Views Bangladesh Logo

ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র ফুটবলের ক্ষতিই করল বেশি: গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ

১৯৬২ সালের বিশ্বকাপে গারিঞ্চার লাল কার্ড পাওয়ার ঘটনাটি ফুটবল ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। ব্রাজিলের এই তারকা সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে আঘাত করে মাঠ থেকে বহিষ্কৃত হন। ফিফায় তখন সরাসরি এক ম্যাচ নিষেধাজ্ঞার কোনো নিয়ম ছিল না। তাই ফাইনালে তার খেলার ভাগ্য নির্ধারণে বৈঠকে বসে ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি।

প্রচলিত কথা হলো, যে সহকারী রেফারি গারিঞ্চার ফাউল স্পষ্টভাবে দেখেছিলেন, তাকে গোপনে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে ‘চুপ’ করিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি আয়োজক দেশ চিলির প্রেসিডেন্ট নিজে ফিফাপ্রধানকে ফোন করে অনুরোধ করেন, গারিঞ্চার ওপর যেন কোনো নিষেধাজ্ঞা না আসে। টুর্নামেন্টের অন্যতম ‘বিনোদন তারকা’ গারিঞ্চাকে ফাইনালে রাখতেই এ তদবির। ফলে তিনি পার পেয়ে যান এবং কয়েক দিন পর ব্রাজিল জেতে তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ।

আজকের দিনে এমন আজগুবি ঘটনা বেশ সেকেলে মনে হতে পারে; তবে বাস্তবতা হলো, আমরা সেই পুরোনো দিন থেকে খুব বেশি দূর সরে আসিনি। বেলজিয়ামের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে কয়েক দফা ফোন করেছেন! উদ্দেশ্য—মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের উপায় খুঁজে বের করা।

গত বুধবার বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ২-০ গোলে জয়ের ম্যাচে বল দখলের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের গোড়ালিতে আঘাত করে বহিষ্কৃত হন বালোগান। ভিডিও রিভিউয়ের পর দেওয়া সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কারও কারও মতে, যুক্তরাষ্ট্র এতে অবিচারের শিকার হয়েছে। দলটির প্রধান কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনোসহ অনেকে লাল কার্ড নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন। তবে সমর্থকেরা ক্ষুব্ধ হলেও মূল স্ট্রাইকারকে ছাড়াই বেলজিয়ামের বিপক্ষে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র দল।

ঠিক এই পরিস্থিতিতে ঘটনার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেললেন ট্রাম্প—অথচ তখনো ইউএস সকার ফেডারেশনের লবিং চলছিলই। প্রেসিডেন্ট জড়িত হওয়ার পর খুব দ্রুতই বালোগানের নিষেধাজ্ঞা টুর্নামেন্ট শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত হয়ে যায়। ফিফা অবশ্য টুর্নামেন্ট শুরুর আগে নিষেধাজ্ঞায় থাকা বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে এমনটি করেছিল, যাঁদের মধ্যে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও ছিলেন। কিন্তু বিশ্বকাপ চলাকালে এমন সিদ্ধান্ত নজিরবিহীন।

এরপরের প্রতিক্রিয়া উল্লাস ও তীব্র ক্ষোভের মিশ্রণ। অনেক মার্কিন সমর্থক এবং কোচ পচেত্তিনো স্বাভাবিকভাবেই খুশি। কিন্তু বেলজিয়ামের প্রধান কোচ রুডি গার্সিয়া ক্ষোভে ফেটে পড়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি তো জানতাম না যে এপ্রিল ফুল (১লা এপ্রিলে বোকা বানানোর দিন) এখন জুলাই মাসে উদযাপন হয়!’ বেলজিয়ান ফুটবল ফেডারেশন এরই মধ্যে জানিয়েছে, ফিফার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি বিকল্প খতিয়ে দেখছে তারা।

ফিফার কাছে অবশ্য ব্যাখ্যা রয়েছে, যদিও তা তেমন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। সংস্থাটি তাদের আইনের একটি ধারার কথা বলছে, যেখানে লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের বিধান আছে। কিন্তু ট্রাম্পের কথিত ফোনকল নিয়ে সংবাদমাধ্যম যখন প্রশ্ন তুলছে, তখন ফিফার কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলার চেষ্টা করছেন—কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে তাদের সিদ্ধান্ত বদলানো সম্ভব নয়।

তবে ফিফা যে ট্রাম্পের দ্বারা প্রভাবিত হয়নি, এ কথা বিশ্বাস করতে বলাটা স্পষ্টতই হাস্যকর। এটি বিশ্বাস করতে বলার অর্থ দাঁড়ায়, ট্রাম্প কেবল নিজ যোগ্যতাতেই ফিফার ‘শান্তি পুরস্কার’ পেয়েছেন! তা ছাড়া ইনফান্তিনোর সঙ্গে ট্রাম্পের মধুর সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এ এক পারস্পরিক স্বার্থের মেলবন্ধন—ট্রাম্প পান তার পছন্দের বিষয়ে মনোযোগ, আর ইনফান্তিনো পান ফিফার উপার্জনের চাবিকাঠি।

কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট যা বুঝতে পারছেন না, অথবা পরোয়াই করেন না, তা হলো—ক্ষমতার জোরে তুলাদণ্ড নিজের দিকে ঝুঁকিয়ে তিনি মার্কিন ফুটবলের কোনো উপকার করেননি। যুক্তরাষ্ট্র দল নিজের যোগ্যতায় টুর্নামেন্টের এই পর্যায়ে এসেছে; তিনটি অসাধারণ ও একটি গড়পড়তা পারফরম্যান্সে ভর করে পা রেখেছে শেষ ষোলোয়। আর এই পুরো যাত্রায় বালোগানই ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সেরা খেলোয়াড়।

মোনাকোর এই স্ট্রাইকারকে ছাড়াও বহু ফুটবল বিশেষজ্ঞ বেলজিয়ামের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রকেই ফেভারিট মানছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র একটি অন্যায্য সুবিধা পেল—এমন ধারণা এখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এই ধারণা তাদের পরের রাউন্ডে যাওয়ার গৌরবকে কলঙ্কিত করবে; কেবল আমেরিকার ভেতরে নয়, বৈশ্বিকভাবেও। বিশ্বের চোখে ট্রাম্প এখন এমন মানুষদের প্রতীক, যারা সব সময় সবখানে বিশেষ সুবিধা প্রত্যাশা করে। মার্কিন জনগণের জন্যও এটি দুর্ভাগ্যজনক। তাদের অনেকেই এত দিন ‘যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল অনগ্রসর ও মর্যাদায় পিছিয়ে’—এমন ধারণার বিরুদ্ধে লড়ে আসছিলেন। এবারের বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলে মার্কিন ফুটবলাররাও সে ধারণা ভুল প্রমাণ করছিলেন। কিন্তু আগামী ম্যাচে তাঁরা জিতলে বিশ্ববাসী হয়তো ভাববে, ‘এ জয় ফিফার তৈরি করে দেওয়া।’

নরওয়ের প্রধান কোচ স্টেল সলবাকেনও একমত যে ওই জয়ের গায়ে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন লেগে থাকবে। ব্রাজিলের বিপক্ষে তাঁর দলের চমকজাগানো ২-১ গোলের জয়ের পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি এটি ফিফার মস্ত বড় ভুল, অত্যন্ত বাজে একটি সিদ্ধান্ত। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আমার দুঃখ হচ্ছে। কারণ তারা জিতলেও ম্যাচটির গায়ে কালো দাগ রয়ে যাবে। এটি ফুটবলের জন্য ভালো নয়।’

ট্রাম্পের এই হস্তক্ষেপ এখন পর্যন্ত সফলভাবে চলতে থাকা একটি বিশ্বকাপের সৌন্দর্যও নষ্ট করল। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে টিকিটের দাম, ভিসা জটিলতা, অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ এবং ম্যাচে অভিবাসন কর্মকর্তাদের উপস্থিতির মতো নানা বিষয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে, হচ্ছে। কেউ কেউ টুর্নামেন্ট অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার দাবিও তুলেছিলেন। কিছু আশঙ্কা শেষ পর্যন্ত সত্যও প্রমাণিত হয়, যেমন ইরান জাতীয় দলের সঙ্গে বাজে আচরণ। তবু সামগ্রিকভাবে টুর্নামেন্ট নিয়ে ইতিবাচক ধারণাই তৈরি হয়েছিল।

এর মধ্যেই ট্রাম্প নিজের ইচ্ছাপূরণে অন্যায্য, অনাকাঙ্ক্ষিত ও অযাচিত কাজটি করলেন; খাটালেন ক্ষমতার প্রভাব। হয়তো তিনি বুঝতেও পারছেন না, কত বড় অবিচার করে বসেছেন—যা শুধরানো অনেক কঠিন হবে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ