বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে শারীরিক সম্পর্কে শুধু পুরুষের শাস্তি কেন অবৈধ নয়: হাইকোর্ট
বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগে শুধু পুরুষকে শাস্তির আওতায় আনার বিধান কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
একইসঙ্গে প্রাপ্তবয়স্কদের সম্মতিমূলক সম্পর্ককে পরে ‘বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি’র অভিযোগে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার বিধান কেন অবৈধ হবে না, তাও জানতে চেয়েছেন আদালত।
‘নারী ও শিশু নির্যাতন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর মাধ্যমে সংযোজিত এই বিধান কেন সংবিধানবিরোধী, অকার্যকর ও বাতিল ঘোষণা করা হবে না, রুলে তা-ও জানতে চাওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার বিচারপতি হাবিবুল গনির নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন।
সংশ্লিষ্টদের এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
এর আগে একই বিষয়ে করা রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করেছিলেন। মঙ্গলবারের সম্পূরক রুলের মাধ্যমে সংশোধিত আইনের ওই বিধানের সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্নটি আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।
রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান।
রিটে বলা হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের সম্মতিতে হওয়া ব্যক্তিগত সম্পর্ককে শুধু ‘বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি’র ভিত্তিতে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার বিধানটি অস্পষ্ট ও বৈষম্যমূলক। একইসঙ্গে এ বিধান সংবিধানে নিশ্চিত করা মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আইনজীবী ইশরাত হাসানের বক্তব্য অনুযায়ী, সংশোধিত আইনে বিয়ের প্রলোভনে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তির বিধান করা হলেও কোন পরিস্থিতিতে অপরাধটি সংঘটিত হবে, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
কেউ বিয়ের কথা বলার পর শারীরিক সম্পর্কে জড়ালেই অপরাধ হবে, নাকি পরে বিয়ের প্রতিশ্রুতি পালন না করলে অপরাধটি সংঘটিত হবে—আইনে তা স্পষ্ট করা হয়নি বলে জানান তিনি।
আইনজীবীর প্রশ্ন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে সম্মতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্কে জড়ালে শুধু পুরুষ সঙ্গীকেই কেন সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে হবে।
তার যুক্তি, এ ধরনের সম্পর্কে উভয় পক্ষের সম্মতিপূর্ণ অংশগ্রহণ থাকে। সেখানে শুধু একজনকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা ন্যায়বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ইশরাত হাসান বলেন, এই বিধানের মাধ্যমে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেন তিনি নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা ছাড়াই কোনো পুরুষের প্রলোভনের শিকার হয়ে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছেন। অথচ সম্মতিমূলক সম্পর্কে উভয় পক্ষেরই অংশগ্রহণ থাকে।
তার মতে, রাষ্ট্র যদি প্রাপ্তবয়স্কদের প্রেম বা শারীরিক সম্পর্ক নিরুৎসাহিত করতে চায়, সেটি নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয় হতে পারে। কিন্তু এমন সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু এক পক্ষকে ফৌজদারি শাস্তির আওতায় আনা বৈষম্যমূলক।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশোধনের খসড়া আইনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয় ২০২৫ সালের ২০ মার্চ। সংশোধনীতে বিয়ের প্রলোভনে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তির বিধান করা হয়েছে।
তবে রিটকারীর মূল আপত্তি, এই বিধানে অপরাধের উপাদান ও সীমারেখা স্পষ্ট নয়। ফলে প্রাপ্তবয়স্কদের সম্মতিমূলক সম্পর্কের কোন পর্যায়ে তা ফৌজদারি অপরাধে পরিণত হবে, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
এখন হাইকোর্টের রুলের জবাবে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এসব প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিতে হবে। সেই জবাব এবং পরবর্তী শুনানিতে আদালতের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে সংশোধিত আইনের এই বিধানের সাংবিধানিক বৈধতার বিষয়টি।
মতামত দিন