Views Bangladesh Logo

তাহলে বিটিআরসির কর্মকর্তারা বেতন নেন কেন?

Rased Mehedi

রাশেদ মেহেদী

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০২ সালের ৩১ জানুয়ারি। গুলশান-১ নম্বরের ১৩৫ নম্বর সড়কের ‘স্টাইল নাহার’ ভবনে ছিল এর প্রথম অফিস। বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সংস্থাপন সচিব সৈয়দ মারগুব মোর্শেদ ছিলেন এর প্রথম চেয়ারম্যান। তখন আমি দৈনিক সংবাদে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করি। বিটিআরসির কাজ শুরুর সম্ভবত এক মাস পর আমাকে পাঠানো হলো নতুন বিটিআরসি ভবনে। নতুন এই কমিশন সম্পর্কে পুরো খোঁজ নিতে বলা হলো। এই কমিশন কী ধরনের দায়িত্ব পালন করবে, টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে—এ ধরনের কয়েকটি বিষয় সংবাদের তৎকালীন চিফ রিপোর্টার কাশেম হুমায়ুন ভাই এক টুকরো কাগজে লিখে দিয়ে অ্যাসাইনমেন্টে পাঠালেন।

প্রথম দিনেই চেয়ারম্যান সৈয়দ মারগুব মোর্শেদের সঙ্গে কথা হলো। তিনি ২০০১ সালের টেলিযোগাযোগ আইনের কয়েকটি ধারা তুলে ধরে বিটিআরসি গঠনের তাৎপর্য তুলে ধরলেন। দীর্ঘ দুই যুগ পর খুব বেশি কিছু আর মনে নেই। তবে এটা মনে আছে, তিনি বলেছিলেন, ‘বিটিআরসির মূল কাজ হবে টেলিযোগাযোগ খাত–সম্পর্কিত নীতি তৈরি করা এবং সেই নীতি অনুযায়ী খাতের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা তদারকি করা।’ আরও একটা কথা মনে আছে। তিনি বলেছিলেন, সামনের দিনগুলোতে নতুন প্রযুক্তির বিপুল বিকাশের সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে, সে কারণে টেলিযোগাযোগ খাত হয়ে উঠবে দেশের অগ্রগতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত। এ কারণে নতুন এই স্বাধীন কমিশন নতুন নতুন নীতি তৈরি করবে এবং লাইসেন্স কাঠামোর মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ খাতের দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি করবে।

বিটিআরসির সেই প্রথম কমিশনের অন্যান্য কমিশনার কারা ছিলেন, সেটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। সে সময়ের দু-একটি নোট নানাভাবে খুঁজে পেতে দুজনের নাম পেলাম। পরে বিটিসিএলের সাবেক এক কর্মকর্তার সৌজন্যে পুরো কমিশনের সব সদস্যের নাম পেলাম। যদিও এই কর্মকর্তা স্মৃতি থেকে বলেছেন, এদিক-সেদিক হলে একটু চেক করে নিতে বলেছেন। আমি সে সময়ের পরিচিত আরও দু-একজনের সঙ্গে কথা বলে নিচের নামগুলো সম্পর্কেই নিশ্চিত হলাম।

হয়তো কমিশনের সবার নাম এই নিবন্ধের জন্য জরুরি নয়। কিন্তু বিটিআরসির ঐতিহাসিক যাত্রার শুরুর ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের সাংবাদিক বন্ধুদের সামনে তুলে ধরতেই নামগুলো দিচ্ছি। প্রথম ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন এফ কিউ এম ফারুক। অন্য তিনজন কমিশনার ছিলেন এ এফ এম নাজমুল হোসেন চৌধুরী, খন্দকার মো: আবু বকর এবং মুহম্মদ রেজাউল হক।

আসলে বিটিআরসির ওয়েবসাইট থেকেই এর ইতিহাস–সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য পাওয়ার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, তাদের ওয়েবসাইটে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, সেখানে ‘বিটিআরসি সম্পর্কিত’ ট্যাবে কমিশনের অর্জনসমূহ অংশে ক্লিক করে দেখা গেল শুধু ২০১৬-২০২১ সাল পর্যন্ত অর্জনের একটা পিডিএফ ফাইল আছে। সেটা হালনাগাদ করার তারিখ লেখা আছে ১৭ অক্টোবর ২০২৩। বুঝতেই পারছেন, এরপর আর বিটিআরসির ওয়েবসাইট হালনাগাদ হয়নি এবং এই সাইটে গেলে নতুন একজন ভিজিটর ধরেই নেবেন, ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের সময়সীমার বাইরে কিংবা আগে-পরে বিটিআরসির উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন ছিল না! আবার দেখুন, ওয়েবসাইটটির বাংলা-ইংরেজি দুটো ভার্সন আছে। কিন্তু ‘ভিশন ও ইতিহাস’ অংশ শুধু ইংরেজিতে আছে। আপনি ওপরে বাংলা বা ইংরেজি যে ভার্সনেই যান না কেন, কনটেন্ট পাচ্ছেন ইংরেজিতে। ইতিহাস অংশে বিটিআরসির যাত্রা শুরুর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নেই।

বিটিআরসি তার নিজস্ব ওয়েবসাইটে কোন কোন তথ্য প্রকাশ করবে, সেটা একান্তই বিটিআরসি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত, আমি এ নিয়ে কথা বলব না। কিন্তু বাংলা ও ইংরেজি দুটো ভার্সন থাকার পরও সাইটে শুধু এক ভাষায় ‘ভিশন ও ইতিহাস’ অংশের কনটেন্ট প্রকাশ পুরো সাইটকে ‘আনস্মার্ট’ হিসেবে তুলে ধরে। এই ‘ভিশন ও ইতিহাস’ অংশ সর্বশেষ হালনাগাদ করা হয়েছে ২০১৬ সালের ১৭ নভেম্বর। এরপর বিটিআরসির কোনো পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা সম্ভবত এ অংশটি কখনো ক্লিকই করেননি! সাংগঠনিক কাঠামো অংশে গেলে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম অক্ষরে লেখা অদ্ভুত এক দৃশ্য চোখে পড়ে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সেখানে ম্যাগনিফাইং বাটনে ক্লিক করলে সেটা কাজ করে না!

দেখলাম একটা ফটো গ্যালারিও আছে। সেখানে শুধু বর্তমান টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টার বিটিআরসি কার্যালয় পরিদর্শনের একটিমাত্র ছবি আছে। অথচ এর মধ্যে বিটিআরসিতে সাংবাদিকদের উপস্থিতিতেই অনেকগুলো আলোচনা সভা, সেমিনার হয়েছে। অনেকগুলোতে বিটিআরসির চেয়ারম্যান প্রধান অতিথি ছিলেন। একটিরও তথ্য বা ছবি সেখানে নেই! সাইটে একটা ‘প্রেস কর্নার’ থাকলে সাংবাদিকেরা অনেক তথ্যই এখানে পেয়ে যেতেন। সেখানে দৈনন্দিন অনেক তথ্য পাওয়া সম্ভব হতো।

আমি কোনো দেশের সঙ্গে তুলনা করব না। কিন্তু এটা অত্যন্ত পরিষ্কার ও স্পষ্ট যে, বিটিআরসির মতো একটি সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট অত্যন্ত দায়সারাভাবে পরিচালিত হয়। এর হোমপেজের লুকও আধুনিক সময়কে নয়, বরং ইতিহাসের কোনো এক বিবর্ণ পাতার প্রতিচ্ছবি যেন! একটি ওয়েবসাইট এখন সেই প্রতিষ্ঠানের চেহারাকেই সামনে নিয়ে আসে। অতএব প্রশ্ন উঠতেই পারে, বিটিআরসির সাইটের এই রুগ্‌ণ চেহারা কেন? বর্তমান সময়ে সবচেয়ে প্রাজ্ঞ ও স্মার্ট মানুষদের একাংশ তো বিটিআরসির কর্মকর্তারাই। তাদের মাধ্যমে পরিচালিত ওয়েবসাইটের এই আনস্মার্ট চেহারা কি মেনে নেওয়া যায়?

আসলে বিটিআরসি যাত্রা শুরুর পর থেকে নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর কখনোই দাঁড়ায়নি। বিটিআরসি মূলত প্রেষণে আসা কর্মকর্তাদের সংস্থা। একজন কর্মকর্তা প্রেষণে আসেন, তার জায়গায় স্থির হতে না হতেই বদলি হন। নতুন প্রেষণ কর্মকর্তা আসেন, তিনি আবার নতুন করে শুরু করেন। প্রেষণে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের আরও একটা বিষয় হলো, প্রেষণে আসা কর্মস্থলে তারা খুব বেশি দায়বদ্ধতা অনুভব করেন না, কারণ তার ফিরে যাওয়ার নিশ্চিত জায়গা আছে। তাদের অনেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নির্ভর করেন এর-ওর কাছ থেকে পাওয়া ভাসা ভাসা তথ্যের ওপর। আবার কেউ কেউ আসেন কোনো কোম্পানি কিংবা গোষ্ঠীর স্বার্থ উদ্ধারের জন্য।

আসলে অতিরিক্ত প্রেষণ কর্মকর্তা–নির্ভর প্রতিষ্ঠান সব সময়ই ভেতর থেকে দুর্বল হয়, বিটিআরসির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। বিটিআরসির নিয়মিত কার্যক্রম হচ্ছে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন নীতিমালা তৈরি করা। অথচ আমরা পত্রিকায় দেখলাম, বিটিআরসির কর্মকর্তারা সেই নিয়মিত কার্যক্রমকে গবেষণা ও বিশেষ কাজ দেখিয়ে সম্মানি বাবদ অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করছেন। বিটিআরসির ভবনের মিলনায়তনে বসে অফিসের নিয়মিত কার্যক্রমের জন্য কোনো সভা বা বৈঠকে উপস্থিত থাকার জন্য কেন সম্মানি নেওয়া হবে? পত্রিকার প্রতিবেদনে দেখলাম, নীতিমালা তৈরির এই কাজকে তারা বিশেষায়িত কাজ বলছেন। এখন আমজনতার প্রশ্ন হচ্ছে, বিটিআরসির কর্মকর্তারা তাহলে বেতন নেন কেন? কোন অংশের জন্য বেতন, আর কোন অংশের জন্য উচ্চ হারে সম্মানি—সেটার ব্যাখ্যা বিটিআরসির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে আসা উচিত। শুধু বিটিআরসি নয়, টেলিযোগাযোগ খাতে যত রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি আছে, সবগুলোর বোর্ড-মিটিংয়ের ক্ষেত্রেই উচ্চ হারে সম্মানির ব্যবস্থা আছে। অবৈতনিক কোনো বোর্ড সদস্য হলে তিনি সম্মানি পেতে পারেন, কিন্তু বেতনভুক্তরা কেন সম্মানি নেবেন?

এটা বলা হয় যে, বিটিআরসির প্রেষণে নিয়োজিত কর্মকর্তারা না থাকলে বিটিআরসির যে ক’জন নিজস্ব কর্মকর্তা আছেন, তাদের বেপরোয়া আচরণ ও অনিয়ম চরমে পৌঁছে যেত! আবার এটাও প্রশ্ন ওঠে, বিটিআরসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের কজন সত্যিকার অর্থে সময়ের তুলনায় যোগ্য? কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, প্রেষণে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারাই বা কতটা যোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছেন? তারা যোগ্যতার পরিচয় দিলে মোবাইল হ্যান্ডসেটের ক্ষেত্রে এনইআইআর বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এমন লেজেগোবরে অবস্থা হলো কেন? যেকোনো নীতি বাস্তবায়ন নিয়ে লাইসেন্সপ্রাপ্ত সব পক্ষের সেবাদাতার মধ্যে অসন্তোষ কেন? মোবাইল অপারেটরদের সেবার মান নিয়ে গ্রাহকের তীব্র অসন্তোষ কেন? আইএসপির সেবার ক্ষেত্রে মাস্তানতন্ত্র এবং লাইসেন্সবিহীন অবৈধ ব্যবসায়ীদের দাপটের কাছে বিটিআরসি অসহায় কেন?

প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, বিটিআরসি সাংগঠনিকভাবে যথেষ্ট সংগঠিত প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠেনি। এটা সরকারগুলোরও বড় দায়। কারণ বিটিআরসি শুরুতে স্বাধীন কমিশন ছিল, এখন নেই। সৈয়দ মারগুব মোর্শেদের মতো একজন অসাধারণ দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তার নেতৃত্বে যে কমিশনের দৃঢ় যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০০৫ সালে সেই কমিশনকেই প্রায় অকার্যকর করে ফেলা হয় সাবেক সচিব ওমর ফারুককে চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়ে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তার মুখে একাধিকবার শুনেছি, ‘আমি টেকনোলজির লোক না, এসব বিষয় আমি বুঝি না, আমাকে এভাবে প্রশ্ন করবেন না।’ তার সময়ে বিটিআরসির নিয়মিত কোনো কার্যক্রমই ছিল না। কয়েকজন কর্মকর্তাও হতাশ হয়ে অফিসে বসে থাকতেন।

এরপর বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০১ সালের আইনে অপ্রয়োজনীয় সংশোধন এনে বিটিআরসিকে আর স্বাধীন কমিশন রাখা হয়নি। সেই সংশোধন নিয়ে মন্ত্রণালয়-বিটিআরসির দ্বন্দ্ব দিন দিন প্রকট হয়েছে, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীতি প্রণয়নের কাজটি হয়নি। এরপর বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত ৫ ফেব্রুয়ারি (জাতীয় নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে) ২০০১ সালের আইনের সংশোধনীসহ অধ্যাদেশ জারি করে বিটিআরসিকে কার্যত মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি অধিদপ্তরে পরিণত করা হয়েছে। অতএব এই বিটিআরসিতে কর্মকর্তারা আর কী করবেন? যে কয় দিন দায়িত্বে আছেন, যত উপায়ে কিছু বাড়তি উপার্জন করা যায়, সেটাই তো লাভ?

এখনো সময় আছে। বিটিআরসির মতো প্রতিষ্ঠানকে সত্যিকারের কার্যকর প্রতিষ্ঠান করে তোলার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। বিটিআরসি দায়িত্ব পালনে যেমন স্বাধীন থাকবে, তেমনি জবাবদিহি নিশ্চিতেরও উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকবে। বিটিআরসি এখনকার মতো ধুঁকে ধুঁকে চললে তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় এখন যে বিশাল জোয়ার চলছে, সেখানে আমাদের নিতান্তই খড়কুটো হয়েই ভাসতে হবে—একটা ডিঙি নৌকা ভাসানোর সুযোগও আমরা পাব না।

রাশেদ মেহেদী, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত বিশ্লেষক, সম্পাদক, ভিউজ বাংলাদেশ

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ