Views Bangladesh Logo

আর্ন্তজাতিক নারী দিবস

বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা

Parvez  Babul

পারভেজ বাবুল

বাংলাদেশে নারী ও কিশোরীদের প্রতি সহিংসতা একটি গভীর সামাজিক উদ্বেগের বিষয়। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে সহিংসতার শিকার হন, যার মধ্যে অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতা ও যৌন সহিংসতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন জরিপ ও প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী তাদের জীবদ্দশায় অন্তত এক ধরনের অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।

অনেক নারী শারীরিক, মানসিক ও নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের মাধ্যমে সহিংসতার শিকার হন। প্রায় ৩০ শতাংশ নারী জীবনের কোনো এক সময় যৌন সহিংসতার সম্মুখীন হন। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে ৪৮১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৩৪৫ জন ভুক্তভোগী শিশু। এই সংখ্যা ২০২৪ সালে সারা বছরে রিপোর্ট হওয়া ৫১৬টি ঘটনার প্রায় সমান।

একই সময়ে মোট প্রায় ১,৫৫৫ জন নারী ও মেয়ে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে। বিশেষভাবে দুই থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরীরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বাল্যবিবাহ, যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনায় তাদের ভুক্তভোগীর হার তুলনামূলকভাবে বেশি। রিপোর্ট করা ধর্ষণের মধ্যে ১০৬টি ছিল গণধর্ষণ, এবং ১৭ জন ভুক্তভোগীকে আক্রমণের পর হত্যা করা হয়। এছাড়া ৩২০ জন নারী ও মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে, ৫১টি যৌন হয়রানি এবং ৩৪টি স্টাকিংয়ের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

নারী ও কিশোরীদের প্রতি সহিংসতা ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে এবং জনপরিসরেও এর উপস্থিতি বাড়ছে। যদিও নারীর অধিকার রক্ষায় বিভিন্ন আইন রয়েছে, বাস্তবে সেগুলোর প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে সীমিত।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স প্রায় ১৫ বছর এবং তাদের ৬৪ শতাংশ বিয়ের সময় শিক্ষার্থী ছিল। প্রায় ২.২৬ শতাংশ বাল্যবিবাহ ১২ বছর বয়সের আগেই ঘটে। ৫৫ শতাংশ বিবাহিত নারী জীবনে কখনো না কখনো শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং বর্তমানে বিবাহিত নারীদের ৮০ শতাংশের বেশি অন্তত একবার সঙ্গীর সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন।

সহিংসতার অভিজ্ঞতা অঞ্চল ও আর্থসামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে ভিন্ন হয়। দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারী নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। গার্হস্থ্য সহিংসতা সবচেয়ে সাধারণ হলেও তা অনেক ক্ষেত্রেই রিপোর্ট হয় না, যা সচেতনতা ও রিপোর্টিং ব্যবস্থার উন্নতির প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।

গবেষণায় দেখা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত অবনতি, জলবায়ুজনিত অভিবাসন এবং কোভিড-১৯ মহামারী বিদ্যমান লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে যৌন নিপীড়ন, পারিবারিক সহিংসতা ও যৌতুক-সংক্রান্ত নির্যাতনের ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

সহিংসতার ঝুঁকির কারণ
অন্তরঙ্গ সঙ্গী ও যৌন সহিংসতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাধারণ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে নিম্ন শিক্ষার হার, শৈশবে নির্যাতনের অভিজ্ঞতা, পারিবারিক সহিংসতা প্রত্যক্ষ করা, মাদক ও অ্যালকোহলের অপব্যবহার, সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেয় এমন সামাজিক মানসিকতা, পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো এবং লিঙ্গসমতার অভাব।

অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার ক্ষেত্রে অতীত সহিংসতার ইতিহাস, দাম্পত্য দ্বন্দ্ব, যোগাযোগের ঘাটতি এবং নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ বিশেষভাবে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে পারিবারিক সম্মান ও যৌন বিশুদ্ধতা সম্পর্কিত ধারণা, পুরুষের যৌন অধিকারের মতাদর্শ এবং দুর্বল আইনি প্রতিরোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা যায়।

স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক প্রভাব
অন্তরঙ্গ সঙ্গী ও যৌন সহিংসতা নারীর শারীরিক, মানসিক, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি গুরুতর প্রভাব ফেলে। এতে তাদের সন্তানদের স্বাস্থ্য ও মানসিক বিকাশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সহিংসতার অভিজ্ঞতা নারীদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, কর্মক্ষমতা হ্রাস, আয়ের ক্ষতি এবং দৈনন্দিন জীবনে অংশগ্রহণে সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক খরচ পরিবার থেকে শুরু করে পুরো সমাজকেই বহন করতে হয়।

যেসব শিশু সহিংসতাপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তাদের মধ্যে আচরণগত সমস্যা ও মানসিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, যা পরবর্তী জীবনে সহিংসতার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি বাড়ায়।

নিরাপদ জীবনের অধিকার
নারী ও কিশোরীদের প্রতি সহিংসতা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। তাই এর প্রতিকার করতে হলে নীতিগত পরিবর্তন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ভুক্তভোগীদের জন্য সহায়তামূলক সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশ্বব্যাপী প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে একজন শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হন, যার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধী একজন অন্তরঙ্গ সঙ্গী। সহিংসতার তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অনেক সময় জীবনহানির মতো ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।

সহিংসতা নারীর সামগ্রিক সুস্থতাকে ব্যাহত করে এবং সমাজে তাদের পূর্ণ অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। এর প্রভাব পরিবার, সম্প্রদায় এবং জাতীয় উন্নয়নের ওপরও পড়ে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা কখনো কখনো নারীর মাধ্যমেও সংঘটিত হয়, যা লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতার কাঠামো ও সামাজিক মানসিকতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হলেও নারীর ক্ষমতায়নের আলোচনায় এটি গুরুত্বপূর্ণ।

নারীর সহিংসতা থেকে মুক্ত থাকার অধিকার আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চুক্তি ও ঘোষণায় স্বীকৃত। তবে বাস্তবে মাত্র প্রায় ৪০ শতাংশ নারী সহিংসতার পর কোনো ধরনের সহায়তা চান, যা সহজলভ্য ও মানসম্মত সহায়তা সেবার প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্ট করে।

প্রতিরোধের পথ
নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, উন্নয়ন অংশীদার, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শিক্ষা, নিরাপত্তা, সমতা, সম্মানজনক সম্পর্ক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর ও সাশ্রয়ী পন্থা, যাতে কোনো নারী পিছিয়ে না থাকে এবং তাদের মানবাধিকার নিশ্চিত হয়। সহিংসতার প্রকৃতি, মাত্রা ও প্রভাব সম্পর্কে গবেষণা জোরদার করাও জরুরি, যাতে কার্যকর নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়ন করা যায়।

বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনগত কাঠামো
নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে দেশে একাধিক আইন কার্যকর রয়েছে। এর মধ্যে দণ্ডবিধি (১৮৬০), যৌতুক নিষেধাজ্ঞা আইন (১৯৮০), নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (২০০০) এবং গার্হস্থ্য সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন (২০১০) উল্লেখযোগ্য।

এই আইনসমূহ শারীরিক আঘাত, যৌন নির্যাতন, হয়রানি, যৌতুক-সংক্রান্ত সহিংসতা এবং অন্যান্য নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান করে। সংবিধানের সমতার বিধানসহ এগুলো দেশে নারীর সুরক্ষার আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে।

তবে বাস্তবায়ন ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে এখনও নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাই প্রয়োজন আইনের যথাযথ প্রয়োগ, ব্যাপক প্রচার, গণসচেতনতা বৃদ্ধি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবীদের সক্ষমতা উন্নয়ন এবং সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ।

এই আলোচনায় স্পষ্ট হয় যে নারীর প্রতি সহিংসতা শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়, বরং মানবাধিকার, উন্নয়ন ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ। কার্যকর প্রতিরোধ, সহায়তা ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে একটি নিরাপদ ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলাই হতে পারে এর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।

পারভেজ বাবুল, কবি, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গবেষক।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ