এম.এ. মঞ্জুর কেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা প্রক্রিয়ায় যুক্ত হলেন তা আজও বোধগম্য নয়
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরবেলা চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে বর্বর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এটি ছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র এক দশকের মধ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি হত্যা। যে ঘটনায় অন্যতম প্রধান চরিত্র মেজর জেনারেল এম.এ. মঞ্জুর। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর এম.এ. মঞ্জুর পুরো ঘটনার দায় নিয়ে চট্টগ্রামে এই ধরনের বিদ্রোহ করেছিলেন। মার্শাল ল জারি করাসহ চার দফা দাবিও পেশ করেছিলেন । ঘোষণা দিয়েছিলেন একটি বিপ্লবী পরিষদের। যদিও খুব দ্রুত এম.এ. মঞ্জুর ঘটনাপ্রবাহে তাঁর লাগাম হারিয়ে ফেলেন। পরে তিনিও ২ জুন চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অত্যন্ত নির্মমভাবে নিহত হন।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের ৩১ বছর পর সেই ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ২০১২ সালে খোলামেলা কথা বলেছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) আমীন আহম্মদ চৌধুরী বীর বিক্রম। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন পেশাগত ও ব্যক্তিজীবনে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খুব কাছের মানুষ ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) আমীন আহম্মদ চৌধুরী। ১৯৭১ সালের রণাঙ্গণে তিনি জিয়াউর রহমানের অধীনে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। একটি প্রকাশনার জন্য আমীন আহম্মদ চৌধুরী গুলশানের বাসায় এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাহাত মিনহাজ। উল্লেখ্য ২০১৩ সালের ১৯ এপ্রিল তিনি বার্ধক্যজনিতকারণে মারা যান মেজর জেনারেল (অব.) আমীন আহম্মদ চৌধুরী বীর বিক্রম ।
১৯৮১ সালের মে মাসে আপনি কোন পদে, কোথায় কর্মরত ছিলেন?
তখন আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কর্নেল হিসেবে সিলেটের জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্টে স্কুল অব ইনফেনট্রির কমাডান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলাম।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের খবর আপনি কখন কীভাবে পেয়েছিলেন?
সেদিন কুমিল্লার জিওসি মেজর জেনারেল সামাদ সিলেটে ছিলেন। সকালে তার সাথে আমি হযরত শাহজালাল (রা.) এর মাজারে যাই। সেখানে সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ওয়ারলেসের মাধ্যমে আমরা এ খবরটি পাই। এই খবরে আমরা খুবই মর্মাহত হয়েছিলাম। মেজর জেনারেল সামাদ আমাকে বলেন, আমীন তুমি আমার সাথে থাকো।
এই বিদ্রোহ বা রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যাকাণ্ডের পেছনে কি কারন ছিল বলে আপনি মনে করেন?
তখন একটা অস্থির সময় চলছিল। জিয়াউর রহমান আরও রাজনৈতিক সংস্কার আনতে চাচ্ছিলেন। পাশাপাশি প্রশাসনেও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করছিলেন। যার প্রেক্ষাপটে তিনি অনেকের বিরাগভাজন হন। এছাড়া জিয়া রাজনীতি করতে গিয়ে স্বাধীনতা বিরোধী অনেক নেতাকে বিশেষ করে শাহ আজিজসহ আরও অনেককে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। এতে সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও সেনা সদস্যরা ক্ষুব্ধ ছিলেন। বলা যায় নানামুখী ঘটনাপ্রবাহের শিকার হয়ে জিয়াউর রহমানকে প্রাণ দিতে হয়েছিল।
তার মানে কী জিয়াউর রহমান বীর উত্তর রাজনীতি নিয়ে বেশ কঠিন পরিস্থিতিতে ছিলেন?
জিয়াউর রহমান ৬০ এর দশকের গণতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাস করতেন না। যে চেতনায় বঙ্গবন্ধু বাঙ্গালি জাতিকে স্বাধীনতার পথে পরিচালিত করেছিলেন। তিনি জাসদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রতি আস্থা রাখতে পারেননি। একইসাথে তিনি তুরস্কের মত ইসলামিক চেতনায় দেশ পরিচালনা করতেও চাননি। ফলে তাঁকে নিয়ে সেনাবাহিনী, সাধারণ মানুষ ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছিল। যা জিয়াউর রহমানের বিরোধী শক্তিকে শক্তিশালী করে তোলে। তাঁরা ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্র পেয়ে যায়।
এ ঘটনার পেছনে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও জিওসি মঞ্জুরের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের কতটুকু ভূমিকা ছিল বলে আপনি মনে করেন?
মঞ্জু আর জিয়া কিন্তু ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। ৭ নভেম্বর ১৯৭৪ সিপাহী-জনতার বিপ্লবের পর জিয়া মঞ্জুরকে ভারত থেকে থেকে ডেকে আনেন। সে সময় দুই জন কিন্তু ঘনিষ্ঠ থেকে অনেক কাজ করেছেন। তবে দ্বন্দ্ব বাঁধে শওকত, মঞ্জুর ও এরশাদের প্রভাব বলয় নিয়ে। মঞ্জুর সেনা প্রধান হতে চেয়েছিলেন। শওকত তাঁর দুই থেকে আড়াই বছর সিনিয়র ছিলেন। জিয়া তাঁকে আগে সেনা প্রধান করতে চেয়েছিলেন। তবে দুইজনের উদ্ধত মনোভাব আর দ্বন্দ্বে বিরক্ত হয়ে জিয়া এরশাদকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। এতে মঞ্জুর ক্ষুব্ধ হন। তবে এ ক্ষুব্ধতা থেকে মঞ্জুর জিয়াকে হত্যা করতে পারে এ বিষয়টি অকল্পনীয় ছিল ।
তাহলে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পেছনে কে বা কারা ছিল বলে আপনার মনে হয়?
দেখুন এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিচার বিভাগীয় কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। তাই এ নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা মুশকিল। তবে সে সময়ে ঘটনাপ্রবাহ ও নানা দিক বিশ্লেষণ করে বলা যায়, যারা এ ঘটনার পেছনে ছিল তাঁরা খুবই চতুর ছিলেন। তারা এক ঢিলে দুই পাখি নয়, তিন পাখি মেরেছিল। এক. জিয়াউর রহমান, দুই. মঞ্জুর এবং তিন. সেনাবাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী অফিসার্সবৃন্দ। জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর ১৩ জনকে ফাঁসি ও আরও ১০-১২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে এক ধরনের শুদ্ধি অভিযান চালানো হয়েছিল। যাতে শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে সেনাবাহিনী ছাড়তে বাধ্য করা হয়। যার পুরোপুরি সুফল ভোগ করেছিলো তখনকার শাসকগোষ্ঠী।
তারা কারা?
এটা পরিস্কার করে বলা মুশকিল। তবে ১৯৮১ তে জেনারেল এরশাদের অবসরে যাওয়ার কথা ছিল। এছাড়া জিয়াউর রহমানকে সরাসরি গুলি করে হত্যাকারী লে.কর্নেল মতির সাথে সেনাপ্রধানের একটি অনির্ধারিত বৈঠকের কথাও শোনা গিয়েছিল। তবে মতিউরের তখন একটা কোর্সে দেশের বাইরে যাওয়ার কথা ছিল। সে বিষয়ে এরশাদ তাঁর সাথে দেখা করে থাকতে পারেন। আবার এ ক্ষেত্রে কোন ধরনের ষড়যন্ত্র নাও হয়ে থাকতে পারে। এছাড়া রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন আগে এরশাদের সাথে মঞ্জুরের একটা আলাপচারিতার কথাও সে সময়ে চাউর ছিল। যদিও মঞ্জুর কোনভাবেই এরশাদকে সহ্য করতে পারতেন না। এমনকি এমনও শোনা যায় এরশাদকে স্যলুট করতেও মঞ্জুর অনেকবার অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন। এ বাস্তবতায় মঞ্জুরের সাথে এরশাদ কী নিয়ে বৈঠক করেছিলেন তাও এক ধরনের রহস্য। যার জট আজও খোলেনি।
কিন্তু এ বিদ্রোহ বা ব্যর্থ অভ্যুত্থান বা জিয়াকে হত্যার মাধ্যমে জিওসি মঞ্জুর ঠিক কী করতে চেয়েছিলেন?
মঞ্জুর একজন চৌকস আর প্রতিভাবান অফিসার ছিলেন। অফিসার হিসেবে তাঁর যোগ্যতা ছিল আন্তর্জাতিক মানের। তবে মঞ্জুর কেন জিয়াকে হত্যা প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে গেলেন তা আজও আমি ঠিক বুঝতে পারি না। কারণ চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যা করে অভ্যুত্থান করা সম্ভব নয়। এছাড়া জিয়াউর রহমান মঞ্জুরের বড় শত্রু ছিলেন না। তবে কেন এ ঘটনা ঘটলো আমি ঠিক হিসেব মেলাতে পারি না। এছাড়া মঞ্জুর ঠিক জিয়াকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন কি না সে বিষয়েও আমি সন্দিহান। কারণ তাঁর মতো একজন অফিসারের পক্ষে এমন অপরিপক্ক চিন্তা করা সম্ভব নয় বলে আশার দৃঢ় বিশ্বাস।
চট্ট্রগামের জিওসি মঞ্জুরের নিহত হওয়ার খবর আপনি কীভাবে পেলেছিলেন? তাঁর মৃত্যু নিয়ে টেলিভিশন রেডিওতে যা প্রচার করা হয়েছিল তা কি তখন সবাই বিশ্বাস করেছিল?
তাঁর মৃত্যু খবর টেলিভিশন ও পত্র-পত্রিকায় ফলাও করে প্রচার করা হয়। বলা হয় একদল বিক্ষুব্ধ সেনা সদস্যের হাতে তিনি নিহত হয়েছেন। কিন্তু বিষয়টা ছিল নির্জলা মিথ্যাচার। তাঁকে একজন অফিসার খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে। এ অফিসার কার নির্দেশে এ কাজ করেছিলেন তা আজও জানা যায়নি। কোনদিন হয়তো আর জানাও যাবে না। এটাই দুঃখের বিষয়।
(সাক্ষাৎকারগ্রহীতা রাহাত মিনহাজ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।)

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে