Views Bangladesh Logo

কঠোর নিরাপত্তা বলয় আর দুর্নীতি বন্ধে সুপ্রিম কোর্টের নজিরবিহীন পদক্ষেপ

দেশের সার্বিক আইশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পুরো সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় তৈরী করা হয়েছে। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব ও সততা নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন থেকে চলা দুর্নীতি বন্ধে গ্রহণ করা হয়েছে 'জিরো টলারেন্স নীতি'। যার কার্যক্রম এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের এমন উদ্যোগ অতীতে আর কখনো দেখা যায়নি।


আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম শুরুর আগেই আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে সুপ্রিম কোর্টের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সলিসিটর ও অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসসহ সবগুলো সেকশন ও বেঞ্চের যেকোনো দুর্নীতি বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। যা এরইমধ্যে কার্যকর করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরো সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় তিন স্তরের নিরাপত্তা বলায় তৈরী করা হয়েছে। প্রতিটি গেটে বিপুল সংখ্যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর সদস্য মতায়েন করা রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবন, সুপ্রিম কোর্টের পুরোনো ভবন (মেইন বিল্ডিং) , এনেক্স ভবন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রবেশ দ্বারে সার্বক্ষণিক বিপুল সংখ্যাক পুলিশ রাখা হচ্ছে। তারা সন্দেহভাজন কাউকে দেখলেই জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশী করছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং সপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের প্রতিটি এজলাস কক্ষের নিরাপত্তাও জোরদার করা হয়েছে। যদিও এই অতিরিক্ত নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে আপিল বিভাগে প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে সাংবাদিকদের। যা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বিতর্কও।

যদিও রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‌‘আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের সব আদালত কক্ষে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। একারণে হয়তো আপিল বিভাগসহ হাইকোর্টের কিছু বেঞ্চে সাংবাদিকদের প্রবেশে একটু কড়াকড়ি করা হয়েছে। এটা আগামীতে থাকবে না।’

সুপ্রিম কোর্টের দুর্নীতির ব্যাপারে তিনি বলেন, ‌‘আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের সবগুলো সেকশন ও বেঞ্চে কোনো ধরণের দুর্নীতির বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তিও জারি করেছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। এসব জায়গায় কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত পরিদর্শন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আশা করছি শীঘ্রই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। যা বিগত দিনে কেউ দেখেনি।’

এদিকে, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের নিরাপত্তা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব এবং সততা নিশ্চিত করার বিষয়ে বিশেষ বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। গত ৮ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকীর সই করা বিজ্ঞপ্তিতে কোর্টের দুর্নীতি বন্ধেও বেশকিছু হুঁশিয়ারি বার্তা দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, উপর্যুক্ত বিষয়ে নির্দেশিত হয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ, দাপ্তরিক কাজের গতিশীলতা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শৃঙ্খলা, পেশাদারত্ব ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিম্নোক্ত নির্দেশনাগুলো বাধ্যতামূলক পালনের নির্দেশনা দেওয়া হলো।

ক. অফিসে উপস্থিতি ও প্রস্থান:


১. সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নির্ধারিত অফিস সময়সূচি অনুযায়ী সকাল ৯টায় কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে হবে।

২. অফিস ত্যাগের ক্ষেত্রে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া নির্ধারিত সময়ের আগে কোনও অবস্থাতেই কর্মস্থল ত্যাগ করা যাবে না।

৩. বিলম্ব উপস্থিতি এবং অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল প্রস্থান ‘অসদাচারণ’ হিসেবে গণ্য হবে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খ. নির্ধারিত ডেস্কে সার্বক্ষণিক উপস্থিতি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা:

১. সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে স্ব স্ব ডেস্কে সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকতে হবে, কোনও কাজ অনিষ্পন্ন রাখা যাবে না।

২. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। ময়লা, আবর্জনা ও খাদ্য দ্রব্যের উচ্ছিষ্ট নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলতে হবে।

গ. সুপ্রীম কোর্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা:

১. সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ (হাইকোর্ট ডিভিশন) রুলস, ১৯৭৩ (সংশোধিত ১২ নভেম্বর, ২০১২) এর চ‍্যাপ্টার-XVIA এর বিধি ৩ এর দফা ৪ অনুযায়ী কোন ব্যক্তি, তিনি বারের সদস্য বা আইনজীবী সহকারী বা আদালতের কর্মী বা অন্য কোনও ব্যক্তি আদালত প্রাঙ্গণে বা আদালত ভবনের কোনও অংশে কোনও মিছিল, স্লোগান, প্রচার, সভা বা বিক্ষোভে অংশ নিতে পারবেন না।

২. সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে বৈধ ও অবৈধ যেকোনও প্রকার অস্ত্র, মারণাস্ত্র, বিস্ফোরক ও মাদকদ্রব্য বহন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হলো।

৩. নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার স্বার্থে নির্ধারিত পার্কিং ছাড়া রাস্তা, ভবনের গেটের সামনে গাড়ি ও রিকশা পার্ক করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

ঘ. পোশাক রীতি:

১. অফিস চলাকালীন সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নির্ধারিত ফরমাল পোশাক পরতে হবে।

২. সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অফিস আইডি কার্ড সঙ্গে বহন করে তা দৃশ্যমান রাখতে হবে।

ঙ. দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সততা:

১. বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ (জিরো টলারেন্স) নীতি অবলম্বন করে।

২. সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে কোনও ধরনের আর্থিক লেনদেন বা অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

৩. কোনও কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

চ. তদারকি:

১. সংশ্লিষ্ট শাখা প্রধানরা এবং শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী রেজিস্ট্রাররা নিয়মিতভাবে হাজিরা খাতা এবং ড্রেস কোড পর্যবেক্ষণ করবেন।

২. সংশ্লিষ্ট ডেপুটি রেজিস্ট্রার কর্তৃক আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‌‘সুপ্রিম কোর্টের নিরাপত্তা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে যে নজিরবিহীন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা দেশের বিচার ব্যাবস্থাকে আরো নিরাপদ ও স্বচ্ছ করবে। তবে এ ব্যপারে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীসহ সবার সহযোগীতা প্রয়োজন হবে।’

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ