Views Bangladesh Logo

'বঙ্গবন্ধু' উপাধির রূপকার তোফায়েল আহমেদ

উত্তাল ষাটের দশক! ফেব্রুয়ারি মাসের সন্ধ্যা বেলা রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের গগনবিদারী কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল ‘বঙ্গবন্ধু’ নামটি। যে উপাধি আজও বাঙ্গালির হৃদয়ে চির অমর, চির উজ্জ্বল— সেই উপাধির রূপকার ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। সোমবার (১ জুন) বিকাল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই বর্ষীয়ান নেতা। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।

তোফায়েল আহমেদ ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং বহুমাত্রিক রাজনীতিবিদ। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন সেই অমর মুহূর্তটির জন্য; যখন তিনি বাংলার অবিসংবাদিত নেতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদানের সেই ঐতিহাসিক মূহুর্ত
১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তার মুক্তি ছিল গণঅভ্যুত্থানের রক্তঝরা বিজয়ের প্রতীক। তার মুক্তির পরদিন, ২৩ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো মানুষের ঢল নামে। ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিলেট, চট্টগ্রামসহ সারাদেশ থেকে ট্রেন-বাস-লঞ্চ বোঝাই হয়ে আসে মানুষ, যারা এসেছিল তাদের প্রিয় নেতাকে সংবর্ধনা জানাতে।

সেই অভূতপূর্ব জনসমুদ্রের সামনে মঞ্চে দাঁড়িয়ে এক তরুণ ছাত্রনেতা উচ্চারণ করলেন ইতিহাসের অবিনশ্বর একটি বাক্য: "আজ থেকে তিনি আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।" সেই তরুণের নাম — তোফায়েল আহমেদ।

তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক, ২৩ বছর বয়সী তোফায়েল আহমেদ তার কণ্ঠে তুললেন ইতিহাসের সেই অমর ঘোষণা। আর্কাইভের তথ্যানুযায়ী, তোফায়েল আহমেদ সেদিন বলেছিলেন, “আমরা আমাদের মহান নেতা, যিনি তার যৌবন পাকিস্তানের কারাগারে কাটিয়েছেন এবং যিনি হাসি মুখে ফাঁসির মঞ্চে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চেয়েছেন, তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিচ্ছি।”

লাখো মানুষ দুই হাত তুলে সেই প্রস্তাব সমর্থন করেছিল। সেদিন থেকেই ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে যায় বাঙালির অবিসংবাদিত নেতার নামের সঙ্গে। ‘বঙ্গবন্ধু’ অর্থ— বঙ্গের বন্ধু। বঙ্গদেশের জনগণের বন্ধু।

সেই ঐতিহাসিক সন্ধ্যার স্মৃতিচারণ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ তারিখটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সেদিনের সেই গণসংবর্ধনার কথা তোফায়েল আহমেদ নিজেই লিখে গেছেন তাঁর 'ঊনসত্তরের গণ আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু' বইয়ে।

তাঁর নিজের ভাষায়: "১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। সেদিনের রেসকোর্স ময়দান যারা দেখেননি তাদের বলে বোঝানো যাবে না সেই জনসমাবেশের কথা... বলছিলাম ২৩ ফেব্রুয়ারি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়ার দিন। একটা ছাত্রের জীবনে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে? বাংলার অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ নেতা, শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিব যে মঞ্চে, যার সামনে দশ লক্ষেরও অধিক মানুষ, আমি সেই সভার সভাপতি! সেই সময়ই আমি বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান, হাজার বছরের মহাপুরুষ নিপীড়িত লাঞ্ছিত প্রবঞ্চিত বাঙালির নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করলাম — আজ থেকে তিনি আমাদের 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব'। লক্ষ লক্ষ কণ্ঠে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হলো জয় বঙ্গবন্ধু।"
— তোফায়েল আহমেদ, ঊনসত্তরের গণ আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু, পৃষ্ঠা ৩১-৩৩

'বঙ্গবন্ধু' উপাধিটি কোনো আকস্মিক উদ্ভাবন ছিল না। তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছেন, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা আগে থেকে আলোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের এক ছোট ভাই শেখ মুজিবকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন, যার নাম ছিল 'বঙ্গবন্ধু'। সেখান থেকেই আসে অনুপ্রেরণা। তোফায়েল লিখেছেন: "কেন যেন আমার খুব ভালো লাগলো বঙ্গবন্ধু সম্বোধন। অবরুদ্ধ বাঙালি যেন হাজার হাজার বছর ধরে অপেক্ষায় ছিলেন এমন একজন বন্ধুর জন্য।"

বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বিশ্বস্ত তরুণ সেনা
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও তোফায়েল আহমেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ‘মুজিব বাহিনীর’ চার প্রধানের অন্যতম হিসেবে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। দেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তার সাহসিকতা ও নেতৃত্বগুণ ছিল অনুকরণীয়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় ছাত্রলীগ ও তরুণ প্রজন্মকে সংগঠিত করে তিনি গড়ে তোলেন প্রতিরোধের দেয়াল।



বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তোফায়েল আহমেদকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় নিজের রাজনৈতিক সচিব নিযুক্ত করেন। সেই আস্থার পেছনে ছিল কারণ। রক্ষীবাহিনীর উপপরিচালক (প্রশিক্ষণ) লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আনোয়ার উল আলম তাঁর 'রক্ষীবাহিনীর সত্য-মিথ্যা' বইয়ে লিখেছেন: 'বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্যোগময় মুহূর্তে, ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর পর যখন উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা আত্মগোপন করেন, তখন একমাত্র তোফায়েল আহমেদ পালিয়ে না গিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রক্ষীবাহিনীর প্রধান কার্যালয়ে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। সেই সাহসী মানুষটি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত দীর্ঘ রাজনৈতিক দুর্বিপাকে ৩৩ মাস কারাভোগ-সহ অনেক লাঞ্ছনা সয়ে গেছেন, তবুও এক মূহুর্ত্বের জন্যেও তার আদর্শ ত্যাগ করেননি।

‘আবার আসিবো ফিরে এই বাংলায়’
২০২০ সালে বাংলা ট্রাইবিউনে প্রকাশিত নিজের লেখায় ‘আবার আসিবো ফিরে এই বাংলায়’ শিরোনামে তোফায়েল আহমেদ লিখেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। সেখানে তিনি বঙ্গবন্ধুর সেই হৃদয়বিদারক কথাগুলো তুলে ধরেন, যা ২৫ মার্চের কালরাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে তিনি বলেছিলেন।

“গণহত্যা শুরুর প্রাক্কালে সাক্ষাৎকারে রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতা থেকে বিষাদাচ্ছন্ন স্বরে বলেছিলেন, ‘আবার আসিবো ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়...’”

তোফায়েল আহমেদ নিজেও যেন বারে বারে ফিরে আসবেন এই বাংলায়— তার কর্মের মধ্য দিয়ে, তার স্মৃতির মধ্য দিয়ে।

ইতিহাসের সাক্ষীর চিরবিদায়
তোফায়েল আহমেদ ছিলেন ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ— প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়েই তিনি উপস্থিত ছিলেন। কখনো সামনের কাতারে, কখনো পেছনের সারিতে। তবে তিনি ছিলেন সবসময়ই, অটলভাবে।

সেই অমর উপাধি ঘোষণাকারী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বহুমাত্রিক রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদের চলে যাওয়া যেন এক যুগের অবসান ঘটাল। তবে ইতিহাসের পাতায় তিনি চির অমর হয়ে থাকবেন। যতদিন এ ধরণীতে বাঙালি থাকবে, যতদিন ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি উচ্চারিত হবে, ততদিন তোফায়েল আহমেদের নাম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হবে। তার মৃত্যুতে বাংলার আকাশ যেন ভারী হয়ে আছে। প্রয়াত এই নেতার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।

ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন!

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ