নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা
আইনে ১৮০ দিন, বিচারে বছর পেরোয়- বিলম্বের জবাবদিহি কোথায়?
আইনে সময়সীমা ১৮০ কার্যদিবস। বাস্তবে একটি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার বিচার শেষ হতে লাগছে গড়ে প্রায় ৩ বছর ৭ মাস—প্রায় ১ হাজার ৩৭০ দিন। অর্থাৎ আইনে নির্ধারিত সময়ের প্রায় সাড়ে সাত গুণ। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশের ৩২ জেলার ৪৬টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ৪ হাজার ৪০টি মামলা বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের গবেষণায় এমন চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় এসব মামলায় সাজা হওয়ার হারও মাত্র ৩ শতাংশ বলে জানানো হয়েছে।
তাহলে ১৮০ দিনের হিসাব কোথায়? নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০(৩) ধারায় বলা হয়েছে, বিচারের জন্য মামলা পাওয়ার তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে ট্রাইব্যুনালকে বিচার শেষ করতে হবে। একই ধারায় শুনানি শুরু হলে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি কর্মদিবসে একটানা চলার কথাও বলা হয়েছে।
কিন্তু ১৮০ দিন পেরিয়ে গেলেই কি মামলা বাতিল? আসামি কি বিচার থেকে বেরিয়ে যাবেন? সম্প্রতি প্রকাশিত মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেল বনাম রাষ্ট্র মামলার রায় বলছে—না। হাইকোর্টের মতে, এই সময়সীমা বাধ্যতামূলক নয়, নির্দেশনামূলক। নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হওয়ার কারণে কোনো মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বা স্থগিত হবে না।
পাভেলের মামলাটি এই প্রশ্নেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ কেস স্টাডি। ২০০৭ সালে ইডেন কলেজের এক ছাত্রীকে ধর্ষণ ও পরবর্তীতে গর্ভপাত করানোর অভিযোগে ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে মামলা হয়। একই বছরের জুলাইয়ে অভিযোগ গঠন করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ হয়নি। ২০১১ সালে পাভেল হাইকোর্টে রিট করে দাবি করেন, আইনের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় বিচার চালানোর সুযোগ নেই। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হওয়ার কারণ জানিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের কাছে প্রতিবেদন দেওয়ার বিধানও অনুসরণ করা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালের ৭ জুন হাইকোর্ট রুল খারিজ করে দেন এবং বিচার চালিয়ে যাওয়ার পথ পরিষ্কার করেন।
কিন্তু পাভেলের মামলাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলার সুযোগ নেই। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে সুপ্রিম কোর্টের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪৮ হাজার ৩১৪। এর মধ্যে ৩৫ হাজার ২৬২টি মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল।
ঢাকার খিলক্ষেতের নয় বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের মামলাটি আরও দীর্ঘ বিলম্বের চিত্র দেখায়। মামলা দায়েরের পর নয় বছর পেরিয়েও বিচার শেষ হয়নি। অভিযোগ গঠন হয়েছে, কিন্তু ৯৬টি শুনানি হলেও রায় হয়নি। মামলার ১০ জন সাক্ষীর মধ্যে ছয়জন আদালতে হাজির না হওয়াকে বিলম্বের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আদালত সাক্ষীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছিলেন; তারপরও তাদের হাজির করা যায়নি।
আরেকটি উদাহরণ হবিগঞ্জের। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরী ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হওয়ার ঘটনায় মামলা হয়। ২০২৬ সালের জুনেও বিচার শেষ হয়নি। অভিযোগ গঠনের প্রায় চার বছর পরও মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়ায় হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারককে তলব করেন এবং বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা দিতে বলেন।
নোয়াখালীতেও দীর্ঘসূত্রতার আরেক চিত্র পাওয়া গেছে। একটি ধর্ষণচেষ্টার মামলায় ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার শেষ হয়নি। জেলার দুটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে তখন প্রায় ৭ হাজার ১৩টি মামলা বিচারাধীন ছিল। আদালত-সংশ্লিষ্টরা এর পেছনে সাক্ষী হাজির না হওয়া এবং বিচারকের স্বল্পতার কথা উল্লেখ করেছেন।
অর্থাৎ ১৮০ দিনের বিধান কাগজে আছে, কিন্তু বাস্তবের মামলা অনেক সময় পেরিয়ে যাচ্ছে পাঁচ বছর, নয় বছর, এমনকি ১৭ বছরও। সুপ্রিম কোর্ট–ব্র্যাকের গবেষণায় গড় সময় ১ হাজার ৩৭০ দিন হওয়া সেই ব্যবধানটিকেই সংখ্যায় স্পষ্ট করেছে।
এখানেই সামনে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলে দায়টা কার? সাক্ষী না এলে তাকে হাজির করার দায়িত্ব কার? তদন্তে বিলম্ব হলে তার জবাবদিহি কোথায়? বিচারক, রাষ্ট্রপক্ষ, তদন্তকারী সংস্থা বা সংশ্লিষ্ট পক্ষ—কোন পর্যায়ে মামলা আটকে আছে, তার নিয়মিত নজরদারি হচ্ছে কি?
২০২৬ সালের জুনে ব্লাস্ট আয়োজিত এক মতবিনিময় সভাতেও চলমান মামলায় কার্যকর তদারকির অভাব, ডিএনএ ও ফরেনসিক প্রতিবেদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা এবং সাক্ষী সুরক্ষার ঘাটতিকে বিচার বিলম্বের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। সংগঠনটি প্রযুক্তিভিত্তিক ই-কেস মনিটরিং ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে মামলা তদারকির সুপারিশ করেছে।
ফলে প্রশ্নটি এখন আর শুধু ‘১৮০ দিনে বিচার শেষ হলো কি না’—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়। বড় প্রশ্ন হলো, ১৮০ দিনের সময়সীমা অতিক্রম করার পরও যদি বিচার চলতেই থাকে, তাহলে সেই বিলম্বের কারণ কি নথিভুক্ত হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে এবং কেউ কি তার জবাবদিহি নিশ্চিত করছে? আইন সময় বেঁধে দিয়েছে ১৮০ দিন; বাস্তবতা বলছে অপেক্ষার দিন কখনো ১ হাজার, কখনো ৩ হাজারের কাছাকাছি। এই দুই হিসাবের মাঝখানেই আটকে আছে দ্রুত বিচারের প্রতিশ্রুতি ও বিচারপ্রার্থীর অপেক্ষা।
মতামত দিন