Views Bangladesh Logo

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

নতুন সরকারের সামনে অপেক্ষমাণ কঠিন চ্যালেঞ্জ

২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল সময়ের সূচনা হতে চলছে। এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল বা সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয় বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে একটি বিশেষ নির্বাচন হতে চলছে। তাই নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর তাদের কাছে জনগণের যেমন থকবে প্রত্যাশার পাহাড়, তেমনটি নতুন সরকারের সামনে অপেক্ষা করছে একাধিক কঠিন ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।


বিশেষজ্ঞদের মতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সামনে আসতে চলছে যেসব চ্যালেঞ্জ-


নির্বাচন-পরবর্তী স্থিতিশীলতা ও আইনশৃঙ্খলা:
নির্বাচনের পর সহিংসতা, প্রতিশোধমূলক মামলা ও রাজনৈতিক হয়রানি নতুন সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ উঠলে সরকার মানবাধিকার প্রশ্নে দেশে ও বিদেশে চাপের মুখে পড়ার সম্ভাবনা আছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ রাজনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে। এছাড়া নতুন সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা প্রতিহিংসার রাজনীতি নয় বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে এগোতে চায়। অন্যথায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা কঠিন হবে।


মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সংকট:
নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও চিকিৎসা ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এখন সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে জনগণের প্রত্যাশা থাকে সরকার দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণে আনবে। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, আমদানি নির্ভরতা এবং অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে মূল্যস্ফীতি কমানো সহজ কাজ নয়। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক অস্থিরতাও বাড়তে পারে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পেলে সরকারবিরোধী মনোভাব জোরদার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই নতুন সরকারকে ভর্তুকি ব্যবস্থার সংস্কার, বাজার তদারকি জোরদার এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।


অর্থনৈতিক সংকট ও কর্মসংস্থানের চাপ:
মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ডলারের বিনিময় হার, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ এবং রাজস্ব ঘাটতি নতুন সরকারের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। নির্বাচনে অংশ দেওয়া দলগুলো প্রতিশ্রুতি দিলেও তরুণ জনগোষ্ঠীর নতুন কর্মসংস্থান একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। শিক্ষিত বেকারত্ব, বিদেশগামী শ্রমবাজারের অনিশ্চয়তা এবং শিল্পখাতে বিনিয়োগ স্থবিরতা সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। নতুন সরকার যদি দ্রুত কর্মসংস্থানমুখী নীতি গ্রহণে ব্যর্থ হয়, তবে অর্থনৈতিক চাপ রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।


সুশাসন ও দুর্নীতির চ্যালেঞ্জ:

নির্বাচনের পর জনগণের বড় প্রত্যাশা থাকে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দুর্নীতি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা, যা রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া নির্মূল করা সম্ভব নয়। উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম এবং প্রশাসনিক দুর্নীতি অর্থনীতিকে দুর্বল করে তুলছে। নতুন সরকার যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতীকী নয় বরং কাঠামোগত সংস্কারে না যায় তাহলে জনগণের আস্থা দ্রুত কমে যেতে পারে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সংসদের বাইরে থাকায় সরকারের ওপর বিরোধী রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের এ বিষয়ে নজর আরও তীক্ষ্ণ হবে।


চ্যালেঞ্জ হবে রোহিঙ্গা সংকট:
নতুন সরকারের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল সমস্যা হলো রোহিঙ্গা সংকট। বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে, যা দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও নিরাপত্তার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠছে। রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন না হলে এই সংকট ভবিষ্যতে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। ক্যাম্প এলাকায় অপরাধ, মাদক ও চোরাচালানের আশঙ্কাও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকারকে এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করতেই হবে। নইলে নানামুখি সঙ্কটে বেকায়দায় পরে যেতে পারে নতুন সরকার।


আন্তর্জাতিক চাপ ও কূটনৈতিক ভারসাম্য:
আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় প্রতিবেশি ও পশ্চিমা দেশগুলোর দৃষ্টি নতুন সরকারের দিকে আরও বেশি নিবদ্ধ থাকবে। নির্বাচন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র প্রশ্নে আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তি, উন্নয়ন অংশীদার এবং বাণিজ্যিক সহযোগীদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা নতুন সরকারের জন্য একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। এছাড়া রপ্তানি বাজার, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। নতুন সরকারের কোনো কূটনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।


রাজনৈতিক বৈধতা ও আওয়ামী লীগ না থাকার প্রভাব:
আগামী নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনীতিতে একটি প্রধান শক্তি এবং দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা দল। তাদের নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ফলে সংসদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। বড় একটি ভোটব্যাংক ও রাজনৈতিক মতাদর্শ সংসদের বাইরে থেকে যাওয়ায় সংসদ কার্যকরভাবে জনগণের সব শ্রেণির কণ্ঠস্বর প্রতিফলিত করতে পারছে কি না-এই প্রশ্ন ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশে আলোচনায় এসেছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় তাদের রাজপথের রাজনীতি আরও সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দলটি সংসদের বাইরে থেকে আন্দোলনমুখী কৌশল গ্রহণ করলে রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সেই সঙ্গে আগামী নির্বাচনে পরাজিত দল বা জোট যেকোনো কারণে আন্দোলনমুখি হয়ে উঠতে পারে। নতুন সরকার যদি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সংলাপ ও সহনশীলতার পথ বেছে না নেয়, তবে রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হবে, যা শাসনব্যবস্থার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এ বিষয়ে আইন ও সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. শাহদীন মালিক ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকার একদিকে একটি নতুন সুযোগের মুখোমুখি, অন্যদিকে অভূতপূর্ব কিংবা কঠিন চ্যালেঞ্জের ভার বহন করবে বলেই মনে হচ্ছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনে না থাকা রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্নকে সামনে আসছে, মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে এবং রোহিঙ্গা সংকট ভবিষ্যতের জন্য একটি নীরব হুমকি হয়ে আছে। যা বিচক্ষণতার সঙ্গে নতুন সরকারকে মোকাবিলা করতে হবে। নইলে সেই নতুন সরকার এমনকি দেশবাসীও সঙ্কটে পড়তে পারে।


আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি বিশ্লেষক ড. দেলোয়ার হোসেন ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আসতে চলা নতুন সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক সংস্কার এবং দায়িত্বশীল কূটনৈতিক কৌশলের ওপর। সংকটগুলোকে অস্বীকার না করে যদি সরকার সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তবে এই কঠিন সময়ই বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি করতে পারে। অন্যথায়, চ্যালেঞ্জগুলো ক্রমেই গভীর হয়ে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। গভীর সঙ্কেটে পড়তে পারে বহুল কাঙ্খিত আগামীর নতুন সরকার।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ