আজ রাতে ইউরোপীয় ঝঞ্ঝা
স্প্যানিশ আর্মাডা, পর্তুগিজ কারুকাজ নাকি ক্রোয়াট অভিজ্ঞতা জয়
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পরিসংখ্যান অনেক সময় আত্মবিশ্বাস দেয়, কিন্তু নিশ্চয়তা দেয় না। ইতিহাসও বারবার দেখিয়েছে—যে দল কাগজে-কলমে এগিয়ে থাকে, শেষ পর্যন্ত তারাই সবসময় জয়ী হয় না। একটি ভুল পাস, একটি কর্নার, একটি পাল্টা আক্রমণ কিংবা একজন ফুটবলারের অসাধারণ মুহূর্তই বদলে দিতে পারে পুরো টুর্নামেন্টের গল্প। আজ বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সেই অনিশ্চয়তার মঞ্চেই ইউরোপের চার পরাশক্তি—স্পেন, অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া—লড়বে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিটের জন্য।
রাত ১০টায় ডালাসের এটি অ্যান্ড টি স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে স্পেন ও অস্ট্রিয়া। পরিসংখ্যানের ভাষায় স্পেন এগিয়ে অনেকটাই। ফুটবল বিশ্লেষকদের মডেল ও সুপারকম্পিউটারের পূর্বাভাস অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে স্পেনের জয়ের সম্ভাবনা প্রায় ৬৯.১ শতাংশ, অস্ট্রিয়ার ১২.৩ শতাংশ, আর ড্র হওয়ার সম্ভাবনা ১৮.৬ শতাংশ।
দুই দলের আন্তর্জাতিক লড়াইয়ের ইতিহাসও স্পেনের পক্ষেই কথা বলে। ১১টি ম্যাচে স্পেন জিতেছে ৫টিতে, অস্ট্রিয়া ৩টিতে, বাকি ৩টি ড্র। তবে ইতিহাসের একটি পাতায় এখনও গর্বের সঙ্গে ফিরে তাকায় অস্ট্রিয়া—১৯৭৮ বিশ্বকাপে তারা স্পেনকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল। আবার স্পেনের স্মৃতিতে রয়েছে ইউরো বাছাইপর্বে ৯-০ গোলের বিধ্বংসী জয়। অর্থাৎ দুই দলের সম্পর্ক কেবল পরিসংখ্যানের নয়, প্রতিশোধ আর আত্মপ্রমাণেরও।
এই স্প্যানিশ দলটির সবচেয়ে বড় পরিচয় বলের ওপর তাদের আধিপত্য। গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচে প্রায় ৬৫ শতাংশের বেশি সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রতিপক্ষকে খেলতেই দেয়নি তারা। মাঝমাঠে রদ্রি, পেদ্রি, মিকেল মেরিনো, মার্তিন সুবিমেন্দি আর গাভি যেন ছন্দের পরিচালক। তাঁদের ছোট ছোট পাসে প্রতিপক্ষের প্রেসিং ভেঙে যায়। দুই উইংয়ে লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস গতি, ড্রিবলিং এবং এক-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে বারবার বিপদে ফেলছেন। বলের দখল, অবস্থান বদল এবং ধৈর্যের সঙ্গে আক্রমণ গড়ে তোলাই স্পেনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
অস্ট্রিয়ার পরিকল্পনা ঠিক উল্টো। তারা জানে, দীর্ঘ সময় বল নিজেদের কাছে রাখা কঠিন হবে। তাই তাদের লক্ষ্য হবে রক্ষণে শৃঙ্খলা বজায় রেখে স্পেনের ভুলের অপেক্ষা করা। অধিনায়ক মার্সেল সাবিৎজার মাঝমাঠে বল পুনরুদ্ধার ও দ্রুত আক্রমণ গড়ার মূল ভরসা। কনরাড লাইমার প্রতিপক্ষের পাসিং লেন বন্ধ করতে এবং ট্রানজিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। স্পেন যেখানে শিল্পী, অস্ট্রিয়া সেখানে শ্রম আর শৃঙ্খলার প্রতীক।
টরেন্ট স্টেডিয়ামে দিনের আরেক ম্যাচে পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়ার লড়াইটি কৌশলগত দিক থেকে আরও সূক্ষ্ম। সাম্প্রতিক মুখোমুখি লড়াইয়ে পর্তুগাল কিছুটা এগিয়ে থাকলেও অধিকাংশ ম্যাচই ছিল এক গোলের ব্যবধানে কিংবা অমীমাংসিত। ফলে অতীতও বলছে, এই লড়াইয়ে ছোট ভুলই বড় মূল্য দাবি করতে পারে।
পর্তুগালের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু ব্রুনো ফার্নান্দেস। তাঁর দূরদর্শী পাস, লাইন ভাঙা থ্রু বল এবং দূরপাল্লার শট প্রতিপক্ষের রক্ষণকে মুহূর্তেই বিপদে ফেলতে পারে। উইংয়ে রাফায়েল লেয়াঁওর গতি ও ড্রিবলিং ম্যাচের চেহারা বদলে দেওয়ার মতো। মাঝমাঠে পর্তুগাল সাধারণত ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ বলের দখল ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে নিজেদের অর্ধে আটকে রাখতে চায়।
অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়ার শক্তি তাদের অভিজ্ঞতা। লুকা মদ্রিচ এখনও খেলার গতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার। তাঁর সঙ্গে মাতেও কোভাচিচ ছোট ছোট পাসের মাধ্যমে চাপ কাটিয়ে আক্রমণের ভিত্তি গড়ে তোলেন। ক্রোয়েশিয়া হয়তো বলের দখলে কিছুটা পিছিয়ে থাকবে, কিন্তু ম্যাচের ছন্দ বদলে দেওয়ার মানসিক দৃঢ়তা ও ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলা তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
বিশ্লেষণ বলছে, স্পেন পরিষ্কার ফেবারিট। পর্তুগালও কাগজে-কলমে এগিয়ে। কিন্তু বিশ্বকাপের নকআউটে ফেবারিটের তকমা কখনও জয়ের নিশ্চয়তা নয়। এখানেই জন্ম নিয়েছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটন, সবচেয়ে আলোচিত প্রত্যাবর্তন এবং সবচেয়ে অবিশ্বাস্য গল্পগুলো।
আজকের রাত তাই কেবল দুটি ম্যাচের নয়; এটি চারটি ভিন্ন ফুটবল দর্শনের সংঘর্ষ। একদিকে স্প্যানিশ পজেশনের শিল্প, অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার প্রতিরোধ; একদিকে পর্তুগালের সৃজনশীল আক্রমণ, অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়ার অভিজ্ঞতার নীরব শক্তি। শেষ বাঁশি বাজলে দুটি দল বিদায় নেবে, দুটি দল এগিয়ে যাবে। কিন্তু ফল যাই হোক, আজকের রাত বিশ্বকাপের ইতিহাসে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় লিখতে প্রস্তুত।
মতামত দিন