Views Bangladesh Logo

এল নিনোর ছায়ায় এবার কি নরম হবে শীতের কামড়?

শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, ভোরের ঘাসে শিশির আর বাতাসে হিমেল পরশ—বাংলার ঋতুচক্রে শীতের আগমনী বার্তা সাধারণত এমনই। কিন্তু এবার যেন সেই চেনা ছন্দে খানিকটা ভাটা পড়েছে। শরৎ পেরিয়ে হেমন্তের দরজায় কড়া নাড়লেও দিনের গরম পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। কোথাও রোদের তেজ, কোথাও ভোরের হালকা কুয়াশা—ঋতুর পালাবদল যেন নিজের স্বাভাবিক গতিপথ থেকে খানিকটা সরে গেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যও বলছে, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টির ঘাটতি ছিল যথাক্রমে ৮ ও ১৮ শতাংশ। একই সময়ে তাপমাত্রাও ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। অক্টোবরেও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকার পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—সামনে যে শীত, তার চেহারা কেমন হবে?

আবহাওয়াবিদদের বিশ্লেষণ বলছে, শীত এবার আসবে ঠিকই, তবে তার কামড় হয়তো আগের মতো দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কনকনে ঠান্ডায় টানা কয়েক সপ্তাহ কাঁপানোর বদলে দেখা দিতে পারে বিচ্ছিন্ন ও স্বল্পস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহ। আর এই পরিবর্তনের পেছনে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে উঠে আসছে প্রশান্ত মহাসাগরের জলবায়ুপ্রক্রিয়া এল নিনো।

আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘জুনের পর থেকেই এল নিনোর শক্তিশালী অবস্থা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়; পুরো ভারতীয় অঞ্চলের আবহাওয়ার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। তাঁর মতে, এল নিনোর প্রভাবে শীতে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে বৃষ্টিও কম হতে পারে।’

তবে ‘উষ্ণ শীত’ মানেই যে ঠান্ডা থাকবে না, তা নয়। বরং বদলে যেতে পারে শীতের স্বরূপ। বৃষ্টি কম হলে বাতাসে ধুলো ও দূষণের কণা বাড়তে পারে, পাশাপাশি কুয়াশাও ঘন হতে পারে। ঘন কুয়াশার চাদরে দিনের সূর্যালোক মাটিতে কম পৌঁছালে দিনের বেলা ঠান্ডা বেশি অনুভূত হতে পারে। অথচ রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় খুব বেশি কমবে না—এমন বৈপরীত্যও দেখা দিতে পারে।

এল নিনো আসলে কোনো ঝড় বা স্বল্পমেয়াদি আবহাওয়া ঘটনা নয়। এটি নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলীয় চাপের বড় ধরনের পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রক্রিয়া। স্বাভাবিক সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব দিক থেকে পশ্চিমে বয়ে যাওয়া বাণিজ্যিক বায়ু উষ্ণ পানি পশ্চিমে জমা করে রাখে। এল নিনোর সময় সেই বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে গেলে উষ্ণ পানি মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার বিন্যাসে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘এবারের শীতের চরিত্র বুঝতে বঙ্গোপসাগর ও ওপরের বায়ুমণ্ডলের পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, বঙ্গোপসাগর ও নিম্ন বায়ুমণ্ডলে উষ্ণতা বাড়ার পাশাপাশি বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে উচ্চচাপ বলয়ের প্রভাব তৈরি হতে পারে। এতে শীতের স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এবার তীব্র শৈত্যপ্রবাহের স্থায়িত্ব কম হতে পারে। সহজ কথায়, এল নিনোর প্রভাবে আমরা তুলনামূলক উষ্ণ এবং কম ব্যাপ্তির একটি শীতকাল পার করতে যাচ্ছি।’

তবে বাংলাদেশের আবহাওয়া কেবল এল নিনোর নির্দেশে চলে না। বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ, ভারত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, মৌসুমি বায়ুর গতিপ্রকৃতি, বায়ুচাপের বিন্যাস এবং স্থানীয় বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতিও শীতের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। ফলে বৈশ্বিক কোনো পূর্বাভাসকে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা বা প্রতিটি দিনের আবহাওয়ার সঙ্গে সরাসরি মিলিয়ে দেখা ঠিক হবে না।

সম্ভাব্য চিত্রটি তাই অনেকটা এমন—অক্টোবরের শেষ দিকে উত্তরের জনপদ ও পার্বত্য এলাকায় ভোরে কুয়াশা দেখা দিতে পারে। নভেম্বরের শেষ দিকে উত্তরের হিমেল বাতাসের প্রভাব বাড়তে পারে। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি থাকবে শীতের মূল সময়। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলে কয়েক দফা তীব্র ঠান্ডা নামলেও তা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। ভোরে ঘন কুয়াশা, দিনে ম্লান রোদ আর রাতে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক তাপমাত্রা—শীতের দিনগুলোতে এমন বৈপরীত্য দেখা দিতে পারে।

শীতের এই পরিবর্তন শুধু অনুভূতির বিষয় নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন জীবনেও। অতিরিক্ত কুয়াশায় সড়ক ও নৌপথে চলাচল ব্যাহত হতে পারে। বড় শহরগুলোতে বৃষ্টি কম হলে ধুলো ও দূষণ বেড়ে বায়ুর মান খারাপ হতে পারে। কৃষিতে শীতকালীন ফসলের ওপর কুয়াশা ও তাপমাত্রার ওঠানামার প্রভাব পড়তে পারে। আবার শীতের বৃষ্টি কম হলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কাও থাকে।

শীত কম তীব্র হলে আরেকটি পরিবর্তন দেখা দিতে পারে ঋতুর শেষ প্রান্তে। এল নিনোর প্রভাব পরবর্তী সময়েও কিছুটা সক্রিয় থাকলে ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে পারে। এতে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে এবারের শীতকে ‘শীতহীন’ বলা যেমন বাড়াবাড়ি, তেমনি আগের মতো দীর্ঘ ও কনকনে শীতের নিশ্চয়তাও নেই। আবহাওয়াবিদদের বর্তমান বিশ্লেষণ বলছে, এবারের শীত হতে পারে তুলনামূলক উষ্ণ, স্বল্পস্থায়ী ও কুয়াশাপ্রবণ। কয়েক দিনের জন্য হিমেল বাতাস হয়তো দরজায় কড়া নাড়বে, উত্তরাঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহের তীব্রতাও অনুভূত হতে পারে। কিন্তু সেই শীতের আয়ু সম্ভবত হবে ছোট।

অর্থাৎ শীত আসবে—তবে তার পদধ্বনি হয়তো হবে মৃদু। আর ঋতুর নিয়ম মেনে বিদায় নিলেও এবার সে হয়তো একটু আগেই পথ ধরবে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ