অর্বাচীন অন্ধকারের নিচে সাংবাদিকতার প্রদীপ
১৯৯৯ সালের মে মাস। তখন আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এক বছর আগে বাজারে আসা দৈনিক প্রথম আলো তখন আমাদের মতো তরুণের কাছে প্রতিটি সকালের আরাধনা। আমি তখন দৈনিক সংবাদের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি। কিন্তু সকালে উঠে হলের কমন রুমে গিয়ে সবার আগে প্রথম আলো পড়ার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার মনে আছে, ১৯৯৯ সালের ৯ মে প্রকাশিত সম্পাদক মতিউর রহমানের সেই কলামটি—‘প্রধানমন্ত্রী, ছাত্রলীগ সামলান’। সে কী ক্ষুরধার লেখনী! ছাত্রলীগের তখনকার সন্ত্রাস ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে একজন সাহসী সম্পাদকের দুর্বিনীত উচ্চারণ! জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন ছাত্রলীগ দুই ভাগে বিভক্ত, ‘খুনি গ্রুপ ও ধর্ষক গ্রুপ’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রলীগের অন্তর্দ্বন্দ্বে তখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের জীবন ওষ্ঠাগত। সেই সময়ে মতিউর রহমানের কলাম যেন আমাদের সবার মনের কথা! এরপর ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি মতিউর রহমান প্রথম আলোতে আবারও কলাম লিখলেন একই শিরোনামে, ‘প্রধানমন্ত্রী, ছাত্রলীগকে সামলান’। তখনো ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ সরকার।
২০০৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে মতিউর রহমানের আরও একটি কলাম ব্যাপক সাড়া জাগায়। তখন আমি ঢাকায় পুরোপুরি পেশাদার সাংবাদিকতায়। কাজ করি দৈনিক জনকণ্ঠে। মনে আছে, সে সময় জনকণ্ঠ অফিসে দিনভর আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল মতিউর রহমানের সেই আলোচিত কলাম, ‘বাংলাদেশ কি ব্যর্থ রাষ্ট্র হতে চলেছে?’ সে সময় বিশ্বখ্যাত মার্কিন সাময়িকী ‘ফরেন পলিসি’ এবং ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ফান্ড ফর পিস’ প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাপী ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ বা ‘ফেইলড স্টেটস ইনডেক্স’ প্রকাশ করেছিল। সেই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭তম। এই অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতেই মতিউর রহমান তাঁর ব্যাপক আলোচিত এই কলামটি লিখেছিলেন, যেখানে তিনি ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা এবং হামলা-পরবর্তী সময়ে বিচারের নামে ‘জজ মিয়া’ নাটক ও প্রহসনের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।
২০০৭ সালের ১১ জুন ‘দুই নেত্রীকে সরে দাঁড়াতে হবে’ শিরোনামে কলাম লিখে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। তখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—উভয় দলের নেতারাই তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করেন। সে সময় ক্ষমতায় ছিল ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
আজ মতিউর রহমানের আলোচিত কলামগুলো সামনে নিয়ে এলাম এ জন্য যে, বাংলাদেশে কোন আমলে স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং সাংবাদিকদের লেখার স্বাধীনতা কেমন ছিল, সেটা বোঝানো। এর জন্য প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের কলামই আমার চিন্তায় সর্বোত্তম উদাহরণ বিবেচিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যতই দুঃশাসন, নিপীড়ন, নির্যাতন চলুক না কেন, সম্পাদক মতিউর রহমান তখনকার প্রধানমন্ত্রীর চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি আঙুল তুলে কলাম লিখতে পেরেছিলেন। বিএনপি সরকারের সময়ে হাত খুলে নির্ভয়ে লিখতে পেরেছেন। ড. ফখরুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়েও নিজের চিন্তা স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পেরেছেন।
আমার প্রত্যাশা ছিল, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যখন মব সন্ত্রাসে পুরো দেশ ও সমাজ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল, জীবিত মানুষের পাশাপাশি মৃত ব্যক্তির কবরও অরক্ষিত হয়ে পড়ল, সে সময় মতিউর রহমান লিখবেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা, অর্বাচীনদের সামলান’। কিন্তু মতিউর রহমানের কোনো লেখা পাইনি। প্রথম আলোতে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ইনিয়ে-বিনিয়ে সমালোচনা করে দু-একজন কলামিস্ট লিখেছেন বটে, কিন্তু সেগুলো সম্পাদক মতিউর রহমানের মতো সরকারপ্রধানের চোখে চোখ রেখে লেখা নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একদল মানুষ প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে গরু জবাই করে ‘জিয়াফত’ উৎসব পালনের নামে নোংরামির চূড়ান্ত করলেন, তখন ভাবলাম, এবার মতিউর রহমান সাহসের সঙ্গে কলম ধরবেন। তিনি কলম ধরেননি। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর একদল ঘৃণ্য সন্ত্রাসী যখন প্রথম আলো-ডেইলি স্টার কার্যালয়ে পৈশাচিক উল্লাসে আগুন দিল, তখন ভেবেছিলাম, এবার মতিউর রহমানের কলম আবারও সেই ১৯৯৯ সালের কলামের মতো বারুদ হয়ে জ্বলে উঠবে। কিন্তু মতিউর রহমান কোনো কলাম লেখেননি। অবশ্য দু-একটি সাক্ষাৎকারে ও একটি ফোরামের বক্তৃতায় মতিউর রহমান সেই হামলার তীব্র নিন্দা করেছেন, কিন্তু ক্ষুরধার কলমে কোনো লেখা লেখেননি। কেন লেখেননি, তিনি কি ভয় পেয়েছিলেন?
অবশ্যই মতিউর রহমানের ভয় পাওয়া অমূলক নয়। বাংলাদেশে এর আগে বুদ্ধির বয়সে এরশাদ সরকারের পতন দেখেছি, ১৯৯৪ সাল থেকে তৎকালীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর সম্মিলিত আন্দোলন দেখেছি, ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচন-পরবর্তী অরাজকতা দেখেছি, ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের পর অরাজকতা দেখেছি, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতাও দেখেছি। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যে ভয়ংকর অরাজকতা, সন্ত্রাস, হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংস দেখেছি, আমার দেখা ইতিহাসে তার তুলনা নেই। এরশাদ সরকারের পতনের পর থেকে বারবার সরকার পরিবর্তনের পরও এভাবে সংবাদমাধ্যম ও টেলিভিশন চ্যানেলের অফিসে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, দখল ও অগ্নিসংযোগ দেখিনি। এভাবে কয়েকশ সাংবাদিককে রাতারাতি চাকরিচ্যুত হতে দেখিনি।
সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করার অভিযোগে, পেশাগত দায়িত্ব পালনে অফিসের অ্যাসাইনমেন্টের অংশ হিসেবে প্যাকেজ রিপোর্ট করার কারণে এভাবে সাংবাদিকদের ‘গায়েবি’ হত্যা মামলার আসামি হয়ে বছরের পর বছর জেলে থাকতেও দেখিনি। ‘গায়েবি’ এ জন্য বললাম যে, এসব হত্যা মামলার বাদীরা আসামিদের চেনেন না। এ ধরনের হত্যা মামলা দেশের ইতিহাসে তো নয়ই, বিশ্বের ইতিহাসেও সম্ভবত বিরল। টকশোতে সমালোচনা করার অপরাধে সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে গ্রেপ্তার এবং সেমিনার থেকে মঞ্জুরুল আলম পান্নাকে প্রথমে মব সন্ত্রাসী পাঠিয়ে লাঞ্ছিত করে, পরে পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তারের ঘটনাও বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে কলঙ্কিত অধ্যায় হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশে এর আগে কোনো পরিস্থিতিতেই প্রথম আলো-ডেইলি স্টার অফিসের সামনে ভীতিকর ‘জিয়াফত’ কর্মসূচি কিংবা অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেনি। সম্পাদক মতিউর রহমানও নিশ্চিতভাবে চোখের সামনে এই ভয়ংকর বীভৎসতা ও তাণ্ডব এর আগে দেখেননি। যে কারণে তাঁর পক্ষে ভীত হওয়া অমূলক কিছু নয়। আমরা জানি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুরো সময় প্রথম আলো সরকারের রোষানলে ছিল। সে সময় সম্পাদকের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক মামলা হয়েছে, তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা আর তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা তীব্র ভাষায় প্রথম আলো সম্পাদককে কটাক্ষ করেছেন। কিন্তু প্রথম আলো অফিসে কেউ হামলা করেনি, প্রথম আলো সম্পাদককেও একদিনের জন্য জেলে যেতে হয়নি, সরকারের চাপে কোনো সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করতে হয়নি।
বরং যখন রোজিনা ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তখন পেশাদার সাংবাদিকেরা রাজপথে নেমেছেন, সরকারের শিক্ষা উপমন্ত্রীকে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে, কিন্তু প্রতিবাদী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে গণহারে মামলা দেওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি, মব পাঠিয়ে হামলার ঘটনাও ঘটেনি। সাংবাদিকদের ধারাবাহিক প্রবল আন্দোলনের মুখে সরকার রোজিনা ইসলামকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি ২০২২ সালের অক্টোবরে ডিবি পুলিশের প্রতিবেদনে রোজিনা ইসলামকে নির্দোষ উল্লেখ করে ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে; অতএব সরকার তদন্ত প্রভাবিত করেনি বলেই ধরে নেওয়া যায়। পুলিশের ফাইনাল রিপোর্টের পরও রোজিনার বিরুদ্ধে গায়ের জোরে মিথ্যা মামলা বহাল রেখেছে আমলাতন্ত্র। যে আমলাতন্ত্র সে সময় নিজেদের তদন্ত রিপোর্টে কুড়িগ্রামে মধ্যরাতে (২০২০ সালের ১৩ মার্চ) ভয়াবহ সাংবাদিক নির্যাতন এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত হওয়ার পরও সেই চারজনকে—পারভীন সুলতানা, নাজিম উদ্দিন, এস এম রাহাতুল ইসলাম ও রিন্টু বিকাশ চাকমাকে—শাস্তির আওতায় আনতে দেয়নি।
এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সরকারি আমলাতন্ত্র, বিশেষত প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা চরম বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছিলেন। এমনকি ইউএনও সাহেবরা দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘থাপ্পড় মারার’ উৎসবে মেতে উঠেছিলেন, আর থাপ্পড়ের শিকার বেশির ভাগই ছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী! আওয়ামী লীগ সরকার সাজানো নির্বাচন আয়োজন করতে গিয়ে আমলাতন্ত্রের অরাজকতা উসকে দিয়েছিল, যে অরাজকতা আওয়ামী লীগ সরকার তো বটেই, রাজনৈতিক দল হিসেবেও আওয়ামী লীগকে ক্রমাগত জনবিচ্ছিন্ন করেছে। আমরা আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যায়ের অবশ্যই সমালোচনা করব, সেই সঙ্গে পেশাগত দায় থেকে সে সময়ের নিখাদ বাস্তবতাকেও তুলে ধরা জরুরি। বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের পেশাদার সাংবাদিকেরা তখনো সাহস নিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরতে পেরেছিলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজপথেও নামতে পেরেছিলেন।
আমার দেখা ইতিহাসে ড. ইউনূস সরকারের আমলে মতিউর রহমানের কলম শুধু থেমে গিয়েছিল তা-ই নয়, বরং প্রথম আলোর ভূমিকা দাঁড়িয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের মুখপত্রের। যে কারণে ২০০১ সালে ঢাকায় প্রথম বাসা নেওয়ার পর ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে প্রথমবারের মতো হকারকে বললাম, ‘প্রথম আলো আর দেবেন না’। কারণ অক্টোবর মাসের শুরুতে (৭ ও ৮ অক্টোবর) মতিউর রহমানের নামে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার যে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছিল, সেটি পড়ার পর আমাকে সিদ্ধান্ত নিতেই হলো, একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে সরকারের মুখপত্র পত্রিকা বাসায় রাখার কোনো দরকার নেই। অতএব দেশের শীর্ষ সংবাদমাধ্যম প্রথম আলোর চেহারা দেখলেই বোঝা যায়, ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার চেহারা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল!
সেই চরম প্রতিকূল পরিবেশেও বুক সোজা করে দাঁড়িয়ে পেশাদারিত্বের পরিচয় আমরা দেখেছি। ‘নিউ এজ’ সম্পাদক নুরুল কবীরও অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। আমার কাছে সেই সাক্ষাৎকার আজীবন আদর্শ হয়ে থাকবে। প্রথম আলো-ডেইলি স্টার কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার পর নুরুল কবীরকে ছুটে যেতে দেখেছি। সবচেয়ে ভালো লেগেছে, হামলাকারী মব সন্ত্রাসীদের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার পরও নুরুল কবীর দৃঢ় ছিলেন এবং সত্য উচ্চারণ করেছেন। আমার বিবেচনায়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশে দুটি সংবাদমাধ্যম সাংবাদিকতায় সত্যিকারের পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে। একটি ‘নিউ এজ’ এবং অপরটি ‘বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম’। ঝুঁকি, ভয়, সবকিছু উপেক্ষা করে এ দুটি সংবাদমাধ্যমই বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও কলাম প্রকাশে অবিচল থেকেছে।
বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোরের সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী গত ৩ অক্টোবর লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তাঁর মৃত্যুর খবরে দেশের গণমাধ্যমে শোকের ছায়া নেমে আসে। তৌফিক ইমরোজ খালিদী ঈর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। শুধু পেশাদার সাংবাদিক হিসেবেই নিজের অসাধারণত্ব প্রমাণ করেননি, নিজের যোগ্যতা ও মেধায় সাংবাদিকতার ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান খুলেছেন, বাংলাদেশে অনলাইন সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠার পথিকৃৎ হয়েছেন। অসংখ্য সাংবাদিককে চাকরি দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় তাঁর রুচিশীল, দৃঢ় নেতৃত্ব প্রশংসিত হয়েছে। তৌফিক ইমরোজ খালিদী শ্রদ্ধাভাজন হিসেবেই বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় অমর হয়ে থাকবেন।
কিন্তু বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় ঈর্ষাকাতর একটি শ্রেণি আছে। এই পেশায় যাঁর যোগ্যতা যত কম, তিনি তত বেশি হিংসুটে মনোভাবের। তাদের স্বভাব হচ্ছে যোগ্যতর ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভুল তথ্য দিয়ে নেতিবাচক সমালোচনার মাধ্যমে নিজেকে হাস্যকরভাবে জাহির করার চেষ্টা। তৌফিক ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদের পর সাংবাদিক মহলে যখন শোকের ছায়া, তখন সেই হিংসুটের দলের কেউ কেউ বাংলা-ইংরেজিতে পোস্ট দিয়ে তাদের ভাষায় তাঁকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ প্রমাণের অতি দুর্বল চেষ্টা করেছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কেউ সরকারের কোনো কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করলেই ‘জামায়াত-শিবির’ ট্যাগ দিয়ে সেই সমালোচনা নাকচ করার চেষ্টা করা হতো। একইভাবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যাঁরা জুলাই অভ্যুত্থানের সুবিধাভোগী গোষ্ঠী হিসেবে হঠাৎ আবির্ভূত হয়েছিলেন, তাঁরা এখনো কথায় কথায় যে কাউকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ ট্যাগ দিয়ে দেন। বিশেষ করে যাঁরা একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলেন, যাঁরা সুস্থ চিন্তা ও রুচিশীলতার পক্ষে কথা বলেন, মানবাধিকার রক্ষার পক্ষে কথা বলেন, যাঁরা নারীর যৌনাঙ্গ ছিঁড়ে ফেলার মতো রুচিহীন স্লোগানের সমালোচনা করেন, জুলাই আন্দোলনের সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর হঠাৎ বিপুল ধনী হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাঁদেরই ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে।
অথচ সাংবাদিক নামধারী যাঁরা এই ট্যাগ দিচ্ছেন, তাঁরা আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরে সাংবাদিক নির্যাতনের একটি ঘটনারও প্রতিবাদ করেননি, চরম বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে কথা বলেননি। সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে কভিড-১৯ মহামারির নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দিনের পর দিন যখন আমরা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ও প্রেসক্লাবের সামনে আন্দোলনে থেকেছি, তখন আজকের এই জুলাই আন্দোলনের সুবিধাভোগী সাংবাদিক নামধারীদের একজনকেও এক মুহূর্তের জন্য রাজপথে পেশাদার সাংবাদিকদের পাশে দেখিনি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো পোস্টও দিতে দেখিনি। বরং তাঁরা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং দেশের সাপ্তাহিক কিংবা দৈনিকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে চাকরি করেছেন, নানা প্রতিষ্ঠানে কনসালট্যান্সি করেছেন, বিজ্ঞাপনী সংস্থা খুলে সর্বোচ্চ সুবিধা নিয়ে ব্যবসা করেছেন, উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে থেকেছেন আর আরাম-আয়েশে দিন কাটিয়েছেন। আবার পটপরিবর্তনের পর এঁরাই চরম সুবিধাভোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়ে সাংবাদিকতার তথাকথিত ‘ঠিকাদার’ আর ‘বিবেকের পাহারাদার’ সেজেছেন!
এই অর্বাচীনের দল সারা জীবনে একটি ভালো রিপোর্ট লেখেনি, একটি ভালো কলামও এদের নেই। এরা সাংবাদিকতায় কখনো নেতৃত্ব দেয়নি, কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেনি, কোনো সাংবাদিককে চাকরি দেয়নি, কখনো বিপন্ন সাংবাদিকের পাশে দাঁড়ায়নি, ব্যতিক্রমী কোনো উদ্যোগ নেওয়ার মতো মেধা-যোগ্যতার প্রমাণ দেখাতে পারেনি। কেউ কেউ জুলাই আন্দোলনের সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী চরিত্র হিসেবে ‘হঠাৎ সম্পাদক’ হয়েছেন। অতএব এদের একমাত্র কাজ যোগ্যতর ব্যক্তিদের অসম্মান করা, কারণ নিজেদের সম্মান পাওয়ার মতো কোনো কীর্তি নেই বলে এরা সত্যিকারের কীর্তিমানদের অসম্মান করে।
লজ্জাজনক হচ্ছে, বাংলাদেশের সাংবাদিকতা যেন দিন দিন এই অর্বাচীনদের হাতেই জিম্মি হয়ে পড়ছে। বিবেকবোধ, সম্মানবোধ, যুক্তিবোধ—এদের কিছুই নেই। এরা সাংবাদিকতার নামে টকশোতে এসে সমাজে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ায়, সত্যিকারের পেশাদার সাংবাদিকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে বক্তব্য দেয়। আর নানা কৌশলে সরকারি সুবিধা কাজে লাগিয়ে নিজেরা বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার উপায় খুঁজতে থাকে। এদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলাও যেন এখন ভয়ের। আগে সরকার সাংবাদিকতায় ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করত। গত দুই বছর ধরে সাংবাদিকতায় ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করছে সাংবাদিক নামধারী এই অর্বাচীনরা। সাংবাদিক নামধারী চাটুকার আগেও ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এই সুবিধাভোগী অর্বাচীনদের চাটুকারিতার কাছে আগের সব ইতিহাস ম্লান হয়ে গেছে। এদের কারণে সমাজে সাংবাদিকতার মর্যাদা চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। কারণ সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ক্রমাগত অযৌক্তিক বক্তব্য প্রচার করা হলে, পেশাদার ও শিক্ষিত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো হলে সার্বিকভাবে সাংবাদিকতা পেশাই বিতর্কিত হয়ে পড়ে। সাংবাদিকদের জীবন-জীবিকা নিয়ে আজ যে সংকট, তার মূলেও আছে এই সুবিধাভোগী অর্বাচীনরা।
একসময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা ছিল শিক্ষিত ও বিবেকবান মানুষের পেশা। সাংবাদিকেরা সমাজকে শিক্ষিত করেছেন, সমাজে অন্যায়, অবিচার, সহিংসতা ও হিংস্রতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। সেই দেশে এখন কি পেশাদার সাংবাদিকতার প্রদীপ অর্বাচীন অন্ধকারের থাবায় চিরতরে নিভে যাবে? এই অন্ধকারে আলো জ্বালাতে শ্রদ্ধেয় সম্পাদক মতিউর রহমানের কলম কি আবারও পেশাদারিত্বের আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলে উঠবে?
রাশেদ মেহেদী
সম্পাদক, ভিউজ বাংলাদেশ
মতামত দিন