Views Bangladesh Logo

দেশেই উৎপাদন হয় পেট্রোল-অকটেন, তবু কেন শঙ্কট?

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, আর এই চাহিদা বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে শিল্পায়ন, পরিবহন খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ এবং নগরায়নের প্রভাব। দেশে পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ পাম্পে এর তীব্র সংকট দেখা যাচ্ছে। পেট্রোল ও অকটেনের এমন টালমাটাল পরিস্থিতি তা অনেকের কাছেই বিস্ময়ের বিষয়। তাবে বাস্তবে এই সংকট কেবল অভ্যন্তরীণ সমস্যার ফল নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতি, বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।


বাংলাদেশে জ্বালানি তেল পরিশোধনের মূল কেন্দ্র ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড, যা অপরিশোধিত তেল থেকে পেট্রোল, অকটেনসহ বিভিন্ন জ্বালানি উৎপাদন করে। তবে এই উৎপাদন দেশের মোট চাহিদার তুলনায় অনেক কম, ফলে আমদানির ওপর নির্ভরতা থেকেই যায়। এই আমদানিনির্ভর কাঠামোই বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার একটি অংশ করে তুলেছে।
পেট্রোল ও অকটেন তৈরির প্রক্রিয়াটি মূলত অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত। রিফাইনারিতে উচ্চ তাপে ক্রুড অয়েল গরম করে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করা হয়, যাকে ফ্র্যাকশনাল ডিস্টিলেশন বলা হয়। হালকা অংশ থেকে পেট্রোল উৎপন্ন হয় এবং উন্নত মানের জ্বালানি হিসেবে অকটেন তৈরি করা হয়। কিন্তু এই উৎপাদন পুরোপুরি নির্ভর করে কাঁচামাল তথা আমদানিকৃত তেলের ওপর। আর এখানেই বৈশ্বিক সংঘাতের প্রভাব সরাসরি এসে পড়ে।


বিশ্বের তেল সরবরাহের বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে, যেখানে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদক দেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল-এর সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে নড়বড়ে করে তুলেছে। যুদ্ধ উত্তেজনা বাড়লে ইরানের তেল রপ্তানি ব্যাহত হয়, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যায় এবং বেড়ে যায় দাম। একই সঙ্গে এই অস্থিরতা প্রভাব ফেলে গ্যাস সরবরাহেও, কারণ বাংলাদেশ এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে গেলে এই এলএনজি সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা থাকে, যা জ্বালানি খাতে চাপ আরও বাড়িয়ে তোলে। বাংলাদেশ যেহেতু তেল ও গ্যাস—উভয় ক্ষেত্রেই আমদানিনির্ভর, তাই এই মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ অনিশ্চয়তা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে এবং বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে।


এই সংঘাতের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে হরমুজ প্রণালী-এর ওপর, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল এই প্রণালী দিয়ে পরিবহন হয়। ইরান যুদ্ধে এই পথ কার্যচ অচল হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন এরই মধ্যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে তেলের দাম হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে।


শুধু তেল নয়, গ্যাসের বাজারেও এর প্রভাব গভীর। বাংলাদেশ এলএনজি আমদানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল, এবং এই সরবরাহের একটি বড় অংশ আসে কাতার থেকে, বিশেষ করে রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র থেকে। সম্প্রতি এই এলাকায় হামলার ঘটনা বাংলাদেশের জন্য বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করেছে। এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সমস্যার সৃষ্ঠি হয়েছে। এর সমস্যা সমাধানের জন্য বিকল্প হিসেবে তেলের ব্যবহার বেড়ে গেছে। যার ফলে পেট্রোল ও অকটেনের ওপর চাপ আরও বৃদ্ধি পায়েছে।


বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাও এই বৈশ্বিক প্রভাবকে আরও তীব্র করে তুলেছে। দেশে মজুত ক্ষমতা সীমিত হওয়ায় দীর্ঘ সময়ের জন্য জ্বালানি সংরক্ষণ সম্ভব হয় না। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য অস্থিরতাও দ্রুত দেশের বাজারে প্রভাব ফেলেছে। তাছাড়া পাইপলাইন ও পরিবহন অবকাঠামো পুরোপুরি উন্নত না হওয়ায় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে, যা সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে।


যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক শিপিং খরচ ও বীমা ব্যয়ও বেড়ে গেছে। তাই তেল আমদানির খরচ বাড়ে গেছে, যা সরকার ও ভোক্তা—উভয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মজুত ও সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।


অন্যদিকে চাহিদার দিক থেকেও সমস্যা রয়েছে। বর্তমানে গরম শুরু হওয়ায় ও বোরো মৌশুম চলায় এবং ঈদে পরিবহন খাতে চাপ বাড়ায় জ্বালানির চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। ঠিক এমন সময়ই তেলের আন্তর্জাতিক বাজার অস্থির থাকায় ও আমদানিতে সমস্যা হওয়ায় সংকট আরও দ্রুত প্রকট হয়ে উঠেছে।


সব মিলিয়ে দেখা যায়, দেশে পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদন থাকলেও তা চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাতের মতো বৈশ্বিক রাজনৈতিক উত্তেজনা, যা তেল ও গ্যাস সরবরাহকে অনিশ্চিত করে তুলছে। ফলে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট কেবল অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার ফল নয় বরং একটি জটিল বৈশ্বিক বাস্তবতার অংশ। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন বহুমুখী উদ্যোগ—উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানির উৎস বৈচিত্র্য, মজুত ক্ষমতা বাড়ানো এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করা। এই দায়িত্ব পুরোটাই নিতে হবে সরকারকে। এক্ষেত্রে সরকার এখন যদি সঠিক পদক্ষেপ নেয় তবেই পেট্রোল-অকটেনের দীর্ঘমেয়াদি সংকট থেকে উত্তরণের পথ তৈরি হবে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ