পরিবেশ ও জলবায়ু
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন, নারী এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর
সম্প্রতি আমি বাংলাদেশে একটি ন্যায়সঙ্গত ও লিঙ্গ-সংবেদনশীল নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানে যোগদান করি। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) এটির আয়োজন করে। বিশেষজ্ঞ ও আলোচকদের কাছ থেকে অনেক বিষয় জেনে আমি সমৃদ্ধ হয়েছি।
জলবায়ু পরিবর্তন ও জলবায়ু ন্যায়বিচার: বাংলাদেশ কেন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পাওয়ার যোগ্য
জলবায়ু সংকট বর্তমান বিশ্বের গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যগুলোকে খুব গভীরভাবে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে। বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা হলো—যেসব দেশ ও জনগোষ্ঠী বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে সবচেয়ে কম অবদান রেখেছে, তারাই আজ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক পরিণতির মুখোমুখি হচ্ছে। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ এই চরম বৈষম্য ও অবিচারের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক উদাহরণ।
জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে জীবন সংগ্রাম
জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রকৃতি যেন এক কঠিন রূপ ধারণ করে। সূর্য তখন আকাশে আগুন ঢেলে দেয়, বাতাস হয়ে ওঠে ভারী ও দহনজ্বালা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, “জ্যৈষ্ঠের ক্ষররৌদ্রই তো জ্যৈষ্ঠের অশ্রুশূন্য রোদন”—এই সময়ের প্রকৃতি যেন নীরব অথচ তীব্র দহন ছড়িয়ে দেয়। ফলে “জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে জীবন সংগ্রাম” কেবল ঋতুর বর্ণনা নয়, এটি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের টিকে থাকার এক বাস্তব চিত্র।
ঢাকায় জলবায়ু অভিবাসী: বাংলাদেশের জলবায়ু সংকটের মানবিক প্রতিচ্ছবি
প্রতিদিন সকালে ঢাকার ব্যস্ত ফুটপাতগুলোতে অসংখ্য মানুষ হকারদের পাশ কাটিয়ে হেঁটে যায়, রিকশাচালকদের অসহনীয় যানজটের ভেতর পথ খুঁজে নিতে দেখে, আর নির্মাণশ্রমিকদের তীব্র রোদে ঘাম ঝরিয়ে শহরের ক্রমবর্ধমান দালানকোঠা নির্মাণ করতে দেখে। শহরের অনেক মানুষের কাছে তারা কেবল ঢাকার অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির একটি অংশ চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও যেন অদৃশ্য।
কংক্রিটের জঞ্জালে ভূমিকম্প: জীবন ও ঝুঁকি
ঢাকা—যাকে একসময় মসজিদের শহর বলা হতো, আজ তা রূপ নিয়েছে এক বিশালাকার ‘কংক্রিটের জঞ্জালে'। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, গগনচুম্বী অট্টালিকা আর জনঘনত্বের ভারে ন্যুব্জ এই শহরটি এখন ধ্বংশন্মুখ এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর বিশেষজ্ঞরা ঢাকার এই ভয়াবহ ঝুঁকি নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যা আমাদের অস্তিত্বের গোড়া নাড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণ মানুষ অসহায়ের মত কি হবে এ দূঃচিন্তায় আক্রান্ত। বিশেষ করে ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্যোগে ঢাকা শহর কতটা ঝুঁকিপূর্ন তা এখন আর তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং এক রূঢ় বাস্তব।
দূষণের নতুন আতঙ্ক প্রাণঘাতী ‘পিফাস’
দেশে নতুন প্রাণঘাতী এক দূষণের নাম ‘পিফাস’। বিভিন্ন শিল্পকারখানা থেকে নির্গত ফ্লোরিন ও কার্বন (যৌগ) মিলে সৃষ্টি হয় এই মারাত্মক দূষণ। বেশ কয়েকটি জরিপে বলা হয়েছে- ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী এলাকায় পিফাস ছড়িয়ে পড়েছে ভয়াবহ আকারে। ধীরে ধীরে তা আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়াতে পারে। গবেষকরা বলছেন, প্রাণঘাতী এই দূষণ দ্রুত বন্ধ না করা গেলে ক্যান্সার, চর্মরোগ, লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, থাইরয়েডসহ বড় ধরনের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে পড়বে মানুষ।
দক্ষিণ এশিয়ার ক্রমবর্ধমান সমুদ্রদূষণে হুমকিতে মানবজীবন ও জীববৈচিত্র্য
আবর্জনা এবং প্লাস্টিকসহ কঠিন শিল্পবর্জ্যে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, যা উদ্বেগজনক হারে বাড়িয়ে দিচ্ছে পুরো মানবজাতির জন্য হুমকি সমুদ্রদূষণকেই। মাত্রাতিরিক্ত প্লাস্টিকের ব্যবহার এবং সমুদ্রে ফেলে দেয়ার বিপদগুলো ক্রমবর্ধমান পরিবেশদূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক ঝুঁকিতে ঠেলে দিচ্ছে দেশগুলোর নাগরিকদের সঙ্গে বিশ্ববাসীকেও। সমুদ্রদূষণ এখন বিশ্বজুড়ে ভূমি এবং জলভাগের বৃহত্তম পরিবেশগত সমস্যা।
ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’ আরবি শব্দ ভান্ডার হয়ে যেভাবে উপকূলে আঘাত হানতে যাচ্ছে
কবি জীবনানন্দ দাশের লেখা কবিতাটি অপ্রাসঙ্গিক হয়েও যেন প্রাসঙ্গিক এখানে। কবি বেড়ে উঠেছেন এমন এক অঞ্চলে যেখানে বছরের পর বছর ঘূর্ণিঝড় এসে ভেঙে দিয়েছে মানুষের স্বপ্ন, কেড়ে নিয়েছে জীবন।
কবরের শুকনো জায়গা না থাকায় লাশ পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে
২০২৪ সালে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা প্রত্যক্ষ করল ফেনীবাসী। আকস্মিক আবির্ভূত এই বন্যা ফেনীবাসীর কাছে ছিল অকল্পনীয়। বন্যার এই আগ্রাসী রূপ শুধু ফেনী নয়, ফেনীর আশপাশের জেলাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছিল। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে ফেনীর পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলায় বন্যার পানি ঘরের চাল ছুঁয়েছে। বিদ্যুৎসহ সবরকম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় এসব এলাকার মানুষ সারা দেশ থেকেও বিচ্ছিন্ন ছিল। পানির তীব্র স্রোতের কারণে বন্যাকবলিত যে সব প্রত্যন্ত অঞ্চলে উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি, সেসব অঞ্চলের মানুষ গাছের ডাল, টিনের ছাল, বাড়ির ছাদ, গাছপালা, কলা গাছের ভেলার ওপরে বসে বাঁচার চেষ্টা করেছে। বয়স্ক, শিশু, নারী, রোগী এবং গর্ভবতীদের ছিল অবর্ণনীয় দুর্ভোগ।
পরিবেশ রক্ষায় সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করব
বাংলাদেশ শুধু নয়, পৃথিবীর কোথাও পরিবর্তনের যাত্রা খুব সহজ হয় না। আমি জানি অনেক প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে, যা আমি আগেও করেছি। আমাদের দেশে যেখানে আইনের শাসনের ইন্ডিকেটর খুবই নিচের দিকে, সেখানে এটা অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ; কিন্তু এই ঝুঁকিটা আমরা অতিক্রম করতে পারব, কারণ আমাদের সঙ্গে সমাজের মূল ধারার জনগোষ্ঠী আছে। বড় জনগোষ্ঠী এবং মূল ধারার মিডিয়ার সমর্থনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলও আমাদের ওপর নজর রাখে। মানুষের কাছ থেকে পাওয়া শক্তি দিয়েই আমরা ঝুঁকিগুলোর মোকাবিলা করতে চাই। বিভিন্ন প্রকার দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করাই আমার লক্ষ্য। পরিবেশ ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে অধিকতর জনবান্ধব মন্ত্রণালয়ে পরিণত করা হবে। নদীদূষণ রোধের কাজ হয়তো পুরোটা পারব না। তবে অতিদূষণ যেসব নদী আছে, সেগুলো গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে কাজ করব।