তৃতীয় টার্মিনাল: ‘টু-পাইসে’র জন্য অপ্রয়োজনীয় ৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প?
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা ও তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের দায়িত্ব যেহেতু বেবিচকের (বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ) হাতে, সে কারণে তাদের নামটাই শিরোনামে এসেছে। কিন্তু এর আগেও একাধিক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ একই ধরনের মূর্খতার ভান করেছে এবং একেবারে শেষ মুহূর্তে সরকারের ওপর মহলের কঠোর নির্দেশে সচেতন হয়েছে। তবে এবার একটু ব্যতিক্রম। কারণ বেবিচকের কর্তা-ব্যক্তিদের সচেতন করতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ব্যয় নির্ধারণ করেছে ৪৮ কোটি টাকা!
এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা একান্ত অপরিহার্য। বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছ থেকে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী লাইসেন্সপ্রাপ্ত মোবাইল অপারেটররা মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলো ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা দেয়। অতএব দেশের প্রধান বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের মূল পরিকল্পনাতেই টার্মিনাল এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক সেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সেবার লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিটিআরসিকে যুক্ত করে তার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এর আগে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রকল্প এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করার বিষয়টিতে শুরুতে গুরুত্ব দেয়নি। পরে যখন বাস্তবতা সামনে চলে এসেছে। তখন এক ধরনের অদ্ভুত আবদার করেছে যেটাকে মুর্খতা কিংবা মুর্খতার ভান বলা যেতে পারে। ঠিক একই ধরনের আবদার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বেবিচক করেছে। সেটা হচ্ছে- প্রকল্প এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করার জন্য ইন্টারনাল বিটিএস (আইবিএস) বসাতে হলে বেবিচকের সঙ্গে অপারেটরদের রাজস্ব ভাগাভাগি করতে হবে কিংবা আগাম এককালীন টাকা দিতে হবে!
বিটিআরসি থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত সব প্রতিষ্ঠানই নিয়ম অনুযায়ী সরকারের সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগি করে, ভ্যাট-ট্যাক্স দেয় ও লাইসেন্স ফি নবায়ন বাবদ টাকা দেয়। লাইসেন্স অনুযায়ী মোবাইল অপারেটররা সারাদেশের প্রতি ইঞ্চি ভূমিতে মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা দেওয়ার জন্য দায়বদ্ধ। অতএব এটা তাদের লাইসেন্স প্রদত্ত এখতিয়ারও- যেখানে নেটওয়ার্ক স্থাপনের প্রয়োজন হবে, সেখানে মূল বিটিএস কিংবা ইন্টারনাল বিটিএস বসানো হবে। যে স্থানে বসানো হচ্ছে সেটা যেকোনো কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারেই থাকুক না কেন, মোবাইল অপারেটরদের সেই সহায়তা নিশ্চিত করাও তাদের দায়িত্ব। এক্ষেত্রে নতুন করে রাজস্ব ভাগাভাগির আবদার একেবারে পাড়ার মস্তানদের চাঁদাবাজির মতোই! যেমন ঢাকার বিভিন্ন হাউজিং সোসাইটির ভেতরে মোবাইল টাওয়ার বসাতে গেলে, এমনকি আইএসপিরা সংযোগ দিতে গেলেও হাউজিং সোসাইটি কর্তৃপক্ষ সরাসরি সার্ভিস ফি’র নামে চাঁদা চায়!
দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, এই সামান্য সত্যটি আগে যেমন পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেল বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ বুঝতে চায়নি, এবার বেবিচকও বোঝেনি। এসব কর্তৃপক্ষে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আছেন, তারা অবশ্যই যেকোনো বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান রাখেন। তাদের মূর্খ বলার ধৃষ্টতা কেউেই দেখাতে পারে না। অতএব এটা তাদের মূর্খতার ভান বলতে পারি। আর সেটা কিছুটা ফাও টু-পাইস কামানোর একটা গোপন ইচ্ছা থেকেও হতে পারে!
সেই গোপন ইচ্ছা এবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের ক্ষেত্রে বেশ প্রকাশ্য হয়ে গেছে। তবে এই প্রকাশ্য কার্যক্রমে বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে সামনে এসেছে টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড এবং উদ্যোগী মন্ত্রণালয় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। তৃতীয় টার্মিনালে উচ্চগতির মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপনের জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে ৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এই প্রকল্প সম্পূর্ণ সরকারের অর্থায়নেই বাস্তবায়িত হবে অর্থাৎ জনগণের টাকায়। অথচ প্রকল্পের শুরু থেকে মোবাইল অপারেটররা প্রকল্প এলাকায় নেটওয়ার্ক স্থাপনের জন্য অনুমতি চেয়েছে। অনুমতি পেলে তারা নিজেদের টাকাতেই আইবিএস বসিয়ে নিতো প্রয়োজন অনুযায়ী। আর আইএসপিদের দিয়ে প্রকল্প এলাকায় উচ্চগতির ওয়াইফাই হাবও স্থাপন করা যেত। এক্ষেত্রে বিটিসিএল এরও বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ ছিল। এখানে সরকারি ব্যয়ে পৃথক প্রকল্প গ্রহণের কোনো দরকারই নেই।
অথচ নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতি স্থাপনের জন্য বেবিচক প্রথমে উল্টো রেভিনিউ শেয়ারিং দাবি করে, সেটা নিয়ে বিটিআরসির সঙ্গে চিঠি চালাচালিও হয়। এখন শেষ মুহূর্তে এসে টেলিটককে দিয়ে ছয় মাস মেয়াদের ৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে নেটওয়ার্ক যন্ত্রিপাতি, মূলত আইবিএস কেনার জন্য। সরকারি ব্যয়ে কেনাকাটার প্রকল্পে মজাদার ‘টু-পাইস’ এ দেশে ওপেন সিক্রেট। সম্ভবত, সেই মজার স্বাদ নেওয়ার জন্যই এই ৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প!
এখানে টেলিটক যন্ত্রপাতি বসাবে, সবাই সেটা ব্যবহার করবে। সেটা ব্যবহারের জন্য নিশ্চয় একটা ফি’ও ধরা হবে! বিষয়টি অযৌক্তিক এবং অনৈতিকও বটে! এতে কি অন্য মোবাইল অপারেটররা রাজী হবে? যদি মোবাইল অপারেটররা রাজী না হয় তাহলে কি হবে? মোবাইল নেটওয়ার্ক ছাড়া একটি টার্মিনাল পরিচালনা সম্ভব? ধরে নিলাম বেবিচক ফ্রি ওয়াইফাই দিয়ে নেটওয়ার্ক পরিচালনার চিন্তা করল, সেই ওয়াইফাই টার্মিনাল ব্যবহারকারী অনেক মানুষ ব্যবহার নাও করতে পারেন। কারণ ওপেন ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক ব্যবহারে নিরাপত্তা ঝুঁকি একটা বড় ইস্যু। আর ডিরেক্ট ভয়েস কলের ক্ষেত্রে কি হবে? গ্রামে থাকা আত্মীয়-স্বজনরা তো এখনও ডিরেক্ট ভয়েস কলের ওপর নির্ভরশীল, তাদের সার্ভিস দেবেন কীভাবে? কেন বিষয়গুলো কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখে না?
এখনও সরকার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। নিয়ম অনুযায়ী বিটিআরসির মাধ্যমে মোবাইল অপারেটরদের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্প এলাকায় আইবিএস বসানোর জন্য নির্দেশনা দিতে পারে। মোবাইল অপারেটররা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী আবিএস এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ডিভাইস স্থাপন করবে। টেলিটক তার প্রয়োজন অনুযায়ী স্থাপন করবে। তাহলে ৪৮ কোটি টাকা অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প নেওয়ারও দরকার হবে না, নতুন জটিলতা সৃষ্টি হবে না।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে