কোন দিকে যাচ্ছে আগামী নির্বাচনের ফলাফল?
আগামী জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল কী হবে? নতুন সরকার গঠন হবে কোন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে? না কি কোনো দলই সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাবে না এবং কোয়ালিশন সরকার গঠিত হবে? এ ধরনের অনেক প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মনে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন নির্বাচিত সরকার বাংলাদেশকে কোন পথে এগিয়ে নেবে?
কারণ, যে অবস্থায় গত ১৬ বছর বাংলাদেশ ছিল, এরপর গত দেড় বছর ধরে বাংলাদেশে যে ধরনের রাজনৈতিক অবস্থার চিত্র দেখা গেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন সরকারের সামনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দেশকে স্থিতিশীল রাখার চ্যালেঞ্জই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে নতুন একটি প্রশ্ন, গত সপ্তাহে নতুন করে সামনে এসেছে। যে রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বে নারীর যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে ঘোষণা এসেছে, সেই রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করলে দেশে সরকারি প্রশাসনের শীর্ষ পদে নারীর অবস্থান, অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীর অংশগ্রহণ, সর্বোপরি নারী শিক্ষা সংকুচিত হয়ে পড়বে কি না?
গত কয়েক দিন আগেও সবচেয়ে জোরালো প্রশ্ন ছিল, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তো? রাজনৈতিক দলগুলোর আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর মোটামুটিভাবে সেই শঙ্কা অনেকখানি কেটেছে। এই প্রেক্ষপেটে আগামী নির্বাচনের ফলাফল কোন দিকে যাচ্ছে, চায়ের টেবিল থেকে সংবাদমাধ্যমের বার্তাকক্ষ-সর্বত্রই সে নিয়েই চলছে তুমুল আলোচনা। আমরা এখানে কিছু নিয়ামক ও নির্ধারক সামনে নিয়ে এসে আগামী নির্বাচনের ফলাফল কোন দিকে যেতে পারে, সে সম্পর্কে একটি যুক্তিসঙ্গত ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
মনে রাখতে হবে, এবারের জাতীয় নির্বাচনের প্রকৃতি সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ এর আগে বাংলাদেশে নির্বাচন হয়েছে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সরকার কিংবা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। এবারই প্রথম একটি অন্তবর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হচ্ছে, যার চরিত্র নির্দলীয় হলেও পক্ষপাতমুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, এই সরকার ক্ষমতায় এসেছে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব জুলাই অভুত্থ্যানের মধ্য দিয়ে। সরকার গঠনের পর সরকার প্রধান ড.মুহাম্মদ ইউনূস নিজের প্রথম ভাষণেই বলেছেন জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব ছাত্র-জনতাই তার নিয়োগকর্তা।
যেহেতু একটি অভুত্থান ছাত্র-জনতার হলেও শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বের ভূমিকায় কয়েকটি রাজনৈকি দল এবং কয়েকজন নেতাই সামনে আসেন, সে কারণে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া রাজনৈতিক দল এবং সামনের সারিতে থাকা নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরাই মূলত নিয়োগকর্তা হিসেবে ছাত্র-জনতাকে প্রতিনিধিত্ব করছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া সব রাজনৈতিক দলই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, অতএব, বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি সরকারের পক্ষপাতিত্ব নেই।
কিন্তু যেহেতু জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের কয়েকজন এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, সে কারণে নিয়োগকর্তা হিসেবে তাদের প্রতি সরকারের একটা পক্ষপাত থাকাটা অযৌক্তিক নয়। এ কারণে এবারের নির্বাচনে সরকারের শতভাগ পক্ষপাতমুক্ত থাকার ক্ষেত্রে এক শতাংশ হলেও সন্দেহ থেকে যায়।
আরও আগে থেকেই এবারের নির্বাচনে দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে লড়াইয়ের পূ্র্বাভাস পাওয়া গেছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে বিপুল জনমত তৈরি হয়েছে- এমন একটি ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা গত প্রায় এক বছ থেকেই দেখা গেছে। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে সব জাতীয় নির্বাচনে ফল বিশ্লেষণ করলে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেই আসার কথা নয়। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের বড় অংশের সঙ্গে জামায়াতের ঘনিষ্ঠতা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদগুলোতে ছাত্রশিবির প্রার্থীদের জয় এবং সর্বশেষ জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের হাত ধরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দল এনসিপির সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠন, জামায়াতের প্রতি জনসমর্থন ব্যাপকহারে বেড়েছে, এমন ন্যারেটিভ তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অনুপস্থিত থাকলেও তাদের একটা বড় ভোটব্যাংক দেশে আছে। ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করলে যেটা প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে। বিএনপির যে ভোটব্যাংকও জামায়তের চেয়ে কযেকগুণ বড় (বিএনপি ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ, জামায়াত প্রায় ১০ শতাংশ)। এ কারণে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের ভোটাররা কী করবেন কিংবা কোন পক্ষে সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটা ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের ফল নির্ধারণে অবশ্যই বড় ভূমিকা রাখবে। এই ভোটাররা যদি বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টিকে ভোট দেয় তাহলে জামায়াতের নির্বাচনী ফলাফল বড় জোর ২০০১-এর নির্বাচনের ফলের (১৭ আসন) মতো হতে পারে।
যেহেতু এবার বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জামায়াতের সঙ্গে জোটে আছে, সে কারণে হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে জামায়াতের পক্ষে আরও কিছু ভোট যোগ হতে পারে। সেটা যোগ হলে জামায়াতের আসন বিশটি কিংবা তার চেয়ে দু’একটি বেশি হতে পারে। আর যদি আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের বড় অংশ জামায়াত পায় তাহলে জামায়াত একশোর বেশি আসন পেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
প্রকৃতপক্ষে এবারের ভোটের ফল নির্ধারণে ভরকেন্দ্রের ভূমিকায় রয়েছে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক। আবার আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংকের এই ভোটাররা যদি ভোটকন্দ্রে না যান, সেটাও নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ভোটার উপস্থিতি সম্মানজনক না হলে নির্বাচনে ফল যাই হোক, আন্তর্জাতিকভাবে এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে, যেটা এর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের সংবাদ সম্মেলনেও উঠে এসেছে।
জামায়াতের নেতারা জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রথম দিকে ভালো ভালো কথা বলেছেন। যেটা দেশের সব শ্রেণির মানুষেরই ভালো লেগেছে। কিন্তু যতই দিন গেছে, জামায়াত নেতাদের বক্তব্য লাগাম ছাড়া হয়েছে। বিশেষ করে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা শাহজাহান চৌধুরী যখন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন ‘সরকারি প্রশাসন এবং পুলিশের লোকজনকে জাময়াত নেতাদের কথায় উঠতে-বসতে হবে’, তখন সত্যিকার অর্থেই সাধারণ মানুষ জামায়াতের নেতৃত্বে ভবিষ্যত সরকারের কথা ভেবে ভীত হয়ে পড়েন।
জামায়াত প্রার্থীদের ‘জান্নাতের টিকেট’ বিক্রির একাধিক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এর জবাবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘জামায়াত নেতাদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড ইসলামের দৃষ্টিতে শিরক। জান্নাত দেওয়ার ক্ষমতা শুধুমাত্র মহান আল্লাহর। সে ক্ষমতা যখন জামায়াতের নেতারা দাবি করেন, তখন সেটা ইসলামের দৃষ্টিতে অবশ্যই শিরক।’
আসলে জামায়াতের এই ‘জান্নাতে’র টিকেট বিক্রির নির্বাচনী কৌশল নতুন কিছু নয়। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন থেকেই নির্বাচনী প্রচারে জামায়াত নেতাদের এই অপকৌশল দেখা গেছে। এখানেই জাময়াত নেতাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার উন্নতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারণ, ২০২৬ সালে যারা মাঝবয়সী, যারা তরুণ তারা আশি-নব্বইয়ের দশকের চেয়ে ধর্মীয় জ্ঞান অনেক বেশি রাখেন। ফলে জামায়াত প্রার্থীদের ‘জান্নাতের টিকেট’ বিক্রির বিষয়টি যে চরম প্রতারণা এবং শিরকের পাপ সেটা সাধারণ মানুষ খুব ভালো করেই বোঝে। ফলে পুরনো ধ্যান-ধারনা থেকে এই প্রচারণাকে মোক্ষম দাওয়াই মনে করলেও এবার ‘জান্নাতের টিকেট’ বিক্রির নির্বাচনী কৌশল জামায়াতের বিপক্ষে যাওয়ার আশংকাই বেশি।
আরও একটা বিষয় খুবই লক্ষণীয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রসংসদে নির্বাচিত ছাত্রশিবির নেতাদের গত কয়েক মাসের ভূমিকাও সাধারণ মানুষকে শঙ্কিত করে তুলেছে। প্রায় প্রতিটি বিশ্বিবিদ্যালয়ে এই ছাত্রনেতাদের হাতে শিক্ষকরা, বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিকরা নির্যাতিত হয়েছেন। যদি মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর ন্যূনতম শ্রদ্ধা থাকত, তাহলে তারা বুঝত কেউ ভিন্নমতের হলে, ভিন্নমত দিলে কিংবা সমালোচনা করলেই কাউকে শারীরিক নির্যাতন করা যায় না। আগে দল ক্ষমতায় থাকলে ছাত্রদল কিংবা ছাত্রলীগের নেতাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অবাধ মাস্তানি করতে দেখা যেত। এখন সেই মস্তানি করতে দেখা যাচ্ছে ছাত্রসংসদে থাকা ছাত্রশিবির নেতাদের। এটা দেশের যেকোনো বোধসম্পন্ন সচেতন মানুষকে শঙ্কিত করে তোলে। এই বোধটুকু যদি জামায়াত নেতারা ছাত্র শিবির নেতাদের শেখাতে না পারেন, তাহলে তারা দেশের নেতৃত্ব নিলে প্রতিটি এলাকায় তাদের দলের এমপিদের ভূমিকা কী হবে? আওয়ামী লীগ খারাপ ছিল, যে কারণে তারা জনরোষে বিতাড়িত হয়েছে। এখন যারা একের পর এক একইভাবে খারাপ উদাহরণ তৈরি করছেন, তারা কি আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখতে পাচ্ছেন?
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, জামায়াতের শীর্ষ পদে কোনো নারী কখনোই যাবে না। এটা তাদের দলীয় নীতি। তিনি তার নীতির সমর্থনে যুক্তি দিয়ে নারীদের শারীরিক সীমাবদ্ধতার সেই পুরনো অপব্যাখা টেনে এনেছেন। অথচ এই বাংলাদেশেই দুই নারী প্রধানমন্ত্রী দেশ পরিচালনা করেছেন। সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা থেকেছেন।
পাকিস্তানে বেনজির ভুট্টো প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় (১৯৯০ সালে) সন্তানের মা হয়েছেন। সরকার বা দল পরিচালনায় কোনো সমস্যা তো হয়নি। শীর্ষ পদ মানে তো শুধু তো দেশের প্রধানমন্ত্রী কিংবা দলীয় প্রধান হওয়া নয়। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে শীর্ষ পদ আছে।
সরকারি প্রশাসনে ইউএনওরা মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা, ডিসিরা জেলা পর্যায়ে শীর্ষ কর্মকর্তা। সচিবরা স্ব স্ব মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা। তাহলে দলীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জামায়াত ক্ষমতায় এলে কোনো সরকারি প্রশাসনে নারী কর্মকর্তা ইউএনও, ডিসি কিংবা সচিব হতে পারবেন না। এমনকি তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক, পরিচালক, কলেজের অধ্যক্ষ কিংবা কোনো অফিস প্রধান হতে পারবেন না!
আবার এমন আশঙ্কাও করা যেতে পারে, যেহেতু সরকারি প্রশাসনে দায়িত্বপালন অত্যন্ত জটিল এবং কষ্টসাধ্য, অতএব নারীদের বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ বন্ধ করা হোক! অতএব জামায়াত আমির আল জাজিরাকে এই বক্তব্য দেওয়ার আগে কতটা ভেবেছেন জানি না, প্রকৃতপক্ষে তার এই বক্তব্যের প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং ভোটের মাঠে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে বাধ্য। জামায়াত আমিরের এই বক্তেব্য আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তাদের গ্রহণযোগ্যতা অনেক কমিয়ে দেবে, সন্দেহ নেই।
এবার আসি বিএনপি প্রসঙ্গে। বিএনপির সামনে বড় সমস্যা দলের ভেতরে চাঁদাবাজ এবং চাটুকার। আওয়ামী লীগ নেতাদের মতোই তাদের আরও একটি বড় সমস্যা হচ্ছে, আত্মসমালোচনা না করা এবং স্রোতে গা ভাসিয়ে এক ধরনের আত্মতৃপ্তিতে ভুগতে থাকা। ফলে জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই বিএনপির বিরুদ্ধে জামায়াতসহ অন্যান্য প্রতিপক্ষ দল চাঁদবাজির ব্যাপক অভিযোগ তুলেছে এবং সেই অভিযোগ অমূলক নয়।
ফলে নির্বাচনের প্রচারে এই চাঁদাবাজির অভিযোগ বিএনপি প্রার্থীদের নিশ্চিতভাবেই ভোগাচ্ছে, ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা বেশ চাটুকার পরিবেষ্টিত, এটাও দেখা যাচ্ছে। কয়েকটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে- বিভিন্ন সভায় চাটুকাররা গায়ে পড়ে সাংবাদিক এবং সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছেন, যার দায়ভার কেন্দ্রীয় নেতাদের নিতে হচ্ছে। চাটুকারদের প্রতি অন্ধ থেকে নেতিবাচক প্রচার কিংবা অপপ্রচার মোকাবিলায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ব্যর্থ হলে নির্বাচনের প্রত্যাশিত ফলাফলে হোঁচট খাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
এর বাইরে জাতীয় পার্টি বরাবরের মতোই অঞ্চল ভিত্তিতে কিছু আসন পেতে পারে। আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের ভোট পেলে আসনসংখ্যা আগের চেয়ে বেশি হতেই পারে। নির্বাচনের মাঠের বাস্তবতায় বাকি রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে আলোচনার কিছু নেই।
এবারের জাতীয় নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে গণভোট। রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতেই জুলাই সনদ গৃহীত হওয়ার দাবি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের। যদিও বিএনপির কিছুটা ভিন্নমত আছে। সেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নেই মূলত গণভোট।
সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসেদে কোনো বিল পাশের আগে কোনো বিষয়ে জাতীয় ভোট হতে পারে কি না সে নিয়েও ড. শাহদীন মালিকসহ সংবিধান বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল ব্যয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এটাও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। কোথায় কীভাবে প্রচারণার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, সেটা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।
সব বিতর্কের পরও যেহেতু জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গুরুত্ব রয়েছে, সে কারণে এই গণভোট অবশ্যই ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। অতএব গুরুত্ব বিবেচনায় কেউ হ্যাঁ ভোট দেবেন, আবার কারও ‘না’ ভোট দেওয়ার গণতান্ত্রিক অধিকারও আছে। ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কেউ প্রচারণা চালাতে চাইলে চালাতেই পারেন। সেটা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরা করতে পারেন, যেসব রাজনৈতিক দল দলগতভাবে ‘হ্যাঁ’ সমর্থন করে তারাও প্রচারণা চালাতে পারে। কিন্তু এই নির্বাচনে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের যেভাবে সরকার ব্যবহার করেছে সেটা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু এবং নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন রিটানিং অফিসারদের কাছে লেখা এক চিঠিতে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, ‘আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটে সরকারি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী কোনো পক্ষ নিতে পারবেন না। তারা যদি ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’-এর পক্ষে প্রচার চালান, সেটি হবে দণ্ডনীয় অপরাধ।’ নির্বাচন কমিশনের এই দৃঢ় পদক্ষেপ আশার সঞ্চার করে। আমরা আশাকরি ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অবাধ, সুষ্ঠু হবে এবং জাতির সামনে সঠিক ফলাফল উপস্থাপিত হবে।
শেষে গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলতে চাই। জুলাই অভ্যুত্থানের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে গণহারে হত্যা-মামলা এবং বেশ কয়েকটি সংবামাধ্যমের অফিসে হামলা, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
একাধিক টিভি চ্যানেলে সাংবাদিকদের বিনা অপরাধে চাকরিচ্যুত করতে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করা হয়েছে। একাধিক সংবাদমাধ্যমে সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদ রাতারাতি দখল হয়েছে। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের অফিসে সাংবাদিকের ভেতরে রেখে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এসব হামলার বিরুদ্ধে গতানুগতিক নিন্দা জানানো হলেও হামলায় জড়িত অপরাধীদের ধরার জন্য কোনো শক্ত অবস্থান দেখা যায়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরে মত প্রকাশের দায়ে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরেও একইভাবে সাংবাদিক নির্যাতন, কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই সাজানো মামলায় হয়রানি, জেলে প্রেরণের ঘটনা ঘটেছে।
এসবের বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ছিল অত্যন্ত দুর্বল। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা সাংবাদিক হয়রানি ও নির্যাতনের ঘটনায় মাঝে মাঝে সামান্য সোচ্চার হলেও বাদ-বাকি রাজনৈতিক দলের নেতারা সাংবাদিক নির্যাতন, হয়রানির ঘটনা আমলেই নেননি।
ভয়টা এখানেই। সরকার বদলায়, সাংবাদিক নির্যাতনের চিত্র একই থাকে। হয়তো রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারেও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে খুব সুন্দর কিছু বাক্য লেখা হবে। কিন্তু যেসব দল রাজপথে থেকেও সাংবাদিক হয়রানির বিষয়ে সোচ্চার হয় না, বরং সেসব দলের অনুগত ছাত্র সংগঠনের নেতারা নানাভাবে সাংবাদিকদের সামনে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে, টকশোতে ভিন্নমতের সাংবাদিককে প্রকাশ্যে হুমকি দেয়, নির্বাচনে তারা ক্ষমতায় গেলে আদৌ বাংলাদেশে সাংবাদিকতা কিংবা যুক্তি-বুদ্ধির চর্চা থাকবে কি না সেটাও একটা বড় প্রশ্ন হয়েই থেকে যাচ্ছে। অতএব এবার ভোটারদের দায়িত্ব অনেক। ভোটারদের দায়িত্বশীলতাই নির্ধারণ করবে ভোটের ফল কোন দিকে যাবে এবং বাংলাদেশ কোন দিকে এগোবে।
রাশেদ মেহেদী, সম্পাদক, ভিউজ বাংলাদেশ
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে