Views Bangladesh Logo

সামুরাইকে উড়িয়ে দেয়া সাম্বা ঝড় থামবে কোথায়?

১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের ‘মারাকানাজো’ আজও ব্রাজিলিয়ানদের মনে গভীর ক্ষত হয়ে আছে। অথচ সেই ক্ষত থেকেই জন্ম নিয়েছিলেন ফুটবল সম্রাট পেলে, আর তারই ধারাবাহিকতায় ব্রাজিল বারবার বিশ্বকাপের ইতিহাসে ফিরে আসার গল্প লিখেছে।

২০২৬ সালের হিউস্টনের এক রাতে হয়তো সেই ইতিহাসই নতুন করে সাক্ষী হলো একটি নতুন ব্রাজিলের উত্থানের। নয় দশক আগে উরুগুয়ের কাছে হেরে কেঁদেছিল যে ব্রাজিল, আজ জাপানের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের জয়ে তারা যেন জানান দিল—এই দল আর সেই পুরনো ব্রাজিল নয়। এই ব্রাজিল কাঁদে না, লড়ে, ফিরে আসে, আর জেতে।

যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে সোমবার রাতে বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এ জাপানের মুখোমুখি হয়েছিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। প্রথমার্ধে কাইশু সানোর গোলে পিছিয়ে পড়েও দ্বিতীয়ার্ধে কাসেমিরোর গোলে সমতা ফেরায় তারা, এবং যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে গাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির জয়সূচক গোলে ২-১ ব্যবধানে জিতে শেষ ষোলোতে জায়গা করে নেয় সেলেসাওরা।

প্রথমার্ধ: সামুরাইদের চমক, ব্রাজিলের হতাশা
হিউস্টনের মাঠে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছিল ব্রাজিল। দ্বিতীয় মিনিটেই ব্রুনো গিমারায়েসের নিচু শট কর্নারে পরিণত হয়, আর ভিনিসিয়ুস জুনিয়র একের পর এক সুযোগ তৈরি করছিলেন। কিন্তু জাপানি রক্ষণ ও গোলকিপার দায়ন সুজুকি শুরু থেকেই ছিলেন দুর্ভেদ্য।

২৯ মিনিটে আসে ম্যাচের প্রথম গোল। ব্রাজিলের দানিলোর ভুল পাস কেড়ে নিয়ে মিডফিল্ড থেকে দ্রুত এগিয়ে যান কাইশু সানো, ৩০ গজ দৌড়ে বক্সের সামনে থেকে নিচু শটে পরাস্ত করেন অ্যালিসন বেকারকে। মেইঞ্জের এই মিডফিল্ডারের এটিই ছিল প্রথম আন্তর্জাতিক গোল, আর তা দিয়েই পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় জাপান। বিরতি পর্যন্ত এগিয়ে ছিল সামুরাই ব্লু।

দ্বিতীয়ার্ধ: ডন কার্লোর ম্যাজিকে ব্রাজিলের প্রত্যাবর্তন
বিরতিতে ড্রেসিংরুমে গিয়ে লুকাস পাকুয়েতাকে তুলে নিয়ে তরুণ এন্দ্রিককে মাঠে নামান কোচ কার্লো আনচেলত্তি, আর দ্বিতীয়ার্ধে দেখা যায় এক ভিন্ন ব্রাজিলকে। ৫০ মিনিটে এন্দ্রিকের ক্রস সামান্যের জন্য খুঁজে পায়নি ভিনিসিয়ুসকে। ৫৩ মিনিটে গিমারায়েসের হেড দুর্দান্তভাবে ঠেকান সুজুকি, আর এক মিনিট পর কাসেমিরোর হেডও গোললাইন থেকে ফিরিয়ে দেন জাপানি গোলকিপার।

তবে ৫৬ মিনিটে আর রক্ষা পায়নি জাপান। ভিনিসিয়ুসের বাড়ানো পাসে গ্যাব্রিয়েলের ক্রস থেকে লাফিয়ে হেডে গোল করেন কাসেমিরো। ৩৪ বছর ১২৬ দিন বয়সে এই গোল করে বিশ্বকাপে ব্রাজিলের দ্বিতীয় বয়স্ক গোলদাতা হন তিনি—১৯৯৮ সালে বেবেতোর পরই এখন তার নাম।

শেষ মুহূর্তের নাটক: মার্টিনেল্লির জয়সূচক গোল
সমতা ফিরলেও থেমে থাকেনি ব্রাজিল। ভিনিসিয়ুস, এন্দ্রিক, কাসেমিরো—সবার পায়েই বারবার আক্রমণ তৈরি হচ্ছিল, কিন্তু জাপান গড়ে তুলেছিল এক দুর্ভেদ্য ‘লো ব্লক’। সময় ফুরিয়ে আসছিল, রেফারি ৬ মিনিট যোগ করার ঘোষণা দিলে গ্যালারিতে নেমে আসে নীরবতা—মনে হচ্ছিল ম্যাচ গড়াবে অতিরিক্ত সময়ে।

কিন্তু ৯৫তম মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। রায়ান রাফিনহার প্রেসিংয়ে জাপানিদের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে গিমারায়েসকে বাড়িয়ে দেন তিনি, আর গিমারায়েসের নিখুঁত থ্রু পাস থেকে বল পেয়ে যান গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি। আর্সেনালের এই ফরোয়ার্ড ঠান্ডা মাথায় বল জাপানি গোলকিপার সুজুকির হাত ছুঁইয়ে ডান পোস্টে লাগিয়ে জালে পাঠান। শেষ বাঁশির আগেই ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ব্রাজিল—২০০২ বিশ্বকাপের পর এই প্রথম পিছিয়ে পড়েও কোনো ম্যাচ জিতল তারা, দীর্ঘ ২৪ বছরের অপেক্ষার অবসান।

‘ডন কার্লো’ ম্যাজিক: যেভাবে বদলে গেল ম্যাচের মোড়
এই প্রত্যাবর্তনের পেছনে ছিলেন ডাগআউটে নিরলস পরিশ্রম করা ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। ইনজুরিতে পড়া পাকুয়েতাকে তুলে এন্দ্রিককে নামানোর সিদ্ধান্ত ছিল সময়োপযোগী। ৬০ মিনিটে ওয়ার্ম-আপে থাকা নেইমারকে না নামিয়ে মার্টিনেল্লিকে মাঠে পাঠানোর সিদ্ধান্তটিও প্রমাণিত হয় তার মাস্টারস্ট্রোক হিসেবে। শেষদিকে হাই-প্রেসিংয়ের নির্দেশ দেওয়ায় রাফিনহার চাপেই জাপানিদের ভুল থেকে আসে জয়সূচক গোলের সুযোগ।

ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি বলেন, “এই জয় আমাদেরই প্রাপ্য ছিল। আমরা ধৈর্য হারাইনি।” বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে ২৯টি ট্রফি জেতা এই কোচ প্রায়ই বলেন, শেষ বাঁশি বাজার আগে গল্প শেষ হয় না—জাপান সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে এই ম্যাচে।

এই জয়ে ব্রাজিলের লাভ কী?
প্রথমত, মনোবল—২০০২ সালের পর পিছিয়ে পড়েও জেতার এই নজির দলকে দিয়েছে বিশাল আত্মবিশ্বাস। দ্বিতীয়ত, দলীয় গভীরতা—মার্টিনেল্লি ও এন্দ্রিকের মতো তরুণরা প্রমাণ করেছেন যে শুধু নেইমারের ওপর নির্ভর করতে হবে না এই দলকে। তৃতীয়ত, কৌশলগত নমনীয়তা—প্রয়োজনমতো প্রতিপক্ষের সঙ্গে মানিয়ে খেলার সক্ষমতাও দেখিয়েছে আনচেলত্তির শিষ্যরা। কাসেমিরোর গোল আর মার্টিনেল্লির শেষ মুহূর্তের গতি মিলিয়ে ব্রাজিল বুঝিয়ে দিল, এই দল শুধু তারকা-নির্ভর নয়, বরং একটি সংগঠিত শক্তিশালী ইউনিট।

নকআউটে ব্রাজিলের পথ
শেষ ষোলোতে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ হবে নরওয়ে ও আইভরি কোস্টের মধ্যকার বিজয়ী দল। নরওয়ের রয়েছে আর্লিং হাল্যান্ডের মতো ভয়ংকর আক্রমণাত্মক অস্ত্র, আর আইভরি কোস্টের শক্তি গতি ও ফিজিক্যালিটিতে। তবে এই মুহূর্তে আনচেলত্তির অভিজ্ঞতাই ব্রাজিলের কাছে সবচেয়ে বড় সম্পদ—জাপান ম্যাচের মতো কৌশল বদলে যে কোনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য তার আছে। তবে সামনে এগোতে হলে মিডফিল্ডে রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা বাড়িয়ে আরও সংগঠিত হতে হবে ব্রাজিলকে।

হিউস্টনের এই রাতে ব্রাজিল প্রমাণ করেছে, তারা আর পুরনো ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে না। জাপানের মতো লড়াকু দলকে তাদেরই অস্ত্রে হারিয়ে সেলেসাওরা জানিয়ে দিয়েছে, হেক্সার স্বপ্ন এখনও বেঁচে আছে। ২০০২ সালের পর এই প্রথম পিছিয়ে পড়া থেকে ফিরে আসার ক্ষমতা দেখাল ব্রাজিল, আর সেই গল্প লিখলেন ডন কার্লো আনচেলত্তি। সাম্বার এই ঝড় কোথায় গিয়ে থামবে, তা এখনই বলা মুশকিল। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট—এই ব্রাজিল অন্যরকম। এই ব্রাজিল লড়ে, ফিরে আসে, আর জেতে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ