Views Bangladesh Logo

বগুড়ায় জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবের ১১ বছর

এখনও সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়েই ঝুলে আছে বিচার

Masum   Hossain

মাসুম হোসেন

বছর আগের ঘটনা। পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়িয়ে বগুড়ায় শুরু হয় জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের ভয়াবহ তাণ্ডব। অনেকটা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয় এই জেলা। তবে দুর্ভাগ্য হল, এ ঘটনার দীর্ঘ বছর অতিবাহিত হলেও এখনও সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়েই ঝুলে আছে মামলার বিচার।

২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। যা মেনে নেয়নি জামায়াত-শিবির সমর্থকরা। সাঈদীর মুক্তির দাবিতে অবস্থান নেয় দলটি। পরে একই বছরের ৩ মার্চ হরতালের ডাক দেয় জামায়াতে ইসলামী। তবে এই হরতালের পিছনে ভিন্ন ছক আঁকা হয়। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সেদিন ভোররাত থেকে প্রচার করা হয় ‘সাঈদীর মুখ চাঁদে দেখা গেছে’। সাধারণ জনগণের উদ্দেশ্যে বলা হয় সাঈদীকে রক্ষার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এরপরই শুরু হয় ধ্বংসযজ্ঞ।

সেদিন যা ঘটেছিল

মুঠোফোনের মাধ্যমে ও মসজিদে মসজিদে মাইকিং করে সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে-এমন গুজব ছড়ানো হয়। পরে সেদিন ভোর থেকেই হাজার হাজার মানুষ লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। আর তাদেরকে সামনে রেখে ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠেন জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী ও দলটি সমর্থকরা। তাদের লক্ষ্য ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতাদের অফিস-বাড়িতে হামলা চালানো। ওই সময় থানা, পুলিশ ফাঁড়ি ও বিভিন্ন সরকারি দফতরে হামলা চালিয়ে করা হয় লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ। তাদের নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এগিয়ে এলে শুরু হয় সংঘর্ষ। সেদিন বগুড়ার সব থানা এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। তা সত্ত্বেও ধ্বংসযজ্ঞ চালায় জামায়াত-শিবির।

জামায়াত-শিবিরের হামলায় আহত হন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্য। বগুড়ায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যালয়, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, রাজনৈতিক নেতাদের বাড়ি ও ব্যক্তিগত কার্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসে চালানো হয় হামলা। ভাঙচুর করা হয় বগুড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কার্যালয় ও রেলস্টেশন এলাকাতেও। জেলা জুড়ে একযোগে হামলা হলেও ওই দিন শাজাহানপুর ও নন্দীগ্রাম উপজেলায় ভয়াবহ তাণ্ডব চালানো হয়।

বগুড়ার শাজাহানপুর থানা ভবনে হামলায় আহত হন থানা পুলিশের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল আলম, কনস্টবল সাইফুল ইসলাম, বগুড়া পুলিশ লাইন্স থেকে আসা কনস্টবল মধুসূদনসহ আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য। এরই এক পর্যায়ে আত্মরক্ষার্থে গুলি চালায় পুলিশ। গুলিতে ঘটনাস্থলেই তিন নারীসহ চারজন নিহত হন। তারা হলেন- একই উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা ৫৫ বছরের আব্দুল কাফি, ডোমনপুকুর গ্রামের বাসিন্দা ৩৮ বছের মুঞ্জিলা বেগম, সাজাপুর পশ্চিমপাড়ার ৪৫ বছরের রোজিনা বেগম ও আছিয়া বেগম। ৪৫ বছরের আছিয়া বেওয়া ডোমনপুকুর গ্রামের বাসিন্দা।

ঘটনাস্থলে নিহতদের লাশ পড়ে থাকে। এসময় বিক্ষুব্ধ মানুষ থানা ভবন থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে অবস্থান নেয়। কিছুক্ষণ পর চারটি গাড়িতে করে সেনা বাহিনীর এক প্লাটুন সৈন্য আসে। পরবর্তীতে আরও এক প্লাটুন সৈন্য এসে ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয়। এ সময় নিহতদের লাশ থানা প্রাঙ্গণে সরিয়ে নেন পুলিশ সদস্যরা। পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

সেদিন গুজবে নন্দীগ্রাম উপজেলা পরিষদে হামলা চালায় কয়েক হাজার মানুষ। সেখানকার সরকারি দপ্তরগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। উপজেলা চেয়ারম্যান রেজাউল আশরাফ জিন্নাহর কার্যালয়সহ তার বাসভবনে হামলা চালিয়ে করা হয় ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ। এসব হামলার নেতৃত্বে ছিল জামায়াত-শিবির।

এ প্রসঙ্গে   জানতে চাইলে নন্দীগ্রাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা জিন্নাহ বলেন, “জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা আমার বাড়ি-ঘর ও অফিসে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, লুটপাট করেন। এতে আমার প্রায় ২৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। ওই সময় প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে সাহায্য পেয়েছিলাম।”

তিনি আরও বলেন, “হামলা ও লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মামলা করেছিলাম। মামলাটি এখন সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে।”

শাজাহানপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও থানা ভবন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় করা তিন মামলায় সাক্ষী বাদশা আলমগীর। তিনি উপজেলা যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। তার দাবি তিনি সাক্ষী দিতে নিয়মিত আদালতে উপস্থিত হন।

বাদশা আলমগীর বলেন, অনেকেই সাক্ষী দিতে আসেন না। তারা সাক্ষ্য দিতে এলে দ্রুত মামলাগুলোর বিচারকার্য শেষ হবে।

জেলা পুলিশের অপরাধ শাখা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে সাঈদীকে চাঁদে দেখার গুজবে নাশকতা- সহিংসতায় ২০টি মামলা রয়েছে। এরমধ্যে বগুড়া সদর থানায় ৮ মামলায় ২৩৫ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ৯,২০০ জনকে আসামি করা হয়। শাজাহানপুর থানায় ৪ মামলায় ১৯০ জনের নাম উল্লেখ করে ১৬ হাজার ৫২৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। গাবতলী মডেল থানায় ৪ মামলায় ২৩ জনের নামসহ অজ্ঞাত আরও ১৫ জনকে আসামি করা হয়। নন্দীগ্রাম থানায় ৪ মামলায় ৭৬৯ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ২০ হাজার ৭০০ জনকে আসামি করা হয়।

জানতে চাইলে বগুড়া জেলা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) আব্দুল মতিন বলেন, “৩ মার্চের ঘটনায় করা মামলাগুলোর চার্জ গঠন হয়েছে। বর্তমানে সেগুলো সাক্ষীর পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া কিছু মামলা শেষও হয়েছে। যা আদালতের নথিপত্র দেখে বলতে হবে। এখন নাশকতার মামলাগুলোও শেষ পর্যায়ে।”

তিনি আরও জানান, মামলাগুলোর ক্ষেত্রে সাক্ষীর উপস্থিতি পাওয়াটা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকে আদালতে আসেন না। এই কারণে মামলাগুলো ধীর গতিতে এগোচ্ছে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ