বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন, নারী এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর
সম্প্রতি আমি বাংলাদেশে একটি ন্যায়সঙ্গত ও লিঙ্গ-সংবেদনশীল নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানে যোগদান করি। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) এটির আয়োজন করে। বিশেষজ্ঞ ও আলোচকদের কাছ থেকে অনেক বিষয় জেনে আমি সমৃদ্ধ হয়েছি।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ধারণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, “বাংলাদেশ তার জ্বালানি রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দেশটি যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটাচ্ছে এবং স্বল্প-কার্বন পথ অনুসরণ করছে, তখন সমতা, অন্তর্ভুক্তি এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নগুলো ক্রমশই কেন্দ্রীয় হয়ে উঠছে। তবুও, নীতি নির্ধারণী আলোচনাগুলো প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দিয়ে চলেছে, প্রায়শই জ্বালানি রূপান্তরের সামাজিক দিকগুলোকে উপেক্ষা করছে; বিশেষ করে নারী ও তরুণদের ভূমিকা, কণ্ঠস্বর এবং নেতৃত্বকে। নারীরা, বিশেষ করে তৃণমূল এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নারীরা, ইতোমধ্যেই জ্বালানি ব্যবহারকারী, ব্যবস্থাপক, উদ্ভাবক এবং প্রবক্তা হিসেবে গভীরভাবে জড়িত। জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের জন্য তরুণরাও শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। তা সত্ত্বেও, তাদের জীবন-অভিজ্ঞতা, অগ্রাধিকার এবং স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত সমাধানগুলো নীতি বিতর্ক বা বেসরকারি খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে খুব কমই প্রভাবিত করে।
প্রকৃতপক্ষে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত একটি প্রযুক্তিগত ক্ষেত্র এবং এটি একটি দ্রুত বর্ধনশীল বাজারও বটে। নারী-মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সোলার হোম সিস্টেম, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট এবং মিনি-গ্রিড সরবরাহ, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে। ক্ষুদ্রঋণ এবং ব্যবসায়িক দক্ষতার মাধ্যমে এই ব্যবসাগুলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ও স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে এবং একই সাথে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে।
আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা (ওজঊঘঅ)-এর মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিশ্বব্যাপী মোট কর্মশক্তির মাত্র ৩২ শতাংশ নারী। প্রযুক্তিগত এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পদগুলোতে এই প্রতিনিধিত্ব আরও কম। জ্বালানি খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও বাংলাদেশ নারীদের সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতের কর্পোরেট ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের মাত্র ৯ শতাংশ আসন নারীদের দখলে রয়েছে। তবে, প্রাতিষ্ঠানিক বাধাগুলো এখনও বিদ্যমান। যদিও নবায়নযোগ্য জ্বালানি স্থানীয়ভাবে জ্বালানি সরবরাহের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করে, উচ্চ-পর্যায়ের নেতৃত্ব, প্রযুক্তিগত ভূমিকা এবং জ্বালানি নীতি প্রণয়নে নারীদের প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
দক্ষিণ এশীয় দৃষ্টিকোণ
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার গ্রামীণ এলাকাসহ অনেক উন্নয়নশীল অঞ্চলে, নারীরাই মূলত পরিবারের জ্বালানি ব্যবহার এবং রান্নার দায়িত্বে থাকেন, যেখানে প্রায়শই বিপজ্জনক জৈব জ্বালানি ব্যবহৃত হয়। সোলার হোম সিস্টেমের শেষ ধাপের ডেলিভারি, বিক্রয় এবং ইনস্টলেশনের ক্ষেত্রে তারা প্রায়শই উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিবিদ হিসেবে পারদর্শী হন। সরাসরি আর্থিক সহায়তা এবং দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে তা ব্যাপক আর্থ-সামাজিক সুবিধা বয়ে আনতে পারে, যা উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার যোগ করবে।
ঐতিহাসিকভাবেই এশীয় দেশ এবং গ্লোবাল সাউথের জ্বালানি খাত লিঙ্গ-নিরপেক্ষ ছিল। জলবায়ু পরিবর্তন লিঙ্গ-নিরপেক্ষ নয়, এবং এর কার্যকর সমাধানের জন্য লিঙ্গভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং এটি গুরুতর ও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির সম্মুখীন, যার ফলে ব্যাপক জলবায়ু অভিবাসন ঘটছে। তবে, এর লিঙ্গভিত্তিক প্রভাব নিয়ে গবেষণা অপর্যাপ্ত এবং এ বিষয়ে ব্যাপক তথ্যের অভাব রয়েছে। তাই জলবায়ু অভিবাসনে নারীদের অভিজ্ঞতার ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করে তথ্য তৈরির মাধ্যমে আমাদের এই ঘাটতি পূরণের জন্য কাজ করা উচিত।
ইউএন উইমেন-এর প্রতিবেদন
‘বাংলাদেশে লিঙ্গ সমতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের অবস্থা’-তে জলবায়ু-সম্পর্কিত নীতি ক্ষেত্রগুলিতে লিঙ্গ সমতার একীকরণকে আরও জোরদার করার লক্ষ্যে লিঙ্গ-সংবেদনশীল নীতি বাস্তবায়ন ও কার্যক্রম বৃদ্ধির জন্য দেশ-নির্দিষ্ট সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে।
কঠোর লিঙ্গীয় ভূমিকা এবং গভীরভাবে প্রোথিত আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের কারণে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন নারীদের ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রভাব ফেলে। যদিও দেশটি ২০৪০ সালের মধ্যে তার নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, বর্তমানে এই রূপান্তরে ন্যায়সঙ্গত লিঙ্গ অন্তর্ভুক্তির অভাব রয়েছে, যেখানে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতের কর্মশক্তিতে নারীদের সংখ্যা মাত্র ১০%।
উপকূলীয় অঞ্চলের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের নারীরা বাস্তুচ্যুতি, জীবিকা হারানো এবং বন্যার সময় পানি আনার মতো অবৈতনিক শ্রম বৃদ্ধির মতো বর্ধিত ঝুঁকির সম্মুখীন হন।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গার্হস্থ্য ক্ষেত্রে নারীরা জ্বালানি দারিদ্র্য ও ঘাটতির প্রধান শিকার হন, অথচ নবায়নযোগ্য খাতের প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ থেকে তারা সাধারণত বঞ্চিত থাকেন।
গ্রামীণ এবং জলবায়ু-পীড়িত জেলাগুলিতে নারীরা স্বল্প সুদে ঋণ প্রাপ্তিতে অসুবিধা এবং সীমাবদ্ধ সামাজিক রীতিনীতির মতো কাঠামোগত বাধার সম্মুখীন হতে থাকেন, যা সবুজ উদ্যোক্তাকে ব্যাহত করে।
বাংলাদেশ যখন ধীরে ধীরে পরিচ্ছন্ন ও টেকসই শক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এই রূপান্তর কেবল কার্বন নিঃসরণ কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং একটি ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ার নতুন পথ অন্বেষণেরও একটি মাধ্যম। আর এটিকে সফল করতে হলে নারীদের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক দিলরুবা আক্তার বলেন, “বাংলাদেশের এনডিসি লক্ষ্যমাত্রায় জ্বালানি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যা দেশের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ৪৮.৮ শতাংশের জন্য দায়ী। পরিবেশ অধিদপ্তর এমওইএফসিসি-এর অধীনে একটি প্রতিবেদন দাখিলকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করে, কোনো নীতি প্রণয়নকারী সংস্থা হিসেবে নয়। ইউএনএফসিসি এবং আইপিসিসি-এর মানদণ্ড অনুযায়ী কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় খাত-ভিত্তিক, শর্তসাপেক্ষ বা শর্তহীন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।”
তিনি আরও বলেন, “শিল্পখাতে জ্বালানি ও সম্পদের ব্যবহার কমাতে জ্বালানি নিরীক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপকদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট এবং গ্রিন ফাইন্যান্স ব্যবস্থার সাথে উৎপাদনকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পাশাপাশি বর্জ্য, পানি ও শূন্য-নিঃসরণ ব্যবস্থাপনাসহ টেকসই পদ্ধতি গ্রহণে শিল্পগুলোকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু দায়বদ্ধতা পূরণের জন্য ডিওই সচেতনতা, নিয়ম প্রতিপালন এবং স্বচ্ছ প্রতিবেদন দাখিলে সহায়তা করে,” বলে দিলরুবা তার বক্তব্য শেষ করেন।
বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) পূরণের অঙ্গীকার করেছে, যার মধ্যে রয়েছে লিঙ্গ সমতা বিষয়ক এসডিজি ৫, সার্বজনীন ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বিষয়ক এসডিজি ৭, শোভন কর্মসংস্থান বিষয়ক এসডিজি ৮, বৈষম্য হ্রাস বিষয়ক এসডিজি ১০ এবং জলবায়ু কার্যক্রম বিষয়ক এসডিজি ১৩। এই সমস্ত লক্ষ্যমাত্রা পরস্পর সংযুক্ত এবং একটি লক্ষ্য অর্জন অন্যটি অর্জনে সহায়তা করে।
[পারভেজ বাবুল একজন পুরস্কার বিজয়ী জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সাংবাদিক, কলামিস্ট এবং গবেষক।]

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে