মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: পতনের পর কোন পথে?
২০২৬ সালের ৪ মে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। বিজেপি ২৯৪টির মধ্যে ২০৭টি আসন জিতে রাজ্যে প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করেছে। তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ৮০টি আসনে সীমিত হয়ে গেছে। কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় ঘটনা হলো— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরেও শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫,১১৪ ভোটে পরাজিত হয়েছেন। যে কেন্দ্রে ২০২১ সালে তিনি ৭০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েছিলেন, সেখানেই এই পরাজয় কেবল রাজনৈতিক নয়, প্রতীকী অর্থেও অত্যন্ত গভীর।
পনেরো বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী থাকা, ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসান ঘটানো— এই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে। কিন্তু তাকে যারা সহজেই ‘শেষ’ বলে দিচ্ছেন, তারাও হয়তো ভুল করছেন। কারণ পঞ্চাশ বছরের রাজনৈতিক জীবনে মমতা একাধিকবার প্রায় শেষ হয়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। প্রশ্ন হলো— এবার কি সেটা সম্ভব?
ফলাফল প্রকাশের পরদিনই কালীঘাটের বাসভবনে এক উত্তাল সংবাদ সম্মেলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেন — ‘পদত্যাগের প্রশ্নই আসে না। আমরা জনগণের রায়ে নয়, ষড়যন্ত্রে পরাজিত হয়েছি।’ তিনি নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি পক্ষপাতের অভিযোগ আনেন এবং দাবি করেন যে ভোটে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে। দলীয় বৈঠকে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করলে করুক, আমাকে বরখাস্ত করলে করুক।’ এই বিদ্রোহী স্বর তার চিরপরিচিত লড়াকু সত্তার প্রতিফলন, কিন্তু এবার তা সাংবিধানিক সংকটের জন্ম দিয়েছিল।
ভারতীয় সংবিধানের ১৬৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালের সন্তুষ্টি অনুযায়ী পদে থাকেন, যা মূলত বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে যুক্ত। তৃণমূল স্পষ্টতই সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। তাই মমতার পদে থাকা সাংবিধানিকভাবে ক্রমশ অযৌক্তিক হয়ে পড়ছিল। শেষমেশ ৭ মে রাজ্যপাল আর এন রবি সংবিধানের ১৭৪(২)(খ) অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে বিধানসভা ভেঙে দেন। রাজ্যপালের একলাইনের চিঠিতে লেখা ছিল যে ভারতীয় সংবিধানের ১৭৪(২)(খ) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ৭ মে ২০২৬ তারিখ থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভেঙে দেওয়া হলো। এভাবেই মমতার পদত্যাগ না করার পরিকল্পনা স্বতঃই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
এই পুরো ঘটনাক্রম ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে গেলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী, যিনি নির্বাচনে পরাজিত হয়েও পদত্যাগ করলেন না এবং বিধানসভার মেয়াদ শেষে স্বতঃই পদ হারালেন। তৃণমূলের রাজ্যসভা সাংসদ সাগরিকা ঘোষ 'দ্য প্রিন্ট' পত্রিকায় কলামে লিখেছেন, মমতা কর্তৃত্ববাদের বিরোধিতা করছেন না— তিনি নিজেই সেই পথে হাঁটছেন। এই মন্তব্য দলের ভেতর থেকে আসা বলেই তা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
কবিতা ও মনোবলের রাজনীতি
পরাজয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ব্রেভ’ শিরোনামে ইংরেজিতে লেখা একটি কবিতা প্রকাশ করেছেন। সহজ-সরল ভাষায় লেখা এই কবিতায় সাহস, আত্মমর্যাদা ও প্রতিকূলতায় মাথা না-নোয়ানোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। ‘সাহসী ও শক্তিশালী হও’— এই প্রথম লাইনটি একই সঙ্গে ব্যক্তিগত আত্মকথন এবং বিপর্যস্ত তৃণমূল কর্মীদের উদ্দেশে বার্তা। মমতার কবিতা লেখার অভ্যাস নতুন নয়, কিন্তু এবার তার রাজনৈতিক প্রতীকী মূল্য অনেক বেশি।
এই কবিতা যদি কেবল আবেগের প্রকাশ হতো, তাহলে হয়তো এতটা মনোযোগ পেত না। কিন্তু এটি এসেছে এমন একটি সময়ে যখন তৃণমূলের বহু নেতাকর্মী দিশেহারা, কেউ কেউ ইতিমধ্যে বিজয়ী শিবিরের দিকে ঝুঁকছেন। এই পরিস্থিতিতে কবিতার মাধ্যমে দলীয় মনোবল ধরে রাখার এই কৌশল মমতার সুচিন্তিত রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
দল পুনর্গঠন ও অনলাইন রণকৌশল
পরাজয়ের ঠিক পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দলের অনলাইন প্রচার দলের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন। এটাই ছিল ভোটের পর তৃণমূলের ‘ডিজিটাল যোদ্ধাদের’ সঙ্গে প্রথম বৈঠক। বৈঠকে একটি বার্তাই বারবার দেওয়া হয়েছে— মনোবল ভাঙলে চলবে না, লড়াই চলবে। মমতা সকলকে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হতে বলেছেন। দলের তথ্যপ্রযুক্তি শাখাও পুনর্গঠিত হয়েছে— দীর্ঘদিনের দায়িত্বপ্রাপ্ত দেবাংশু ভট্টাচার্যের পরিবর্তে একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়েছে, যেখানে প্রথম নাম উপাসনা চৌধুরীর, দ্বিতীয় নাম দেবাংশুর।
এর পাশাপাশি জেলার শীর্ষ নেতাদের নিয়ে পৃথক বৈঠক ডেকেছেন মমতা। ১৪ ও ১৫ মে কালীঘাটে সাংসদ ও পরাজিত প্রার্থীদের সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠকের সূচি রয়েছে। বিভিন্ন জেলার সভাপতিদের কাছে লিখিত বার্তা পাঠানো হয়েছে। স্পষ্টতই মমতা যতটা সম্ভব দ্রুত দলের ভাঙন রুখতে এবং নতুন লড়াইয়ের জন্য সংগঠন প্রস্তুত করতে চাইছেন। এই তড়িৎ পদক্ষেপ তার রাজনৈতিক প্রবৃত্তি ও অভিজ্ঞতার প্রমাণ।
বিরোধী ঐক্য ও ‘ইন্ডিয়া’ জোটের কৌশল
শুভেন্দু অধিকারীর শপথগ্রহণের দিনই হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাসভবনে দাঁড়িয়ে মমতা বাম, অতিবাম ও সব বিরোধী দলকে আহ্বান জানান। তার কথায়, ‘শত্রুর শত্রুকেই এখন বন্ধু বলে ভাবতে প্রস্তুত তিনি।’ আলোচনার জন্য বাড়িতে কখন থেকে কখন তাকে পাওয়া যাবে, সেটাও একই নিঃশ্বাসে জানিয়ে দেন। এটি কেবল কৌশলগত নয়— এটা একটি মহাকাব্যিক রাজনৈতিক বৃত্তের পরিসমাপ্তিও। যে বামপন্থীদের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে মমতা ক্ষমতায় এসেছিলেন, ঠিক পনেরো বছর পরে সেই বামপন্থীদেরই তিনি সঙ্গী হিসেবে চাইছেন।
বামপন্থী দলগুলো অবশ্য এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু জাতীয় স্তরে চিত্রটা ভিন্ন। রাহুল গান্ধী ফোন করে মমতার ‘ভোট চুরির’ অভিযোগকে সমর্থন জানিয়েছেন। দলীয় বৈঠকে মমতা-অভিষেক স্পষ্ট করেছেন, ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ‘ইন্ডিয়া’ জোটকে আরও শক্তিশালী করাই এখন তাদের মূল লক্ষ্য। সংসদে তৃণমূলের ৪২ জন সাংসদ (লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে) এবং ৪১ শতাংশ ভোট এখনো তাদের জাতীয় রাজনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য শক্তি হিসেবে রাখে। এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কংগ্রেস ও অন্যান্য আঞ্চলিক দলের সঙ্গে দরকষাকষিতে মমতা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন।
সুপ্রিম কোর্টেও তৃণমূলের লড়াই চলছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯০ লাখ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন— এই বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালত তৃণমূল নেতাদের নতুন আর্জি দায়ের করতে বলেছে, যেখানে জয়ের ব্যবধান মুছে যাওয়া ভোটের চেয়ে কম ছিল। এই আইনি লড়াই যদি সফল হয়, তাহলে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে এবং মমতার রাজনৈতিক আখ্যানে নতুন মাত্রা যোগ হবে।
মমতা কি আবার উঠে দাঁড়াতে পারেন?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবন একটি দীর্ঘ ও বহু উত্থান-পতনের গল্প। ১৯৮৪ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে যাদবপুরে প্রবীণ সিপিআইএম নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে তিনি ভারতের অন্যতম কনিষ্ঠ সাংসদ হয়েছিলেন। ১৯৮৯ সালে হেরেছিলেন, ১৯৯১ সালে আবার ফিরে এসেছিলেন। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, ২০০১ সালে বিধানসভায় ভরাডুবির পর দল ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল— তবুও তিনি থেমে যাননি। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের মাটি থেকে নতুন শক্তি সংগ্রহ করে ২০১১ সালে ইতিহাস গড়েছিলেন।
কলকাতার রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিখা মুখার্জি বিবিসিকে বলেছেন, ‘মমতার রাজনৈতিক জীবনে বহুবার বাধা এসেছে। ২০০১ সালে তার দল প্রায় ধ্বংসের মুখে পড়েছিল, কিন্তু তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন, দলকে পুনর্গঠিত করেছেন। এটা তার লড়াই করার ক্ষমতার প্রমাণ।’ প্রতীচী ট্রাস্টের গবেষক সাবির আহমেদ বলেছেন, ‘মমতার সাফল্যের মূলে ছিল সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার অসাধারণ সংযোগ— গ্রামীণ মানুষের উঠোনে বসে তাদের ভাষায় কথা বলতে পারার ক্ষমতাই তাকে এত জনপ্রিয় করেছিল।’
তবে এবারের পরিস্থিতি আগের চেয়ে কঠিন। বয়স সত্তর পেরিয়ে গেছে। দীর্ঘ ক্ষমতায় থেকে শরীর ও রাজনৈতিক শক্তি দুটোই কিছুটা ক্ষয় পেয়েছে। বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস বলে এই রাজ্যের মানুষ একবার যে দলকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়, তাদের আর ফেরত নেয় না। বামফ্রন্ট সেই প্রমাণ রেখে গেছে। মমতাকে সেই নজির ভাঙতে হবে— যা ইতিহাসে আজও অভূতপূর্ব।
ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে তিনটি চ্যালেঞ্জ
প্রথম চ্যালেঞ্জ: দলকে অক্ষত রাখা
এই শোচনীয় পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেস ভেতর থেকে ভাঙতে শুরু করতে পারে। বিজয়ী শিবিরে যোগ দেওয়ার ঢল নামা শুরু হয়েছে। ক্ষমতায় থাকার সময় অন্য দল থেকে নেতা ভাঙিয়ে আনার যে সংস্কৃতি তৃণমূল তৈরি করেছিল, এখন সেই একই সংস্কৃতির শিকার হতে পারে দলটি নিজেই। ক্ষমতা থাকলে যারা তৃণমূলের পতাকা বহন করে, ক্ষমতা না থাকলে তারা অনেকেই সরে যায়— এটা ভারতীয় রাজনীতির এক কঠোর বাস্তবতা। এই ভাঙন রোখাই এই মুহূর্তে মমতার সবচেয়ে জরুরি কাজ।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ: অভিষেক
তৃণমূল কংগ্রেসে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা এবং তার নেতৃত্বের ধরন নিয়ে দলের ভেতরে বিক্ষোভ এখন প্রকাশ্যে আসছে। বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অভিষেকের ব্যবসায়িক ধাঁচে দল পরিচালনা, পরামর্শদাতা সংস্থার হাতে কর্তৃত্ব তুলে দেওয়া এবং দুর্নীতি ও ঔদ্ধত্যের ভূরি ভূরি অভিযোগ এখন খোলামেলা আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দুর্নীতির মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলো অভিষেকের বিরুদ্ধে সক্রিয় হলে সমস্যা আরও বাড়বে। মমতার অঘোষিত উত্তরসূরি হিসেবে তিনি যতটা প্রভাবশালী হতে চেয়েছেন, দলের বিপর্যয়ে তার ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মমতা পিশি ও অভিষেক ভাইপোর মধ্যে ভারসাম্য রাখা মমতার জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ: পুরনো ‘বিরোধী মমতা’কে পুনরাবিষ্কার করা
মমতার রাজনৈতিক পরিচয় দুটো পর্বে বিভক্ত— ২০১১ সালের আগে বিরোধীদলীয় নেত্রী, আর তার পরে মুখ্যমন্ত্রী। বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে তার সাফল্যের ইতিহাস অসাধারণ। কিন্তু বামপন্থী নেতা প্রয়াত শ্যামল চক্রবর্তী যেমন বলেছিলেন, ‘বন্যেরা বনে সুন্দর আর মমতা ব্যানার্জি বিরোধী দলে!’ — এই কথাটা এখন নতুন তাৎপর্য পেয়েছে। প্রশ্ন হলো, ১৫ বছরের ক্ষমতার পরে তিনি কি আবার সেই পুরনো ‘রাজপথের মমতা’ হয়ে উঠতে পারবেন? নতুন বিজেপি সরকারের ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে কোনো বড় ইস্যুতে জনআন্দোলন গড়তে পারবেন? এটাই তার রাজনৈতিক পুনরুত্থানের চাবিকাঠি।
ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় ভাঁটা পড়েছে?
দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের একটা বড় অংশের ধারণা ছিল, দলের নেতাকর্মীরা যতই দুর্নীতিতে জড়িত থাকুক, মমতা ব্যানার্জী নিজে সেই কলঙ্ক থেকে মুক্ত। তার নীল-সাদা হাওয়াই চটি, সাদামাটা জীবনযাপন, সাধারণ বাঙালি শাড়ি— এই সততার পরিচয় তাকে অন্য রাজনীতিকদের থেকে আলাদা করে রেখেছিল। কিন্তু ২০২৬-এর নির্বাচনের ফল প্রমাণ করে দিয়েছে, দলের দুর্নীতির দায় ক্রমশ ব্যক্তি মমতাকেও স্পর্শ করেছে।
বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, রেশন কেলেঙ্কারি, আর জি কর মেডিকেল কলেজ কাণ্ড— এই ইস্যুগুলো শেষপর্যন্ত তৃণমূলের শাসনের বিরুদ্ধে প্রবল জনমত তৈরি করেছে। শিল্প না আসা, কর্মসংস্থান না হওয়া, রাজনৈতিক হিংসা— এই অভিযোগগুলো দেড় দশকে পুঞ্জীভূত হয়ে শেষমেশ ভোটে প্রতিফলিত হয়েছে। মমতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দলের সব ব্যর্থতা ঢেকে রাখার মতো আর যথেষ্ট ছিল না।
প্রবীণ সাংবাদিক রন্তিদেব সেনগুপ্ত যথার্থই বলেছেন যে মমতাকে রাতারাতি অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা করা ভুল। ৮০ জন বিধায়ক, ৪২ জন সাংসদ, ৪১ শতাংশ ভোট— এই সংখ্যাগুলো তাকে এখনো ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী বিরোধী নেত্রী করে রাখে। প্রণব মুখার্জি ও অটলবিহারী বাজপেয়ীর উদাহরণ দেখিয়ে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, রাজনীতি একটি দীর্ঘ দৌড়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, মমতার সামনের পথ কঠিন— অত্যন্ত কঠিন। একদিকে রাজ্যে বিজেপির নতুন সরকারের প্রবল দাপট, অন্যদিকে দলের ভেতরের ভাঙন ও অভিষেক সমস্যা, উপরন্তু বয়স ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা। তারপরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সহজে ‘শেষ’ বলা যায় না, কারণ এই রাজনীতিক বারবার সবাইকে চমকে দিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটাই প্রশ্ন এখন সবচেয়ে বড়— যে রাজ্যের মানুষ ৩৪ বছর পরে বামফ্রন্টকে বিদায় দিয়েছিল এবং তাদের আর ফিরতে দেয়নি, সেই রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি সেই অলিখিত রীতির বিরল ব্যতিক্রম ঘটাতে পারবেন? নাকি ২০২৬ সালের পরাজয়ই তার রাজনৈতিক জীবনের শেষ বড় অধ্যায়?
উত্তর এখনো অজানা। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে এখনো লড়াই থামাননি।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে