কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নাইজেরিয়ার উদ্যোগ বাংলাদেশকে যা শেখাতে পারে
বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প মূলত পুঁজির গল্প নয়। এটি সামাজিক সংগঠনের গল্প। নারীশিক্ষা, টিকাদানের বিস্তার এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ— এসব ক্ষেত্র আগে তৈরি হয়েছে, এরপর এসেছে প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান। গ্রামীণ ব্যাংকের পাঁচ সদস্যের ঋণগ্রহীতা দল কিংবা ব্র্যাকের সমিতি কোনো নিছক কল্যাণমূলক ব্যবস্থা ছিল না; এগুলো ছিল উৎপাদনশীল উদ্যোগ। আর সেগুলো সফল হয়েছিল মূলত সমষ্টিগত শক্তির কারণে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বাংলাদেশ যখন তার ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণ করছে, তখন এই অভিজ্ঞতাটি মনে রাখা জরুরি। আমাদের জাতীয় অভিজ্ঞতা বলে, সামাজিক উন্নয়নের হাত ধরেই প্রবৃদ্ধি এসেছে। অথচ তরুণদের জন্য এখন যে উদ্যোগগুলো নেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর প্রায় সবই ব্যক্তিকেন্দ্রিক; একজনের জন্য একটি প্রশিক্ষণ কোর্স, একজন আবেদনকারীর জন্য একটি সহজ শর্তের ঋণ, কিংবা একেকজনকে আলাদাভাবে দেওয়া যুব অনুদান। নীরবে আমরা সেই ব্যবস্থাটিকেই দূরে সরিয়ে দিয়েছি, যা একসময় আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল। বাংলাদেশের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা অর্জন করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নিজেদের শক্তিকে নতুন করে আবিষ্কার করা। মানুষকে এমনভাবে সংগঠিত করা, যাতে প্রযুক্তি সবার জন্য সমৃদ্ধি বয়ে আনে।
দক্ষিণ-পূর্ব নাইজেরিয়ার একটি রাজ্য সেই ব্যবস্থাকেই নতুন করে গড়ে তুলছে।
উদ্যোগটির নাম ‘ওকোবি’ (ÓKÓBÌ) ‘ওয়ান কিনড্রেড, ওয়ান বিজনেস ইনিশিয়েটিভ’ বা ‘এক আত্মীয়গোষ্ঠী, এক ব্যবসা উদ্যোগ’। নাইজেরিয়ার ইমো রাজ্যে চালু হওয়া এই উদ্যোগের মূল ধারণাটি সহজ: একজন উদ্যোক্তাকে আলাদাভাবে সহায়তা না করে একটি দলকে সহায়তা করা। একটি বর্ধিত পরিবার, একটি গ্রাম কিংবা একটি শিক্ষার্থী সংগঠন একত্র হয়ে একটি ব্যবসা নির্বাচন করবে, সেটি নিবন্ধন করবে এবং সম্মিলিতভাবে মালিকানা রাখবে। কোনো উদ্যোগকে এই কর্মসূচির আওতায় আসতে হলে সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত, ব্যক্তিমালিকানার পরিবর্তে দলীয় মালিকানাধীন, মুনাফামুখী, পেশাদারভাবে পরিচালিত ও সুশাসনসম্মত হতে হবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতাও থাকতে হবে।
ইমো স্টেটের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজ্যের ২৭টি স্থানীয় সরকার এলাকায় ৪৬১টি ব্যবসা নিবন্ধিত হয়েছে এবং সক্রিয় সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৬৭৬ জনে। তবে এই পরিসংখ্যান যেহেতু কর্মসূচি বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান নিজেই প্রকাশ করেছে, তাই তা ব্যবহারে কিছুটা সতর্কতা প্রয়োজন। তা সত্ত্বেও উদ্যোগটির মডেলটি যে গুরুত্ব পেয়েছে, তার প্রমাণ মেলে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের প্রকাশনায়। পাশাপাশি নাইজেরিয়ার ব্যাংক অব ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গেও এর অংশীদারত্ব হয়েছে। নিবন্ধিত দলগুলোকে ব্যাংকটি সর্বোচ্চ ৫০ লাখ নাইরা পর্যন্ত অনুদান দিচ্ছে।
এই উদ্যোগের একটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বাংলাদেশের যুব অনুদান কর্মসূচির পরিচিত একটি সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে। কর্মসূচিটির নিজস্ব ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক অনুদান ব্যবস্থায় কখনো কখনো সুবিধাভোগীরা স্টার্টআপের অর্থ অপব্যবহার বা ভুলভাবে পরিচালনা করতে পারেন। দলীয় মালিকানা সেই ঝুঁকি কমায়, কারণ প্রত্যেক সদস্য ব্যবসাটির সাফল্যের সঙ্গে নিজের স্বার্থকে যুক্ত দেখতে পান। একজনের হাতে থাকা অর্থ একজনই হারিয়ে ফেলতে পারেন; কিন্তু পাঁচজনের হাতে থাকা অর্থ পাঁচজনই নজরদারি করেন।
রুয়ান্ডাও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একই ধরনের চিন্তা কাজে লাগিয়েছে। ডিজিটাল উমুগান্ডা নামের একটি প্রতিষ্ঠান দেশটির মাসিক সামাজিক কর্মসূচি ‘উমুগান্ডা’কে মানুষ রাস্তা ও স্কুল নির্মাণ এবং ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরির কাজে ব্যবহার করেছে। এর আওতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার জন্য কিনিয়ারওয়ান্ডা ভাষার কণ্ঠস্বরের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। মজিলা ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক মাসের মধ্যেই কিনিয়ারওয়ান্ডা তাদের ‘কমন ভয়েস’ প্ল্যাটফর্মে দ্রুততম বিকাশমান ভাষাগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন হলো, এই তাগিদ এতটা জরুরি কেন?
কারণ আমরা শিল্প ইতিহাসের এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের গতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত।
প্রথম শিল্পবিপ্লব শুরু হয় ১৭০০-এর দশকের শেষ দিকে পানি ও বাষ্পশক্তির মাধ্যমে যান্ত্রিকীকরণের মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব আসে আনুমানিক ১৮৭০ সালের পর; বিদ্যুৎ, ব্যাপক উৎপাদন ও অ্যাসেম্বলি লাইন তখন শিল্পের চেহারা বদলে দেয়। তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের সূচনা ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে—কম্পিউটার, ইলেকট্রনিকস ও স্বয়ংক্রিয়তার বিস্তারের মাধ্যমে।
আর চতুর্থ শিল্পবিপ্লব—যাকে ২০১১ সালে জার্মানির একটি শিল্প-গবেষণা দল ‘ইন্ডাস্ট্রি ৪.০’ নামে অভিহিত করে। এমন সাইবার-ফিজিক্যাল ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে ভৌত ও ডিজিটাল জগৎ একীভূত হয়ে যায় এবং যন্ত্র, পণ্য ও পুরো সরবরাহব্যবস্থা বাস্তব সময়ে পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করে।
এই সময়গুলোর দিকে ধারাবাহিকভাবে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রথম শিল্পবিপ্লব থেকে দ্বিতীয়টির মধ্যে প্রায় এক শতাব্দীর ব্যবধান ছিল। দ্বিতীয় থেকে তৃতীয়টির ক্ষেত্রেও প্রায় এক শতাব্দী সময় লেগেছে। কিন্তু তৃতীয় থেকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে যেতে সময় লেগেছে মাত্র প্রায় ৪০ বছর। সাধারণ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত নতুন প্রযুক্তি আসার মধ্যকার সময় ক্রমেই কমছে। বর্তমান শিল্পবিপ্লবের ভেতরেও পরিবর্তনের উপ-চক্রগুলো আরও দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। জেনারেটিভ এআই গবেষণার কৌতূহল থেকে মাত্র তিন বছরেরও কম সময়ে নিয়মিত ব্যবসায়িক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
এই দ্রুত সংকোচনই আমাদের উদ্বিগ্ন করার মতো বিষয়। উদ্ভাবনের গতি বোঝা যায় জেমস আটারব্যাকের গবেষণা থেকে: নতুন কোনো প্রযুক্তির বিকাশের শুরুতে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রতিযোগিতা চলে। একসময় একটি ‘প্রভাবশালী নকশা’ বা ডমিন্যান্ট ডিজাইন প্রতিষ্ঠিত হলে সেই পরীক্ষার পর্ব শেষ হয় এবং প্রতিযোগিতার নিয়মগুলো অনেক বেশি কঠিন হয়ে ওঠে।
তখন যারা পিছিয়ে থাকে, তাদের জন্য প্রবেশের সুযোগও সংকুচিত হয়। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের চক্র যত দ্রুত হবে, একটি দেশ নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার সুযোগও তত কম সময়ের জন্য পাবে।
তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের সময় বাংলাদেশ নিজের জায়গা তৈরি করার জন্য কয়েক দশক সময় পেয়েছিল এবং সেই সময়টি কাজে লাগিয়েছে। তুলনামূলক কম শ্রমমূল্যের সুবিধা কাজে লাগিয়ে তৈরি পোশাকশিল্প গড়ে উঠেছে, পরে একই সুবিধার ওপর ভিত্তি করে বিকশিত হয়েছে ফ্রিল্যান্সিং খাত। কিন্তু এবার বাংলাদেশের হাতে কয়েক দশক সময় নেই।
তবে একই যুক্তির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও রয়েছে। প্রযুক্তি নতুনত্বের সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু মূল্য কোথায় সৃষ্টি হবে, তা প্রযুক্তি নিজে নির্ধারণ করে না।
বিপুলসংখ্যক জিপিইউ কিনলেই সমস্যার সমাধান হবে না। একটি প্রযুক্তিকে ঘিরে একটি সমাজ কীভাবে নিজেকে সংগঠিত করে, তার ওপরই প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে। আর সেখানেই আমরা আবার মূল প্রশ্নে ফিরে আসি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ছিল ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। একটি সংবাদপত্র এই পরিস্থিতিকে শ্রমবাজারের একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছে, সাময়িক সমস্যা হিসেবে নয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের একটি আপাত সাফল্যও রয়েছে। অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে ‘দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস’ জানিয়েছে, অনলাইন শ্রম সরবরাহে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ; বাজারের প্রায় ১৬ শতাংশ অংশ বাংলাদেশের দখলে। দেশে আইটি ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা আনুমানিক ৬ লাখ ৫০ হাজার।
কিন্তু একটু গভীরে গেলে চিত্রটি অস্বস্তিকর। পেওনিয়ারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে একজন বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারের গড় আয় ছিল মাসে ৫০০ থেকে ৭০০ ডলারের মধ্যে। আবার ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৪৮ শতাংশ ফ্রিল্যান্সার মাসে ২০৮ ডলারের কম আয় করেন। তাদের একটি বড় অংশ এখনো সাধারণ ডেটা এন্ট্রির মতো স্বল্পদক্ষতার কাজে যুক্ত। আর ঠিক এই ধরনের কাজই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সবচেয়ে দ্রুত স্বয়ংক্রিয় করে ফেলছে।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের আইটি রপ্তানি ৫ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল আইসিটি বিভাগ। কিন্তু খাতটির রপ্তানি আয় হয়েছে ৭২৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার। দক্ষতার ঘাটতি বা দক্ষতার সঙ্গে বাজারের চাহিদার অসামঞ্জস্যকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, বিপুলসংখ্যক বিচ্ছিন্ন তরুণ এমন একটি বাজারে নিজেদের সস্তা শ্রমঘণ্টা বিক্রি করছেন, যে বাজার খুব দ্রুত সেই শ্রমঘণ্টা কেনা বন্ধ করতে প্রস্তুত হচ্ছে।
এখানে সমস্যা শুধু দক্ষতার নয়; বিচ্ছিন্নতাও একটি বড় সমস্যা। এই ধারণাকে বলা যেতে পারে, ‘এক সমিতি, এক ব্যবসা’। অর্থাৎ, একটি দল, একটি ব্যবসা। নাইজেরিয়ার কাঠামো অনুসরণ করে বাংলাদেশে এর তিনটি স্তর তৈরি করা যেতে পারে।
প্রথমত, আইসিটি বিভাগের আইডিয়া প্রকল্প এবং একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক মিলে প্রতিটি নিবন্ধিত দলের জন্য ব্যক্তিপ্রতি নয়, দলপ্রতি ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রাথমিক অনুদান দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরামর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারে—পাঠ্যক্রম, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) এবং ফ্রিল্যান্সার সংগঠনগুলো বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীরাই হবে ব্যবসার মালিক। প্রতিষ্ঠানটি সমবায় বা অংশীদারি ব্যবসা হিসেবে নিবন্ধিত হবে, নির্বাচিত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হবে এবং লিখিত মুনাফা-বণ্টন ব্যবস্থা থাকবে, যা শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পরও কার্যকর থাকবে।
ইমো স্টেট ইতিমধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য এমন একটি মডেল তৈরি করেছে। তাদের ‘ওকোবি স্টুডেন্টস ক্লাব’ তিনটি ধাপের একটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে।
শেষ ধাপে শিক্ষার্থীরা দল গঠন করে, ব্যবসার প্রস্তাব দেয়, পরীক্ষামূলকভাবে তা পরিচালনা করে এবং একটি কার্যকর ব্যবসা চালু করে। উদ্যোক্তারা স্নাতক হওয়ার পরও ব্যবসাগুলো চালু থাকে, ফলে পরবর্তী ব্যাচের শিক্ষার্থীরা আগের ব্যাচের কাছ থেকে শিখতে পারে।
কিন্তু এই দলগুলো কী বিক্রি করবে?
এর সবচেয়ে শিক্ষণীয় উদাহরণ পাওয়া যায় ভারতে। কারিয়া (Karya) নামের একটি সামাজিক উদ্যোগ, যার সূত্রপাত মাইক্রোসফট রিসার্চের ভেতরে, গ্রামীণ কর্মীদের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রশিক্ষণ-উপাত্ত তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটি ঘণ্টায় প্রায় ৫ ডলার পারিশ্রমিক দেয়—যা স্থানীয় ন্যূনতম মজুরির প্রায় ২০ গুণ। তৈরি করা উপাত্ত পুনরায় বিক্রি হলে কর্মীদের রয়্যালটিও দেওয়া হয়।
কারিয়ার প্রতিষ্ঠাতা মানু চোপড়া প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘আমরা যদি দক্ষতা শেখানোর ধাপটিই এড়িয়ে যেতে পারি?’ অর্থাৎ মানুষকে নতুন কোনো দক্ষতা শেখানোর পরিবর্তে তার আগে থেকেই থাকা একটি দক্ষতার জন্য অর্থ দেওয়া যায় কি না—যেমন তার নিজের ভাষাজ্ঞান।
কারিয়া ইতিমধ্যে ২৪টি রাজ্যের ৩৫ হাজারের বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্ল্যাটফর্মের সোর্স কোড উন্মুক্ত রেখেছে, যাতে অন্যরাও এই মডেল নিজেদের দেশে প্রয়োগ করতে পারে।
বাংলা ভাষার প্রায় ৩০ কোটি বক্তা রয়েছে এবং এর এক ডজনেরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক উপভাষা আছে। কিন্তু এই ভাষাগুলোর অধিকাংশই এখনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রশিক্ষণ-উপাত্তে যথেষ্ট প্রতিনিধিত্ব পায় না।
সিলেটের একদল শিক্ষার্থী সিলেটি ভাষায় কণ্ঠস্বরের তথ্য সংগ্রহ করলে সেটি কোনো দাতব্য কাজ হবে না। বরং তারা এমন একটি রপ্তানিযোগ্য পণ্য তৈরি করবে, যার উৎস কোনো ব্যক্তির একক দক্ষতা নয়, বরং একটি সমাজের সম্মিলিত সম্পদ—ভাষা।
ভাষার বাইরেও সম্ভাবনার ক্ষেত্র কম নয়। স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার জন্য স্বয়ংক্রিয় সেবা, বাংলা ভাষাভিত্তিক শিক্ষাসহায়ক এজেন্ট, ছবি দেখে ফসলের রোগ শনাক্তকরণ, কিংবা পোশাক কারখানার উৎপাদন লাইনে ত্রুটি শনাক্তকরণের মতো নানা ক্ষেত্রে এমন দলভিত্তিক উদ্যোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি ২০২৬–২০৩০-এর খসড়া নিয়ে সম্প্রতি জনপরামর্শ শেষ হয়েছে। তাই একটি বাস্তবায়ন কাঠামো যুক্ত করার এটাই উপযুক্ত সময়, কারণ বাস্তবায়নের ব্যবস্থা ছাড়া একটি নীতি শেষ পর্যন্ত কেবল একটি নথিতেই পরিণত হয়।
তবে ঝুঁকির বিষয়টিও স্বীকার করতে হবে। ‘পলিসি ম্যাগাজিন’ উল্লেখ করেছে, ২০১৯ ও ২০২০ সালে তৈরি বাংলাদেশের জাতীয় এআই কৌশলে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ছিল, যার খুব সামান্য অংশই বাস্তবে রূপ পেয়েছে। অবকাঠামোগত সুবিধাও এখনো অসম। বর্তমান নীতির খসড়াতেও বলা হয়েছে, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ৩৮ শতাংশেরও কম মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। তাই শুরুতেই গ্রামে না গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শহর ও জেলা পর্যায়ের পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে এই উদ্যোগ শুরু করা যেতে পারে।
এসবের কোনোটির জন্যই বাংলাদেশকে নিজস্ব ফাউন্ডেশন মডেল তৈরি করতে হবে না, কিংবা কম্পিউটিং ক্ষমতার দৌড়ে বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে না।
আমাদের শুধু আবারও সেই কাজটি করতে হবে, যেটিতে ঐতিহাসিকভাবে আমরা প্রতিবেশীদের অনেকের চেয়ে ভালো করেছি—প্রথমে মানুষকে সংগঠিত করা, তারপর সেই সংগঠনের ওপর ভর করে প্রবৃদ্ধি তৈরি করা।
পার্থক্য শুধু একটাই—আগের তিনটি শিল্পবিপ্লবের তুলনায় এবার সময়ের কাঁটা অনেক দ্রুত চলছে।
আকম ববি (এফসিসিএ) একজন ফেলো চার্টার্ড সার্টিফায়েড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৌশল ও উদ্ভাবন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা, ক্যামব্রিজ জাজ বিজনেস স্কুল থেকে সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম এবং অক্সফোর্ড ব্রুকস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাপ্লায়েড অ্যাকাউন্টিং বিষয়ে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি বর্তমানে একজন অর্থ পরিচালক। পাশাপাশি তিনি এসিএসিএ গ্লোবাল ফোরাম ফর এসএমইস-এর সদস্য, একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও ট্রাস্টি এবং অর্থ ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ বিষয়ে বক্তা হিসেবে কাজ করছেন।
মতামত দিন