আপত্তি ছিল—সেখানে কোনো বিউগল বাজবে না, পুষ্পমাল্য অর্পণ করতে হবে না, থাকবে না কোনো গান স্যালুট! এই ছিলেন ভুট্টো। বাঙালি জাতি আর তাঁর বীর শহীদদের প্রতি এই ছিল তাঁর মনোভাব। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি ছিল সীমাহীন ক্ষোভ, ঘৃণা আর রাজনৈতিক ঈর্ষা।