Views Bangladesh Logo

‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’: যুক্তরাষ্ট্রের পতন ও চীনের উত্থান

Rased Mehedi

রাশেদ মেহেদী

শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকেই যেতে হল বেইজিংয়ে। কারন বিশ্ব রাজনীতিতে ক্রমাগত মিত্রহীন হয়ে পড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সামনে আর কোন উপায় ছিল না। স্বপ্নের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অমাবস্যার আঁধার ক্রমাগত দানা বাঁধতে শুরু করেছিল জো বাইডেনের শাসনামল থেকেই। অতি সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের পর ওয়াশিংটনের আকাশে সেই অন্ধকার যখন ঘনীভূত হচ্ছে, নতুন সূর্যের আলো তখন পূবের আদি সভ্যতার বৃহত্তম ভূমি বেইজিং-এর আকাশ থেকে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে। অতএব মার্কিন সাম্রাজ্যের দম্ভের স্মৃতিস্মারকটুকু বাঁচিয়ে রাখতে ট্রাম্প সেখানেই ছুটে গেলেন, সেই আলোর স্পর্শ নিতে! আর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং সগর্বে শুনিয়ে দিলেন সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত তত্ত্ব ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’, যার অর্থ ‘বিদ্যমান সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সামনে ধ্বংস হওয়ার তীব্র ভয়, আর নতুন উদীয়মান নতুন শক্তির উত্থানের বিশ্বময় ঘোষণা।’ রাজনীতিতে ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ তত্ত্বটি ২০১২ সালে মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গ্রাহাম অ্যালিসন উপস্থাপন করেছিলেন। ২০১৭ সালে এই তত্ত্বের উপর প্রকাশিত হয় তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ডেসটিন্ড ফর ওয়ার’। সেই তত্ত্বই  স্মরণ করে দিয়ে শি জিন পিং ট্রাম্পকে বললেন, ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ' এড়াতে চাইলে শান্তিপূর্ণ সহবস্থানের নীতিতে চলতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে।’



যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চোখে চোখ রেখে এভাবে কঠোর নির্দেশ দিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কোন দেশের রাষ্ট্র কিংবা সরকারপ্রধানকে দেখা যায়নি। আর নব্বই দশকের পর থেকে বিশ্ব রাজনীতিতে মূলত একক সাম্রাজ্যের অধিপতি বনে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে যাওয়ার অর্থ দাঁড়িয়েছিল ‘ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন, লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট গাদ্দফি’র মত পরিণতি, অপেক্ষা করতে হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের হুংকার পর্যন্ত। কিন্তু এবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেইজিং বৈঠক শেষে শি জিন পিং এর বিরুদ্ধে সেই হুংকার দেননি। বরং তিনি ট্রুথ সোস্যালে লিখেছেন, ‘শি আমেরিকাকে পতনশীল জাতি উল্লেখ করেছেন, প্রকৃতপক্ষে তিনি বাইডেনের চার বছরের ক্ষতির কথাই বলেছেন এবং এটি ১০০% সঠিক।’ অর্থাৎ খোদ ট্রাম্প নিজেই যুক্তরাষ্ট্রের পতন শুরুর কথা স্বীকার করলেন, যদিও স্বভাবসুলভ ভাবে দায় চাপিয়েছেন তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দি বাইডেনের ঘাড়ে।


চীন সফরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে শি জিন পিং এর মূহুর্ত।


যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ‘পারস্পরিক কাঁদা ছোড়াছুড়ি’র তত্ত্বটিও আগের মেয়াদে ট্রাম্পই জন্ম দিয়েছিলেন, যেটা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্যে অস্বস্তিকর প্রভাব সৃষ্টি করেছিল। ক্ষমতার প্রথম মেয়াদেই (২০১৭-২০২১) ট্রাম্প ন্যাটো, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে সরিয়ে রেখে ইউরোপের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের ভাঙ্গন শুরু করেন। প্যারিস চুক্তি ও ইরান পারমানবিক চুক্তি প্রত্যাখান করে বিশ্ব রাজনীতিতে চীনের প্রভাব বলয়ের বিস্তার ত্বরান্বিত করার সুযোগ সৃষ্টি করেন। চীন সেই সুযোগ নিতে দেরি করেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কাঠামোতে যে ‘আমেরিকান অর্ডার’ তৈরি হয়েছিল সেটা ভেঙে দিতে শি জিন পিং দ্রুত বিশ্ব সংস্থাগুলোতে চীনের প্রভাব বাড়াতে সক্রিয় হন। তার প্রতি পরোক্ষ সমর্থন দেয় জার্মানি, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং ইরান। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত অবাস্তবায়িত রেখে সে মেয়াদে ট্রাম্প বিদায় নেন।


ক্ষমতায় এসেই বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেন এবং সেখানে মার্কিন সমর্থিত সরকারের সঙ্গে সঙ্গে পতন ঘটে।


ক্ষমতায় এসেই বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেন এবং সেখানে মার্কিন সমর্থিত সরকারের সঙ্গে সঙ্গে পতন ঘটে। শুরু হয় পূবর্বর্তী মৌলবাদী তালেবান শাসন। এর মধ্য দিয়ে মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয় অনেকটাই ভেঙে পড়ে। মধ্য এশিয়ায় একমাত্র আজারবাইজান সরকারে সঙ্গে দৃশ্যত মিত্রতা দেখা গেলেও এ অঞ্চলের ‘মাল্টি ভেক্টর ফরেন পলিসি’র কারনে সে মিত্রতায় ঘনিষ্ঠতার মাত্রা কতটুকু তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। একই কথা কিছুটা পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পাকিস্তান মূলত দ্বিমুখী পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে এগিয়ে চলে। দু’টি নীতি হচ্ছে ‘জিও স্ট্রাটেজিক' এবং 'পিভট টু জিওইকনোমিক্স’। ‘জিও স্ট্রাটেজিক’ নীতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার বিশেষ সম্পর্কের জন্য, আর ‘পিভট টু জিওইকনোমিক্স’ হচ্ছে চীনের সঙ্গে বাণিজিক্য ও অন্যান্য কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করার জন্য।  মূলত, ২০২২ সালে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে তার পররাষ্ট্রনীতিতে ‘জিও স্ট্র্যাটেজি’র পরিবর্তে ‘পিভট টু জিওইকনোমিক্স’ পলিসিতে প্রাধান্য দেওয়ার ঘোষণার পর থেকেই পাকিস্তানেরে উপরও যুক্তরাষ্ট্রের সেই একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নেই। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের প্রেক্ষোপটেই ২০২২ সালে পাকিস্তান তার পররাষ্ট্রনীতিতে এত বড় পরিবর্তন আনে। আসলে আফগানিস্তানে বছরের পর বছর সৈন্য রাখা যেমন বিশাল খরচের বোঝা বাড়াচ্ছিল, তেমনি আফগানিস্তানই ছিল সমগ্র মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির মূল ভরকেন্দ্র। সেই কেন্দ্র যখন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই অপসারণ করল, তখন চীনের জন্য বড় সুযোগ সহজেই তৈরি হয়ে যায়।

১৯৯৮ সালে থেকে চীন দুনিয়া জুড়ে বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলার যে অভিযাত্রা শুরু করেছিল ২০১৬ সাল পর্যন্ত সে যাত্রা দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য হয়ে আফ্রিকার বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি ইউরোপ এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও চীনের বাণিজ্যিক আধিপত্য ক্রমেই শক্ত ভিত্তি পাচ্ছিল। ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা শপথ গ্রহণের পর প্রথমবারের মত চীনের বাণিজ্যিক অভিযাত্রাকে আটকে দেওয়ার চেষ্টা শুরু করেন। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের অধিকাংশ দেশে চীনা কোম্পানিগুলোকে বেকায়দায় ফেলেন। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে এশিয়া এবং আফ্রিকাতেও চীনা কোম্পানিগুলো কাজের পরিধি সংকুচিত হতে থাকে।


কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা, ইরান পারমানবিক চুক্তি সম্পাদন, ফিলিস্তিনে ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার নীতি গ্রহণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্বের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করেন ওবামা।


একই সঙ্গে বারাক ওবামা খুব তীক্ষ্ণ নজর রাখছিলেন ভারত মহাসাগরীয়  অঞ্চলে ভারত ও চীনের প্রভাব বলয়ের প্রতিও। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আইপিএস বা ’ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ নীতির বিপরীতে ২০১৩ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ ঘোষণা করলে প্রেসিডেন্ট ওবামা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আধিপত্য ধরে রাখতে অত্যন্ত সর্তক নীতি অবলম্বন করেন। সরাসরি সামরিক ঘাঁটির বিস্তৃত করার পরিবর্তে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া, ট্রেনিং এর মত কার্যক্রমের প্রতি জোর দেন, অর্থাৎ চাপের বিপরীতে পিঠে হাত বোলার নীতি গ্রহণ করেন। একই সময়ে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের দিকে বিশেষভাবে নজর দেন। ওই অঞ্চলে যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে ক্ষমতায় আসা এবং দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা অনুগত সরকার প্রধানদের মধ্যে যারা বেশ বেয়ারা হয়ে যাচ্ছিল এবং চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ার দুঃসাহস দেখাচ্ছিল, তাদের একে একে ক্ষমতাচ্যুত করার মিশন নেন। যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সেই ‘আরব বসন্ত’র জোয়ারে চীনের অগ্রযাত্রায় ভাটার টান বেশ তীব্র হয়। একই সঙ্গে প্রতিবেশী কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা, ঐতিহাসিক ইরান পারমানবিক চুক্তি সম্পাদন, ফিলিস্তিনে ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার নীতি গ্রহণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্বের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করেন ওবামা। অর্থাৎ, ওবামা বেশ সফলভাবেই চীনকে মোকাবিলা করে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন।


কিন্তু ওবামার পর ট্রাম্প এসে ইরান পারমানবিক চুক্তি থেকে সরে গিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি করেন। অন্যদিকে তিনি চীনকে শিক্ষা দিতে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেন। ক্ষমতার প্রথম বছরের পরই ন্যাটো, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেন। তার এসব উদ্ভট পদক্ষেপ বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে বেশ দুর্বল করে দেয়।


আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয় অনেকটাই ভেঙে পড়ে।


যুক্তরাষ্ট্রের স্মরণকালের মধ্যে সম্ভবত, সবচেয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন শাসক ছিলেন জো বাইডেন। তিনি ট্রাম্প আমলে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর পদক্ষেপগুলোর কোন সমাধান করেননি, বরং কভিড-১৯ মহামারীর পর ভঙ্গুর অর্থনীতির কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ইউক্রেন যুদ্ধ বাঁধিয়ে ইউরোপের মিত্রদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রকে চরম অস্বস্তিকর করে তুলেছেন। তার ভুল নীতির কারনেই ফিলিস্তিনে নতুন করে সংকট শুরু হয় এবং গাজায় নজিরবিহীন গণহত্যা চালানোর সুযোগ পায় ইসরায়েল। আর গাজা গণহত্যার পক্ষে জো বাইডেনের প্রকাশ্য অবস্থান বিশ্বের সামনে যুক্তরাষ্ট্রকে ভীষণ অজনপ্রিয় করে তোলে।

আফগান্তিান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের ভুল নীতির কথা আগেই বলেছি। এ ছাড়া বারাক ওবামার স্টাইলে কিছু দেশে তার অপছন্দের সরকার পতনের ঘটনা ঘটাতে গিয়ে আরও একটি ভুল করেন বাইডেন। ওবামা যেভাবে আরব বসন্তের সমর্থনে একটা গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব দাঁড় করাতে পেরেছিলেন, বাইডেন তার অপছন্দের সরকার পতনে সেটা পারেননি। ফলে দ্রুতই বাইডেন আমলে দেশে দেশে সরকার পতনে ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’র গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রকে নিছক ষড়যন্ত্রকারী দেশ হিসেবে অভিযোগের কাঠগড়াতে দাঁড়াতে হয়। বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশনগুলোর কার্যক্রমও গভীর সন্দেহের আবর্তের ভেতরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।


ট্রাম্প ও বাইডেনের সবচেয়ে বড় যৌথ ভুল হচ্ছে, যে মুহুর্তে চীন তথ্যপ্রযুক্তিতে সক্ষম অবস্থান প্রায় তৈরি করেছে, সে অবস্থায় চীনা তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কোম্পানিগুলোর প্রতি নিষেধাজ্ঞা কঠোর থেকে কঠোরতর করা এবং বিশ্ব ইন্টারনেট ব্যবস্থাকে দ্বিখণ্ডিত করার আশঙ্কা জোরালো করে তোলা। এই ভুল নীতির বিপরীতে চীন তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় নিরবেই একক আধিপত্য তৈরি করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের গত চল্লিশ বছরের একক সাম্রাজ্যকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। আসলে জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের এমন একজন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, যিনি চার বছর ধরে একটার পর একটা ভুল নীতিই শুধু গ্রহণ করে গেছেন। জো বাইডেনের ভুলেই মূলত বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একক সাম্রাজ্যের পতনের পথ ত্বরান্বিত করে।

জো বাইডেনের উত্তরসূরি হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে তার অত্যন্ত প্রিয় ‘ইরান দমন নীতি’ বাস্তবায়নে অতি তৎপর হয়ে ওঠেন। শেষ পর্যন্ত একটা ইরান যুদ্ধ বাঁধিয়েই ছাড়েন। সেই যুদ্ধের ফল হচ্ছে ইউরোপে প্রায় মিত্রহীন হয়ে পড়া, মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং এর প্রভাব হিসেবে পুরো বিশ্বেই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে দুর্বল করা। ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে তুলে এনে নিজেকে বেশ সফল ভেবেছিলেন। কিন্তু ‘প্রেসিডেন্ট মাদুরো’ই যে ট্রাম্পের জন্য প্রতিপক্ষের অতি কৌশলী ট্রাম কার্ড হয়ে উঠবে সেটা তখন বোঝা যায়নি।


আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনিকে প্রথম দিনেই হত্যা করে করে নিজেকে সাফল্যের চূড়ায় ভাবতে শুরু করেন ট্রাম্প।


মাদুরোকে তুলে আনার ঘটনায় চীনের অস্পষ্ট প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প বেশ আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এবং ইরানে হামলা করেন। আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনিকে প্রথম দিনেই হত্যা করে করে নিজেকে সাফল্যের চূড়ায় ভাবতে শুরু করেন। কিন্তু ইরানের চারপাশে চীন কতবড় ঢাল হয়ে বসেছিল সেটা একদমই টের পাননি বিশ্ব দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে ইরান যুদ্ধ পরিণত হয় মূলত যুক্তরাষ্ট্র-চীন যুদ্ধে। আর সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। ইরান যুদ্ধ শেষ না হতেই দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের নিয়ে ট্রাম্পের বেইজিং সফর এবং শি জিন পিং এর ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের অসহায়ত্ব অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে গেছে। অর্থাৎ, শি জিন পিং-ট্রাম্প বৈঠক থেকেই চীনের নতুন উত্থান কিংবা চীনা সাম্রাজ্যের অভিযাত্রা শুরু হয়েছে ধরে নেওয়া যায়।


মাদুরোকে তুলে আনার ঘটনায় চীনের অস্পষ্ট প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প বেশ আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে আজ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সাম্রাজ্যের সবচেয়ে নিকৃষ্ট দিক ছিল, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও যুদ্ধাবস্থা জিইয়ে রাখা এবং মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিপুল সংখ্যক নিরীহ মানুষকে হত্যা করা। ইরাকে ভুয়া রাসয়নিক অস্ত্রের গল্প শুনিয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ হত্যার ঘটনা আমরা সবাই জানি। দ্বিতীয় ‍বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দুনিয়া জুড়ে যুদ্ধ ও সংঘাতে যত মানুষ প্রাণ দিয়েছেন তার প্রায় সবকটি’তেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আরও একটি বড় ভুল হচ্ছে আধিপত্যবাদ টিকিয়ে রাখার স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ বিছু দেশে ধর্মীয় মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদ সৃষ্টি করা ও লালন করা। এই মৌলবাদ বিশ্বে বড় ধরনের বৈষম্যমূলক অবস্থার সৃষ্টি করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় ও যথাযথ শিক্ষা ব্যবস্থার কারনে ইউরোপ যেখানে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার শীর্ষে উঠে গেছে, শান্তিপূর্ণ জীবন-যাপনের সুযোগ পেয়েছে, সেখানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশে ধর্মীয় মৌলবাদের কারনে পশ্চাৎপদ সমাজব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে দারিদ্র্যের কষাঘাত প্রবল। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার বিপরীতে এসব সমাজে সংঘাত, নিষ্ঠুরতা, বর্বরতার ভয়াবহতা আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এর ঢেউ থেকে শেষ পর্যন্ত ইউরোপ-আমেরিকাও নিরাপদ থাকেনি।


খ্রিস্টপূর্ব ৪৩১ সালে ইতিহাসবিদ থুসিডিডিস পেলোপোনেশিয়ান যুদ্ধের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘এথেন্সের ক্রমবর্ধমান শক্তি বৃদ্ধি এবং স্পার্টার মধ্যে পতনের যে ভয় তৈরি করেছিল, তাই যুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলেছিল।’


চীন বিশ্ব সভ্যতার অনন্য এক উর্বরভূমি। এখানে তাংশি, মিং ও কিং সাম্রাজ্যের গৌরবময় অতীত রয়েছে। রয়েছে যুদ্ধেরও অনেক ইতিহাস। তবে চীনের যুদ্ধের ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের মত বেসামরিক লোককে নির্বিচারে হত্যার রেকর্ড নেই বললেই চলে। চীনা ইতিহাস আর কিংবদন্তী সবখানেই যুদ্ধ বেশ নিয়ন্ত্রিত। প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার আগ্রাসী নীতির চেয়ে আত্মরক্ষার কৌশলের উদাহরণ বেশী।

আসলে সব সাম্রাজ্যবাদের চেহারা শেষ পর্যন্ত একই হয়। তারপরও আমরা আশাবাদী হতে চাই, কারন চীন অত্যন্ত আধুনিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের পতনের সাক্ষী হয়ে থাকছে। অতএব তারা বিশ্ব রাজনীতির নতুন মোড়ল হলে নীতি গ্রহণে অবশ্যই সতর্ক হবে। এক প্রান্তের মানুষকে কুসংস্কার, মৌলবাদ, জঙ্গীবাদের মধ্যে ডুবিয়ে রেখে,  শত শত নিরীহ মানুষ হত্যার যুক্তরাষ্ট্রীয় হঠকারী নীতি গ্রহণ করে নিশ্চয় নিজেদেরকে অগ্রহণযোগ্য করে তুলবে না।

‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ নীতিতে এখন পর্যন্ত চীনের অবস্থান পরিশীলিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গ্রাহাম অ্যালিসনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ‘প্রাচীন গ্রিসে খ্রিস্টপূর্ব ৪৩১ সালে ইতিহাসবিদ থুসিডিডিস পেলোপোনেশিয়ান যুদ্ধের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘এথেন্সের ক্রমবর্ধমান শক্তি বৃদ্ধি এবং স্পার্টার মধ্যে পতনের যে ভয় তৈরি করেছিল, তাই যুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলেছিল।’ এটাকেই তিনি বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভেতরে দ্বন্দ ও উত্থান-পতনের আশঙ্কা কিংবা সম্ভাবনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন। চীনের প্রেসিডেন্ট ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ নীতির বিদ্যমান বাস্তবতা তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে সহনশীল নীতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। এটা অত্যন্ত ইতিবাচক। আজকের সভ্যতাকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে শি জিন পিং তার ঐতিহাসিক আহ্বান জানিয়েছেন। এখন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারিকদের ভূমিকার উপরই নির্ভর করবে বিশ্ব সভ্যতা কোন পথে এগোবে। আমরা শান্তি চাই, যুদ্ধ চাই না।

রাশেদ মেহেদী, সম্পাদক: ভিউজ বাংলাদেশ

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ