Views Bangladesh Logo

রংপুর হত্যাকাণ্ড

কেন সন্দেহের তালিকায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ, যা বলছে পুলিশ

Masum   Hossain

মাসুম হোসেন

রংপুর মহানগরের কামালকাছনা মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্য হত্যার ঘটনায় কেন মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ চন্দ্র দাস পুলিশের সন্দেহের তালিকায় এলেন, তা খোলাসা করেছেন রংপুর মহানগর ডিবি পুলিশ। পাশাপাশি স্থানীয়দের বরাতে উঠে এসেছে গ্রেপ্তারের আগে-পরের বেশ কিছু খুঁটিনাটি তথ্য।

মুগ্ধ এবং সিদ্ধার্থকে কোন তথ্যের ভিত্তিতে, কীভাবে এবং কেন গ্রেপ্তার করা হলো, সে ব্যাপারে রংপুর মহানগর ডিবি পুলিশের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘পুলিশের তথ্য সংগ্রহের দুটি ধরনের উৎস থাকে—ডিজিটাল ও অ্যানালগ। ঘটনার সময় ডিজিটাল সোর্স ততটা সক্রিয় না থাকলেও অ্যানালগ সোর্সগুলো সক্রিয় ছিল।’

তিনি বলেন, ‘ওই সোর্সের মাধ্যমে পুলিশ জানতে পারে, ঘটনার পরদিন শনিবার সিদ্ধার্থ দাস বিভিন্ন দোকানে কেনাকাটা করেন এবং বড় অঙ্কের নোট, বিশেষ করে ১ হাজার টাকার নোট দিয়ে কেনাকাটা করেন। স্থানীয় দোকানদার ও পুলিশের সোর্সদের জানা ছিল, সিদ্ধার্থ সাধারণত এভাবে ১ হাজার টাকার নোট খরচ করে কেনাকাটা করার মতো ব্যক্তি নন। হঠাৎ তাঁর হাতে এত টাকা এল কোথা থেকে—এ বিষয়টি পুলিশের সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’

সনাতন চক্রবর্তী জানান, সিদ্ধার্থের আচরণেও কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা গিয়েছিল এবং বিষয়টি নিয়ে এলাকায় কিছুটা গুঞ্জনও ছিল। তবে মরদেহ উদ্ধারের আগে তাকে সরাসরি সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। চারজনের মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশের সোর্সরা সিদ্ধার্থের গত দুই দিনের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য দেয়, যাতে তার চলাফেরা সন্দেহজনক মনে হয়। এরপর সোর্সের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ প্রথমে সিদ্ধার্থকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি প্রথমে কিছু স্বীকার করছিলেন না। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মুগ্ধ দাসকেও আটক করা হয়।

সনাতন চক্রবর্তীর ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদের পর মুগ্ধ দাস গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন, যার ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে লুট হওয়া গয়নাগুলো একটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখা হয়েছে। পরে ওই স্থান থেকে গয়নাগুলো উদ্ধার করা হয় এবং নিহত পরিবারের আত্মীয়স্বজন সেগুলো চক্রবর্তী পরিবারের গয়না হিসেবে শনাক্ত করেন। এভাবেই ধীরে ধীরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের বিরুদ্ধে সন্দেহ নিশ্চিত হয় এবং তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও উদ্ধার হওয়া গয়নার সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেয় পুলিশ বলে জানান সনাতন চক্রবর্তী।

গ্রেপ্তারের আগে-পরের ঘটনাক্রম নিয়েও রয়েছে বেশ কিছু প্রশ্ন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ আগস্ট শুক্রবার সকাল ৬টার দিকে চারজনকে হত্যা করা হয় এবং পরদিন শনিবার রাত ১১টার দিকে দাসপাড়ার বাড়ি থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শনিবার দিবাগত গভীর রাতে পুলিশ মুগ্ধকে গ্রেপ্তার করতে তার বাড়িতে যায়। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে ঘুম ভাঙে তার মা সেনা রানী দাসের। দরজা খুললে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মুগ্ধ বাড়ির অন্য একটি দরজা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন, শেষ পর্যন্ত পুলিশ তাকে আটক করে। হত্যাকাণ্ডের আগের রাত বৃহস্পতিবার মুগ্ধ বাড়িতে ছিলেন বলে তার মা জানালেও গভীর রাতে তিনি বের হয়েছিলেন কিনা তা তিনি জানেন না।

সিদ্ধার্থ বৃহস্পতিবার রাতে নিজের বাড়িতে ছিলেন না, ছিলেন একই এলাকার সীমান্তের বাসায়। তার বাবা বিনয় চন্দ্র দাস জানান, ছেলে মাঝেমধ্যেই সীমান্তের বাড়িতে থাকতেন, আবার চাচা বিজয় চন্দ্র দাসের বাড়িতেও থাকতেন। শনিবার গভীর রাতে সিদ্ধার্থকে আটক করতে পুলিশ তার বাড়িতে গেলে প্রথমে তাকে পাওয়া যায়নি, পরে বাবা তাকে ডেকে আনেন। পরদিন সকালে পুলিশ তাকে চাচা বিজয় চন্দ্র দাসের বাড়িতে নিয়ে যায়, যেখানে একটি নারকেল গাছের নিচে বালু চাপা দেওয়া অবস্থায় কিছু গহনা ও নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়। পুলিশ দাবি করে, এসব জিনিস সিদ্ধার্থই সেখানে রেখেছিলেন। তবে চাচা বিজয় চন্দ্র দাস জানান, সিদ্ধার্থ শনিবার রাতে তার বাসাতেই ছিলেন এবং মাঝেমধ্যে সেখানে থাকতেন, কিন্তু গহনা ও টাকা কারা বালু চাপা দিয়ে রেখেছে তা তিনি জানেন না।

সিদ্ধার্থের বড় ভাই পার্থ চন্দ্র দাস বলেন, তার ভাই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকলে স্বাভাবিকভাবে ঘটনার পর সেখানে থাকার কথা নয়; তবে ভাই দোষী কিনা তা আদালতেই প্রমাণিত হবে। তার অভিযোগ, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে বড় কোনো কারণ থাকতে পারে এবং মূল ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা হচ্ছে।

গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশে দেবুর একটি নির্মাণাধীন বাড়ি রয়েছে, যার দ্বিতীয়তলায় থাকেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হেমান সুকুমার মণ্ডল। তিনি জানান, তাদের বা গণপতি পরিবারের বাড়ির ছাদে কাউকে কখনো নেশা করতে দেখেননি। তিনি বলেন, ‘গণপতি পরিবারের সদস্যরা এলাকার অন্যদের সঙ্গে খুব বেশি মিশতেন না, নিজেদের মতো করেই চলতেন, যে কারণে পরিবারের ভেতরের খবর বাইরে জানা যেত না।’ স্থানীয়দের ধারণা, গণপতির বাড়ি লাগোয়া ওই নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদকে হত্যাকারীরা যাতায়াতের পথ হিসেবে ব্যবহার করে থাকতে পারে।

দাসপাড়া এলাকাটি বেশ ঘনবসতিপূর্ণ, ফলে একটি বাড়িতে বড় কোনো ঘটনা ঘটলে আশপাশের বাসিন্দাদের তা টের পাওয়ার সুযোগ থাকে। সিদ্ধার্থের ভাই পার্থ চন্দ্রসহ কয়েকজন প্রশ্ন তুলেছেন, এমন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একই পরিবারের চারজনকে হত্যা করা হলো, অথচ চিৎকার-চেঁচামেচি বা কোনো শব্দ আশপাশের কারও কানে গেল না কেন। বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মামলার বাদী ও গণপতির ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। তার অভিযোগ, হত্যার আগে বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ পোল থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। কেন ও কারা এই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করল, তার উত্তর মিললে হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ জানা যাবে বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষ্য, দুজনের পক্ষে এত বড় ঘটনা ঘটানো সম্ভব নয়, এর নেপথ্যে বড় একটি চক্র রয়েছে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ