যুদ্ধের উত্তাপ জ্বালানি বাজারে, ঝুঁকিতে বিশ্ব অর্থনীতি
হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে শুধু জ্বালানি বাজারই নয়, ঝুঁকিতে পড়ছে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি। বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, তেলের দাম বাড়তে থাকলে বিশ্বজুড়ে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর।
সোমবার এশিয়ার বাজারে কেনাবেচা শুরু হওয়ার পরপরই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং পরে তা বেড়ে প্রায় ১১৫ ডলারে পৌঁছায়। জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিষয়ক ওয়েবসাইট অয়েলপ্রাইস ডট কমের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক উত্তেজনার জেরে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ও ডব্লিউটিআই উভয় সূচকেই উল্লেখযোগ্য উত্থান দেখা গেছে। এশিয়ার বাজারে কেনাবেচা শুরু হওয়ার পরপরই তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছিলেন যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ১০০ ডলার অতিক্রম করতে পারে। বাস্তবে দেখা গেল, সপ্তাহের প্রথম দিনেই সেই আশঙ্কা সত্যি হলো।
সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা জ্বালানি বাজারে নতুন করে অবস্থান নিতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর ফলে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা বাড়ছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্ববাজারে যে বিপুল পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হয়, তার একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। যদি এই পথ দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও দ্রুত বাড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপ, এশিয়া এবং আমেরিকার জ্বালানি সরবরাহেও বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।
সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা তাদের বিশ্লেষণে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা প্রায়ই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ইরান যদি হরমুজ প্রণালি ব্যবহার সীমিত করার হুমকি বাস্তবায়ন করে, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা যদি আরও বাড়তে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তার মতে, দুই দেশ যদি আক্রমণাত্মক নীতি অব্যাহত রাখে এবং সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে, তবে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে এবং এর ধাক্কা সামাল দিতে হবে পুরো বিশ্বকেই।’ ইরানের এই সতর্কবার্তার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও।
জ্বালানি বাজারের বিশ্লেষকেরা বলছেন, তেলের দাম বেড়ে গেলে এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না। তেল হচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। পরিবহন, উৎপাদন, বিদ্যুৎ এবং শিল্পখাতে এর ব্যবহার ব্যাপক। ফলে তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায় এবং সেই প্রভাব পড়ে পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন খরচে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। খাদ্যপণ্য, কৃষি উৎপাদন, সার, প্লাস্টিকজাত পণ্য থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় জ্বালানি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে এসব পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, তেলের দাম বৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে আমদানি নির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। খাদ্যপণ্য, পরিবহন ভাড়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
ইতিমধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এশিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি প্রধান শেয়ারবাজারে সূচকের বড় ধরনের পতন হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে গিয়ে নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা। তাদের মতে, করোনা মহামারির পর বিশ্ব অর্থনীতি যখন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন নতুন করে জ্বালানি সংকট দেখা দিলে তা বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে তেলের দাম বাড়তে বাড়তে এমন জায়গায় যেতে পারে যা যা অনেক দেশেরই ক্রয়শীমার বাইরে চলে যেতে পারে। যার প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারসহ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে