Views Bangladesh Logo

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ

তিন মোবাইল অপারেটর গ্রাহকের পকেট কেটে নিয়েছে চার হাজার কোটি টাকা!

Rased Mehedi

রাশেদ মেহেদী

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের একটি সিদ্ধান্তে মোবাইল অপারেটরদের জন্য ডাটা প্যাকেজ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এর অর্থ মোবাইল অপারেপটররা নিজেদের মতো করে যেমন খুশি প্যাকেজ তৈরি করে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করতে পারবে। এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এক ঘণ্টা থেকে আনলিমিটেড যেকোনো মেয়াদের এবং যেকোনো ভলিউমের ডাটা প্যাকেজ দেওয়ার সুবিধা পায় মোবাইল অপারেটররা।

ভিউজ বাংলাদেশের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সেই সুবিধা কাজে লাগিয়ে প্যাকেজের কৌশলগত মূল্য নির্ধারণ করে তিনটি বিদেশি মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর ২০২৫ সালজুড়ে গ্রাহকের পকেট থেকে বাড়তি প্রায় ৪০০০ কোটি টাকা আয় করেছে। তবে দেশীয় অপারেটর টেলিটক এই বাড়তি আয়ের কৌশল নেয়নি। এ ছাড়া বিটিআরসির নীতির সুযোগ নিয়ে ভয়েস কলেও মোবাইল অপারেটররা প্রতি মিনিট সর্বনিম্ন ৪৫ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ দুই টাকা আদায়ের সুযোগ নিচ্ছে। বিশ্বের অন্য কোনো দেশে ভয়েস কলের ক্ষেত্রে ফ্লোর প্রাইস না থাকলেও বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে প্রতিযোগিতার বদলে গ্রাহকদের কাছ থেকে ভয়েস কলে উচ্চমূল্য আদায়ের সুযোগ করে দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে মোবাইল ডাটা প্যাকেজ এবং ভয়েস কল উভয় ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীতি ও নির্দেশিকা শুধুমাত্র ধনী গ্রাহকদের সুবিধা দিচ্ছে এবং নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্তি মুনাফা আদায়ের সুযোগ দিচ্ছে। যেমন তিন দিনের ছোট প্যাকেজ ব্যবহারকারী নিম্ন আয়ের মানুষের কাছ থেকে সর্বোচ্চ দাম নিচ্ছে মোবাইল অপারেটররা। ওটিটি অ্যাপের দাপটের যুগে ‘ভয়েস কল’ সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে সেসব নিম্নআয়ের মানুষ যাদের হাতে স্মার্টফোন নেই। অথচ তাদের কাছ থেকেই মোবাইল অপারেটররা সর্বোচ্চ দাম নিচ্ছে ‘ফ্লোর প্রাইস’ নীতির কারণেই।

যেভাবে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তিন অপারেটরের

২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে বিটিআরসি মোবাইল অপারেটরদের তিন দিন ও ১৫ দিন মেয়াদের প্যাকেজ বন্ধ করে প্যাকেজ সংখ্যা ৪০-এ নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত দেয়। এর আগে মোবাইল অপারেটরদের জন্য প্রায় ৯০ ধরনের প্যাকেজ চালু ছিল। অনেক বেশি সংখ্যার প্যাকেজে স্বল্প আয়ের মানুষের সঙ্গে অপারেটরদের প্রতারণার বিষয়টি প্রতীয়মান হওয়ার প্রতিবেদন থেকেই বিটিআরসি তিন ও ১৫ দিনের প্যাকেজ বন্ধ করে প্যাকেজ সংখ্যা ৪০-এ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। তিনটি মোবাইল অপারেটর এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কৌশলগত কঠোর অবস্থান নেয় শুরু থেকেই। প্রথমেই তারা সাত ও ৩০ দিনের প্যাকেজের দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেয়। পরে প্যাকেজে ডাটা ভলিউম ১০ জিবির নিচে নামিয়ে এনে ৩০ দিন মেয়াদের প্যাকেজের দাম ৫০০ টাকার কাছাকাছি নির্ধারণ করে। অবশ্য বিটিআরসি শক্ত পদক্ষেপ নিলে মোবাইল অপারেটররা সাধারণ হিসেবে ৩০ দিনের মেয়াদে ১০ জিবি ডাটার প্যাকেজ ৩০০ টাকায় নামিয়ে আনতে বাধ্য হয় এবং অন্যান্য প্যাকেজের মূল্য নির্ধারণেও এই হিসেবেটাকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারির একটি নির্দেশিকা জারি করে মোবাইল অপারেটরদের সামনে ৪০ প্যাকেজের সীমারেখা তুলে দিয়ে প্যাকেজের মেয়াদ ও ডাটার পরিমাণ নির্ধারণে সব ধরনের নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া হয়। আর এই অবাধ স্বাধীনতা মোবাইল অপারেটরদের সামনে গ্রাহকের পকেট কাটার অবারিত সুযোগ এনে দেয়।

চার হাজার কোটি টাকার বাড়তি আয়ের হিসাব

দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনের বর্তমানে ৩০ দিন মেয়াদে ১০ জিবির প্যাকেজের দাম ৩৯৯ টাকা। এটা সাধারণ প্যাকেজ তালিকায় যেমন আছে, ফ্লেক্সিপ্ল্যানেও এই একই হিসেবে ইন্টারনেটের মূল্য নির্ধারণ করা আছে। তবে বান্ডল (ইন্টারনেট ও ভয়েস কলের সমন্বিত প্যাকেজ) এবং গ্রাহকের ব্যয়ের ধরন অনুযায়ী কাস্টমাইজড প্যাকেজের ভিন্নতা আছে। এ ভিন্নতার পরিমাণ সামান্য, সব গ্রাহকের জন্য উন্মুক্ত প্যাকেজে ৩০ দিন মেয়াদে ১০ জিবি ডাটার দাম ৩৯৯ টাকা, এটাই মূল ভিত্তি। নিজের মতো প্যাকেজ বানিয়ে নেওয়ার (ফ্লেক্সিপ্ল্যান) যে হিসাব সেখানেও একইভাবে ৩০ তিন মেয়াদে ১০ জিবি ডাটা সেট করলে দাম ৩৯৯ টাকাই আসে, এই হিসাবই বর্তমানে গ্রামীনফোনের মাসিক প্যাকেজে হিসেবে মূল ভিত্তি ও গড় হিসেবে বিবেচনা করা যায়, কারণ ৩০ দিন মেয়াদে এটাই সবচেয়ে কম দামের প্যাকেজ।


বাংলাদেশে কোনো মোবাইল অপারেটর তার ডাটা গ্রাহক সংখ্যা এবং ডাটা থেকে আয়ের হিসেব প্রকাশ করে না। বিটিআরসিও কোন অপারেটরের কত গ্রাহক সংখ্যা সে হিসেব দিলেও কোন অপারেটরের ডাটা গ্রাহক সংখ্যা কত তার কোনো হিসাব প্রকাশ করে না। ফলে বাংলাদেশে মোবাইল অপারেটরদের ইন্টারনেট ব্যবসার হিসাব রহস্যময়ই থেকে গেছে।

এ কারণে ভিউজ বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান ও মোবাইল অপারেটর প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তকে ভিত্তি ধরেই গ্রহণযোগ্য হিসাব উপস্থাপন করেছে। এর আগে মোবাইল অপারেটর এবং যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক সংগঠন জিএসএমএ’র প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট মোবাইল গ্রাহকের ৬০ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন।


এ হিসেবে গ্রামীণ ফোনের বর্তমান (বিটিআরসি’র প্রকাশিত তথ্য) গ্রাহক সংখ্যা ৮ কোটি ৪৩ লাখ ৩০ হাজার। অর্থাৎ, গ্রামীণফোনের ৫ কোটি ৫৯ লাখ ৮ হাজার জন গ্রাহক মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এর আগে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মোট ইন্টারনেট গ্রাহকের ৪০ শতাংশ ৩০ দিন মেয়াদের প্যাকেজ ব্যবহার করে থাকেন। অর্থাৎ, গ্রামীণফোনের মোট ইন্টারনেট গ্রাহকের মধ্যে ২ কোটি ২৩ লাখ ৯ হাজার ২০০ জন গ্রাহক ৩০ দিন মেয়াদের প্যাকেজ ব্যবহার করেন। আগে গ্রামীণফোন, রবি এবং বাংলালিংকের ক্ষেত্রে ৩০ দিনের মেয়াদে ১০ জিবি ডাটার প্যাকেজ (সবচেয়ে কম মূল্যের প্যাকেজ) এর দাম ছিল ৩০০ টাকা। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে গ্রামীণফোনের প্যাকেজের দাম বেড়ে হয়েছে ৩৯৯ টাকা। অর্থাৎ গ্রামীণফোনের ২ কোটি ২৩ লাখ ৯ হাজার ২০০ জন গ্রাহকের প্রতিজন প্রতি মাসে ৯৯ টাকা বেশি মূল্য পরিশোধ করেরেছন। এই হিসাবে ২০২৫ সালে গ্রাহকরা ১২ মাসে কমপক্ষে ২ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছেন। তিন দিন ও সাত দিনের ছোট প্যাকেজের হিসাব করলে এই অতিরিক্ত আয়ের পরিমাণ আরও বাড়বে।



একইভাবে রবি আজিয়াটা লিমিটেডের বর্তমান গ্রাহক সংখ্যা ৫ কোটি ৭২ লাখ ৪০ হাজার। উপরের হিসেবে এর মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা ৩ কোটি ৪৩ লাখ ৪৪ হাজার। এর মধ্যে ৩০ দিন মেয়াদের প্যাকেজর গ্রাহক সংখ্যা ১ কোটি ৩৭ লাখ ৩৭ হাজার ৬০০ জন। রবির সবার জন্য উন্মুক্ত ইন্টারনেট প্যাকেজ এবং ইজি প্ল্যান অনুযায়ী ৩০ দিন মেয়াদের প্যাকেজের সর্বনিম্ন দাম ৩৮০ টাকা। এ হিসেবে ১ কোটি ৩৭ লাখ ৩৭ হাজার ৬০০ জন গ্রাহকের প্রতি জনের অতিরিক্ত ৮০ টাকা ব্যয়ের হিসাব ধরলে ১২ মাসে মোট মোট অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় কমপক্ষে ১ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা। রবির সাধারনভাবে উন্মুক্ত ইন্টারনেট প্যাকেজে ৩০ দিনের একটি মাত্র প্যাকেজ রয়েছে, ৮৫ জিবি ডাটার দাম ৭৯৮ টাকা। বান্ডল অফারে সর্বনিম্ন সর্বনিম্ন তিন জিবি ডাটা ও ১০০ মিনিট ভয়েস কলের জন্য ৩০ দিন মেয়াদে দাম ধরা হয়েছে ৩০৯ টাকা। অবশ্য মাই রবি অ্যাপে ইন্টারনেট প্যাকেজের তালিকায় ৩০ দিন মেয়াদে সর্বনিম্ন প্যাকেজ ১৫ জিবি ৪১৮ টাকা। অর্থাৎ, রবিতে ইজি প্ল্যান ছাড়া ইন্টারনেট প্যাকেজ কিনলে ৪০০ টাকার কম দাম দিলে আপনাকে মাসে মাত্র তিন জিবি ডাটা ব্যবহার করতে হবে। আর ১০ জিবি থেকে ১৫ জিবির মধ্যে ডাটা ব্যবহার করতে হলে ৪০০ টাকার বেশি দিতে হবে। এই বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, জটিল হিসাবের মারপ্যাঁচে বর্তমানে রবির ইন্টারনেট প্যাকেজের দামই অপেক্ষাকৃত বেশি।



একইভাবে বাংলালিংকের মোট গ্রাহক সংখ্যা ৩ কোটি ৭৪ লাখ। জিএসএমএ’র ৬০ শতাংশ হিসেবে এ অপারেটরের মোট মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা ২ কোটি ২৪ লাখ ৪০ হাজার। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ হিসেবে ৩০ দিন মেয়াদের প্যাকেজের গ্রাহক সংখ্যা ৮৯ লাখ ৭৬ হাজার। বাংলালিংকের মাই প্ল্যান অনুযায়ী ৩০ দিন মেয়াদে ১০ জিবি ইন্টারনেটের দাম ৩৫০ টাকা। এ অপারেটরের সাধারণ প্যাকেজে ৮ জিবি ডাটার ৩০ দিন মেয়াদের প্যাকেজের দাম ধরা হয়েছে ৩২৯ টাকা। এটা ১০ জিবিতে উন্নীত করলে দাম পড়ে ৪১১ টাকা। তবে সর্বনিম্ন হিসেবের সুবিধার্থে মাই প্ল্যানের ১০ জিবি ৩০ দিন মেয়াদে ৩৫০টাকাই ধরা হয়েছে। এ হিসেবে ৮৯ লাখ ৭৬ হাজার গ্রাহকের প্রতি জন প্রতি মাসে ৫০ টাকা অতিরিক্ত হিসেবে কমপক্ষে ৫৩৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছেন। এখন গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের অতিরিক্ত আয় হিসেব করলে মোট দাঁড়ায় চার হাজার ২৬০ কোটি টাকা।



স্বল্প আয়ের মানুষের কাঁধে বেশি ব্যয়ের বোঝা

এর আগে ২০২৩ সালে তিন দিন ও ১৫ দিন মেয়াদের প্যাকেজ তুলে দেওয়া হলে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের পক্ষ থেকে বার বার বলা হয়, স্বল্প আয়ের মানুষ তিন দিনের প্যাকেজ বেশি ব্যবহার করেন। তিন অপারেটরের প্যাকেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিন দিনের প্যাকেজ ব্যবহারকারী স্বল্প আয়ের মানুষই সবচেয়ে বেশী ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন। গ্রামীণফোনের তিন দিন মেয়াদের সর্বনিম্ন ৭ জিবি ডাটার প্যাকেজের দাম ১১৮ টাকা। এই হিসেবে একজন গ্রাহক পর্যায়ক্রমে এক মাস ইন্টারনেট ব্যবহার করলে তাকে কমপক্ষে ১ হাজার ১৮০ টাকা ব্যয় করতে হয়। রবির তিন মেয়াদের সর্বনিম্ন প্যাকেজে ৮ জিবি ডাটার প্যাকেজের দাম ১১৮ টাকা। এক্ষেত্রেও পর্যায়ক্রমে এক মাস ব্যবহার করলে গ্রাহককে দিতে হয় ১ হাজার ১৮০ টাকা।

বাংললিংকের ২ জিবি ডাটার ৩ দিন মেয়াদে সর্বনিম্ন প্যাকেজের দাম ৫০ টাকা। একমাত্র বাংলালিংকের গ্রাহকরাই সবচেয়ে কমমূল্যে অর্থাৎ পর্যায়ক্রমে ৩০ দিনের জন্য ৫০০ টাকায় ইন্টারনেটের খরচ রাখতে পারেন। এক্ষেত্রে তিন অপারেটরের দিক থেকেই যুক্তি হচ্ছে তিন দিনের প্যাকেজ গ্রাহকরা নিয়মিত প্যাকেজ কেনে না। কিন্তু অ্যামটবের হিসেব অনুযায়ী, মোট ইন্টারনেট গ্রাহকের ৬০ শতাংশ গ্রাহক ঘুরে ফিরে এই তিন দিনের প্যাকেজ ব্যবহার করেন। অতএব দুই মোবাইল অপারেটরদের মাসের হিসেবে ১ হাজার ১৮০ টাকা এবং বাংলালিংকের ৫০০ টাকা আয়ের ক্ষেত্রে কোন ব্যত্যয় ঘটে না। তিন দিনের প্যাকেজ অনুযায়ী মাসে ডাটার পরিমাণ ৪০ থেকে ৭০ জিবি পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু যেহেতু এই প্যাকেজে অব্যবহৃত ডাটা যোগ হয় না, সে কারনে ডাটার পরিমাণ ধর্তব্যও নয়। এখানে মুখ্য মাসের শেষে একটি প্যাকেজ থেকে গ্রাহক প্রতি ১ হাজার ১৮০ ও ৫০০ টাকা আয়, যেটা ৩০ দিনের প্যাকেজের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি।

ভয়েস কলেও বাড়তি ব্যয়ের বোঝা

ভয়েস কলে ‘ফ্লোর প্রাইস’ নীতি চালুর আগে গ্রাহকরা প্রতি মিনিট ২৫ পয়সা এমনকি তার চেয়েও কম দামে কথা বলার সুযোগ পেত। বর্তমানে বিটিআরসি’র নীতি অনুযায়ী ৪৫ পয়সার নিচে মোবাইল অপারেটরদের মূল্য নির্ধারণেরই সুযোগ নেই। বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে টেলিটক ছাড়া বাকি তিনটি অপারেটর গড়ে বর্তমানে ১ টাকা ২০ হারে ভয়েস কলের দাম নিচ্ছে। ফলে হাতে স্মার্টফোন না থাকা স্বল্প আয়ের মানুষই সবচেয়ে বেশি ব্যয় করছে ভয়েস কলের জন্য।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে রবি আজিয়াটার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও টেলিযোগাযোগ খাত বিশেষজ্ঞ মাহাতাব উদ্দিন আহমেদ ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ভয়েস কলে এই ‘ফ্লোর প্রাইস’ হচ্ছে মোবাইল টেলিযোগাযোগ শিল্পে প্রাগৈতিহাসিক যুগের একটি ধারণা। দুনিয়ার আর কোথাও এই ফ্লোর প্রাইস নেই। এর ফলে মোবাইল অপারেটররা লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্নআয়ের মানুষ। এই ফ্লোর প্রাইস বাংলাদেশে ডিজিটাল বৈষম্য সৃষ্টিরও প্রধান কারণগুলোর একটি। এটা অবিলম্বে তুলে দেওয়া উচিত।

টেলিযোগাযোগ-নীতি বিশেষজ্ঞ আবু নজম তানভীর হোসাইন ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশের বাজারে প্রতিযোগিতা মূলত তিনটি মোবাইল অপারেটরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ কারণে আইন অনুযায়ী মোবাইল অপারেটরদের ব্যয় বিশ্লেষণ করে ডাটার যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করা উচিত। বর্তমানে যে ফ্লোর প্রাইস নীতি আছে তার কারনে তিনটি মোবাইল অপারেটর বাড়তি অর্থ আদায়ের সুযোগ পাচ্ছে। এটা অবশ্যই পরিবর্তন হওয়া উচিত।

গ্রামীণ ফোনের বক্তব্য

ভিউজ বাংলাদেশের প্রশ্নের জবাবে দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের হেড অব কমিউনিকেশন শারফুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ডেটা খাতে বাড়তি ২৪০০ কোটি টাকা আয় হয়েছে বলে যে দাবি করা হয়েছে, তা কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক বিবরণীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই বাড়তি রাজস্ব আয়ের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বিভ্রান্তিকর। গ্রামীণফোন তাদের ব্যবসা সংক্রান্ত সকল তথ্য নিয়মিতভাবে প্রান্তিক ও বার্ষিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকে। ২০২৫ সালে গ্রামীণফোনের মোট ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিমাণ (টেরাবাইট হিসেবে) গত বছরের (২০২৪ সালের) তুলনায় প্রায় ১২.৪% বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে একই সময়ে মোট ডেটা রাজস্ব মাত্র ২.২% বেড়েছে। এটি এমন এক সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশে ঘটেছে, যেখানে সার্বিক মুদ্রাস্ফীতি ৯%–এরও বেশি ছিল। অর্থনীতির অন্যান্য খাতের মতো মোবাইল সেবার মূল্যও জ্বালানির দাম, অবকাঠামো ব্যয় এবং স্থানীয় করসহ নানা উপাদানের ওপর নির্ভরশীল।

তিনি আরও বলেন, গ্রামীণফোনের মূল লক্ষ্য হলো, দেশের মানুষ যেন তাদের ব্যয়কৃত প্রতিটি টাকার যথাযথ মূল্য পান এবং সবাই সাশ্রয়ী মূল্যে নির্ভরযোগ্য সংযোগ সুবিধা ব্যবহার করতে পারেন। ইন্টারনেটকে সাশ্রয়ী রাখা মানে এই নয় যে বাজারের সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি থেকে সেটিকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখা হবে; বরং লক্ষ্য হলো ইন্টারনেট ও মোবাইল সেবার মূল্যবৃদ্ধি যেন অন্যান্য পণ্যের তুলনায় ধীরগতির হয়, যাতে সংযোগ সবার নাগালের মধ্যে থাকে। এছাড়াও ইন্টারনেটের মূল্য নির্ধারণের প্রবণতা বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে কয়েকটি নির্দিষ্ট প্যাকেজের দিকে না তাকিয়ে সম্পূর্ণ পোর্টফোলিও বিবেচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও গ্রামীণফোন বিটিআরসির নিয়ম মেনে গ্রাহকদের অব্যবহৃত ইন্টারনেট ফরওয়ার্ড করে।

বাংলালিংকের বক্তব্য

এ বিষয়ে বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার তাইমুর রহমান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর নির্ধারিত নীতিমালা ও বিধিবিধান সম্পূর্ণভাবে মেনে বাংলালিংকের সকল কার্যক্রম পরিচালিত হয়। গ্রাহকদের ইন্টারনেট সেবা প্রদানকালে আমরা কমিশনের সকল প্রযোজ্য নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করি। এ বিষয়ে কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর।

রবির বক্তব্য পাওয়া যায়নি

এ বিষয়ে ভিউজ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে রবির চিফ রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স শাহেদ আলমের কাছে বক্তব্য চাওয়া হয়। তবে রবির পক্ষ থেকে শাহেদ আলম কিংবা তার নেতৃত্বে পরিচালিত জনসংযোগ বিভাগের কেউই সাড়া দেননি। গত প্রায় এক বছর ধরেই রবির জনসংযোগ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পেশাদার সাংবাদিকদের যোগাযোগ অনেকটা দূরূহ হয়ে পড়েছে। এ কারণে রবির বক্তব্য যুক্ত করা সম্ভব হলো না। তবে এ প্রতিবেদন প্রকাশের পরও রবির পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য দেওয়া হলে তা গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হবে।


মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ