টিকটক-ফেসবুকে অস্ত্রের মহড়া, তারপর খুন: কিশোর গ্যাংয়ের নতুন রূপে বাড়ছে উদ্বেগ
দিনে গড়ে দশের বেশি হত্যা মামলা, প্রতিদিন প্রায় ৬০টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দল গঠন, প্রচার ও ভীতি ছড়ানোর হাতিয়ার বানাচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী চক্র।
চট্টগ্রাম নগরের খুলশীর ওয়্যারলেস কলোনি। ১৪ থেকে ১৫ বছর বয়সী একদল কিশোর সড়কে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে ভিডিও করে টিকটকে ছেড়েছিল; নিজেদের পরিচয় দিয়েছিল 'সেভেন স্টার' গ্রুপের সদস্য হিসেবে। একই এলাকায় 'ফাইভ স্টার' নামে আরেকটি গ্যাংও সক্রিয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। ভিডিওতে যে কিরিচ দেখা গিয়েছিল, সপ্তাহ না পেরোতেই সেই অস্ত্রেই খুন হয় এক কিশোর।
ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। কুমিল্লা থেকে নোয়াখালী, ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে রাজশাহী, সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের সংগঠন, প্রচার ও হুমকির প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও টিকটক। দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে যখন উদ্বেগ কাটছে না, তখনই এই প্রবণতা প্রকট হয়ে উঠছে।
ভিডিওর নামে দল গঠন, অপ্রতিম হত্যায় নির্মম প্রমাণ
কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড এই বিপদের চেহারা স্পষ্ট করেছে। জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, আইফোন ছিনিয়ে নিতে অপ্রতিমের মাথায় বাঁশ ও লাঠি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়, পরে তিনজন ফোন নিয়ে পালিয়ে যায়।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, প্রধান অভিযুক্ত ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিন একটি কিশোর গ্যাং গড়ার চেষ্টা করছিল এবং অপ্রতিমকেও দলে টানতে চেয়েছিল। টিকটক ভিডিও বানানোর কথা বলে সে অন্য কিশোরদের জড়ো করত। অভিযুক্তরা একাধিক 'গ্যাং পার্টিতে' অংশ নিয়েছে; প্রভাব জানান দিতে সেসব পার্টির ছবি ফেসবুকে পোস্ট করা হতো।
কুমিল্লার গ্যাংগুলোর মধ্যে কয়েকটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে: সদস্যরা জড়ো হয় টিকটক ভিডিও বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপের মাধ্যমে; অধিকাংশের হাতে আইফোন বা দামি মোবাইল, অনেকের আছে মোটরসাইকেল। কান্দিরপাড়, ধর্মসাগর, রানীর দিঘি, তালপুকুর ও আদালতপাড়া বিশেষভাবে সংঘাতপ্রবণ হয়ে উঠেছে। পুলিশ সুপার জানান, গত বছরের ৩০ নভেম্বর তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর আড়াই শতাধিক কিশোর গ্যাং সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছে, তবে জেলায় সক্রিয় গ্রুপগুলোর হালনাগাদ তালিকা পুলিশের কাছে নেই।
অপ্রতিম হত্যার পর জেলাজুড়ে অভিযান জোরদার হয়। ১৮টি থানার পুলিশ একযোগে অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে আটক করে। তবে অভিযানে আটক কয়েকজনের থানা থেকে পালিয়ে স্লোগান দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে, আর দেয়ালে দেয়ালে গ্যাংয়ের নাম লেখা থামেনি।
রিল বানিয়ে আতঙ্ক, অনলাইন আইডিতে 'ব্র্যান্ডিং'
নোয়াখালীর হাতিয়ায় ২৬ সেপ্টেম্বর ভোরে তমরদ্দি ইউনিয়নের বেজুগালিয়া গ্রাম থেকে একটি গ্যাংয়ের প্রধানসহ তিনজনকে আটক করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, ওসামার নেতৃত্বে দলটি দীর্ঘদিন অনলাইনে কিশোরদের সংগঠিত করছিল এবং 'ওএসটি' নামের একটি আইডি থেকে দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন করে রিল বানিয়ে ফেসবুক ও টিকটকে ছড়াত। হাতিয়া থানার ওসি মো. কবির হোসেন জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে দলনেতাসহ গ্রেপ্তার করা হয়।
রাজধানীতে চিত্র আরও সংগঠিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা নামের কিশোর গ্যাংয়ের সশস্ত্র মহড়ার ভিডিও ছড়াচ্ছে, যেখানে শতাধিক তরুণ রামদা, চাপাতি, সামুরাইসহ অস্ত্র হাতে মিছিল করছে। ভিডিওগুলো ছড়ানো হচ্ছে সাংকেতিক নম্বরযুক্ত আইডি এবং 'মাস্টারমাইন্ড মোহাম্মদপুর'-এর মতো নামের পেজ থেকে। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, দক্ষিণখানে 'বিগ বস', 'ইয়াংস্টার গ্রুপ', 'ব্লাড বয়েজ' এবং উত্তরা পূর্ব থানা এলাকায় আরও কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয়; এদের নিয়ন্ত্রণ করছে 'কিলার' ও 'শুটার' উপাধিধারী কয়েকজন শীর্ষ অপরাধী। রাজশাহীতেও নবম শ্রেণির এক ছাত্রকে পথ আটকে মারধর ও হুমকির ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর মহানগর পুলিশ ব্যবস্থা নেয়।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ
কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে 'বড় ভাই' ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ নতুন নয়। কুমিল্লায় আলোচিত গ্যাংনেতা ২৫ বছর বয়সী ইমরান হোসেন ওরফে রতনকে যুবদল ও ছাত্রদলের মিছিলে দেখা যাওয়া নিয়ে বিতর্কের মধ্যে মহানগর ছাত্রদলের এক সহসভাপতির সঙ্গে তার ফোনালাপের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। সদর দক্ষিণে সক্রিয় আরেকটি গ্রুপকে দলনেতার এক আত্মীয় পেছন থেকে মদদ দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সার্বিক চিত্র: খুন, নির্যাতন, গণপিটুনি
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মার্চে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি, মে মাসে ৩১০টি এবং জুনে ৩২৬টি হত্যা মামলা হয়েছে।
সরকারের পদক্ষেপ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, কিশোর গ্যাংগুলো নিজেদের নামে যেসব ফেসবুক পেজ, গোপন গ্রুপ ও টিকটক আইডি চালায়, ডিএমপির সাইবার ইউনিট সেগুলো সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখছে। মে মাস থেকে অপরাধবিরোধী অভিযানে ১৮ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শিগগির বড় পরিসরে বিশেষ যৌথ অভিযান শুরু হবে।
শুধু অভিযানে সমাধান নয়
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ধরপাকড়ে সাময়িক স্বস্তি এলেও মুচলেকায় ছাড়া পাওয়া কিশোরেরা দ্রুত আগের দলে ফিরছে। কুমিল্লায় এক অভিযানে গ্রেপ্তার ৫৬ জনের মধ্যে ৩২ জনকেই মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পারিবারিক কাঠামোর ভাঙন, বিচ্ছেদ কিংবা মা-বাবার অনুপস্থিতিতে বেড়ে ওঠা কিশোরদের গ্যাংয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত সহিংসতায় গড়ায়।
— ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ
বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সশস্ত্র মহড়ার কনটেন্ট দ্রুত সরানো, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনা, স্কুলভিত্তিক কাউন্সেলিং এবং শিশু আইন অনুযায়ী সংশোধনমূলক ব্যবস্থা জোরদার না হলে অনলাইনের 'তারকাখ্যাতি'র লোভে অস্ত্র হাতে নামা কিশোরের সংশোধন সম্ভব নয়।
মতামত দিন