Views Bangladesh Logo

জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে জীবন সংগ্রাম

Nazmul  Ahsan

নাজমুল আহসান

জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রকৃতি যেন এক কঠিন রূপ ধারণ করে। সূর্য তখন আকাশে আগুন ঢেলে দেয়, বাতাস হয়ে ওঠে ভারী ও দহনজ্বালা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, “জ্যৈষ্ঠের ক্ষররৌদ্রই তো জ্যৈষ্ঠের অশ্রুশূন্য রোদন”—এই সময়ের প্রকৃতি যেন নীরব অথচ তীব্র দহন ছড়িয়ে দেয়। ফলে “জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে জীবন সংগ্রাম” কেবল ঋতুর বর্ণনা নয়, এটি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের টিকে থাকার এক বাস্তব চিত্র।


এই তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি কষ্টে থাকে খেটে খাওয়া মানুষ। রিকশাচালক, দিনমজুর, কৃষক ও নির্মাণ শ্রমিকদের জীবনে জ্যৈষ্ঠ এক নিরব পরীক্ষা। শহরের রাস্তায় যখন তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়, তখনও জীবিকার তাগিদে তাদের বাইরে থাকতে হয়। রোদে পুড়ে রিকশার প্যাডেল ঘোরাতে ঘোরাতে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে, ঘাম ঝরতে থাকে অবিরাম। তবুও থেমে যাওয়ার সুযোগ নেই—কারণ থেমে যাওয়া মানেই জীবনের চাকা থেমে যাওয়া।


গ্রামের কৃষকের অবস্থাও কম কঠিন নয়। সূর্যের প্রখর তাপে মাটি যেন জ্বলে ওঠে, তবুও জমিতে কাজ চালিয়ে যেতে হয়। ধান কাটা, সবজি চাষ, সেচ দেওয়া—সবই এই অসহনীয় গরমে করতে হয়। অনেক সময় পানির অভাবে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুকুর, খাল ও বিল শুকিয়ে যাওয়ায় সেচ সংকট দেখা দেয়। ফলে কৃষকের জীবনে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও বাড়ে।


শহরের মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবী মানুষও এই গরম থেকে মুক্ত নয়। অফিসে যাতায়াতের সময় প্রচণ্ড রোদে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। যানজটে আটকে থাকা বাস বা রিকশায় বসে থাকলে গরম আরও অসহনীয় হয়ে ওঠে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। পাখা থেমে গেলে ঘরের ভেতর যেন উত্তপ্ত চুল্লির মতো পরিবেশ তৈরি হয়। শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়ে; ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, শরীরে দুর্বলতা বাড়ে।


এই সময়ে পানির সংকটও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। অনেক এলাকায় টিউবওয়েলে পানি ওঠে না, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়। শহরের কিছু এলাকায় ওয়াসার পানি পর্যাপ্ত না থাকায় মানুষকে পানি কিনে ব্যবহার করতে হয়। অতিরিক্ত গরমে শরীর থেকে ঘাম বের হয়ে পানিশূন্যতা তৈরি হয়, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।


চিকিৎসকদের মতে, এই সময়ে শরীরকে পর্যাপ্ত পানি দিয়ে হাইড্রেটেড রাখা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বাস্তবে নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ নিয়মিত বিশুদ্ধ পানি বা ফলমূল গ্রহণ করতে পারে না। ফলে তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে হিটস্ট্রোক, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা ও ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। এ সময় হাসপাতালগুলোতে গরমজনিত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়।


তবে জ্যৈষ্ঠ শুধু কষ্টের মাস নয়, কিছুটা স্বস্তির বার্তাও নিয়ে আসে। আম, কাঁঠাল, লিচু—এই সময়ের প্রধান ফলগুলো মানুষের জীবনে স্বস্তি ও আনন্দ যোগ করে। গরমে ক্লান্ত শরীরে ঠান্ডা আমের শরবত বা কাঁঠালের রস কিছুটা হলেও প্রশান্তি আনে। গ্রামাঞ্চলে এসব ফল বিক্রি করে অনেক পরিবার বাড়তি আয়ও করে।


বাংলাদেশের জলবায়ু ও সংস্কৃতির সঙ্গে জ্যৈষ্ঠের দাবদাহ গভীরভাবে জড়িত। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই গরম আরও তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠছে। আগে যেখানে জ্যৈষ্ঠের গরম তুলনামূলক সহনীয় ছিল, এখন সেখানে প্রায়ই তাপপ্রবাহ দেখা যায়। গাছপালা কমে যাওয়া, জলাশয় ভরাট ও নগরায়ণ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।


এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য পরিবেশ রক্ষা এখন অত্যন্ত জরুরি। বেশি বেশি গাছ লাগানো, জলাশয় সংরক্ষণ এবং শহরে সবুজ এলাকা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও পানির অপচয় রোধে জনসচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।


সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। তাপপ্রবাহের সময় শ্রমজীবী মানুষের জন্য ছায়াযুক্ত বিশ্রামস্থান, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং সচেতনতামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। রাস্তায় পানি সরবরাহ কেন্দ্র স্থাপন ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে এই কষ্ট অনেকটা কমানো সম্ভব।


সব মিলিয়ে বলা যায়, জ্যৈষ্ঠের দাবদাহ শুধু একটি ঋতুগত পরিবর্তন নয়; এটি মানুষের জীবনসংগ্রামের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। এই সময় আমাদের শেখায় প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য রেখে কীভাবে টিকে থাকতে হয়। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয়, কঠিন পরিস্থিতিতেও মানুষ তার শ্রম, সহনশীলতা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যায়।


পরিশেষে, “জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে জীবন সংগ্রাম” কেবল গরমের গল্প নয়; এটি শ্রম, সহনশীলতা ও টিকে থাকার এক জীবন্ত দলিল। এই দাবদাহ যতই কঠিন হোক, মানুষের জীবন থেমে থাকে না—বরং প্রতিদিন নতুন করে শুরু হয় বেঁচে থাকার লড়াই, এগিয়ে যাওয়ার অদম্য প্রয়াস।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ