Views Bangladesh Logo

‘কারিডোরে’ পৃথিবী জুড়ছে পথ, আমরা খুঁজছি দিশা

পৃথিবীর মানচিত্র মেলে ধরলে এখন মনে হয়, বড়সড় একটি বাড়িতে মেরামতের কাজ চলছে। কেউ পাহাড় কেটে রেল বসাচ্ছে, কেউ মরুভূমিতে সড়ক টানছে, কেউ বন্দরের সঙ্গে বন্দর জুড়ছে। চীন ইউরোপে পৌঁছানোর পথ বাড়াচ্ছে, ভারত আরব উপদ্বীপ হয়ে পশ্চিমে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। কাজাখস্তান, তুরস্ক, লাওস—সবাই নিজের উঠান দিয়ে বাণিজ্যের চলাচল বাড়াতে ব্যস্ত। বাংলাদেশ বসে আছে এমন এক মোড়ে, যার চারদিকে সম্ভাবনা। শুধু আমাদের যাত্রার ঠিকানাটি এখনও পরিষ্কার নয়।

ভূগোল আমাদের কম দেয়নি। পাশে ভারতের বিশাল বাজার, কাছে নেপাল ও ভুটান, পূর্বে মিয়ানমার হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এমন অবস্থান পেলে ব্যবসায়ী প্রথমে দোকান খোলার কথা ভাবেন। আমরা অনেক সময় জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্য দেখি। কিন্তু মানচিত্রে সুবিধাজনক জায়গায় থাকলেই বাণিজ্য এসে দরজায় কড়া নাড়ে না। তাকে ডাকার ব্যবস্থা করতে হয়; দরজা খুলে বসার জায়গাও দিতে হয়।

একসময় বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিযোগিতার ছিল কার শ্রমিক সস্তা, কার উৎপাদন খরচ কম। এখন সঙ্গে যোগ হয়েছে সীমান্ত পার হতে কত সময় লাগে, বন্দরে পণ্য কতক্ষণ পড়ে থাকে, ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে কত দিন যায়। কারখানায় সাশ্রয় করা টাকা যদি বন্দরের অপেক্ষায় খরচ হয়ে যায়, সস্তা শ্রমের গর্বে লাভ নেই।

মধ্য এশিয়ার ‘মিডল করিডোর’ এই বদলে যাওয়া হিসাবের উদাহরণ। চীন থেকে কাজাখস্তান, কাস্পিয়ান সাগর, আজারবাইজান ও জর্জিয়া হয়ে ইউরোপমুখী সংযোগ উন্নত করার চেষ্টা চলছে। এসব দেশ নতুন ভূগোল পায়নি; পুরোনো ভূগোলের ব্যবহার বদলাচ্ছে। তারা বুঝেছে, অন্যের পণ্য নিজের ভূখণ্ড দিয়ে গেলে শুধু পরিবহন আয় হয় না। গুদাম, প্রক্রিয়াজাতকরণ, ব্যাংক, বীমা এবং নতুন ব্যবসার সুযোগও তৈরি হয়।

তুরস্কও ইউরোপ ও এশিয়ার মাঝখানের অবস্থানকে বাণিজ্যিক শক্তিতে রূপ দিতে চায়। লাওস সমুদ্রবিহীন হওয়ার অসুবিধা কাটাতে চীন-লাওস রেলপথকে কাজে লাগাচ্ছে। থাইল্যান্ড দুই সমুদ্রের মধ্যে স্থলসংযোগের সম্ভাবনা নিয়ে হিসাব করছে। সবার প্রকল্প সমান সফল নয়, সব পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত হয়নি। কিন্তু তাদের আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট: নিজের অবস্থান থেকে কীভাবে বেশি আয় করা যায়।

ভারত একাধিক দরজা খোলা রাখার কৌশল নিয়েছে। পশ্চিমে ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোরের পরিকল্পনা, ইরানের চাবাহার ঘিরে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় প্রবেশের চেষ্টা; পূর্বে ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড মহাসড়ক এবং কালাদান প্রকল্প। নিরাপত্তা, অর্থায়ন ও রাজনৈতিক বাধা রয়েছে। তবু বিকল্প পথের অনুসন্ধান থামেনি। প্রতিবেশী কখন সদয় হবে, সেই আশায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বারান্দায় বসে চা খায় না।

পাকিস্তানের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরেও ঋণ, নিরাপত্তা ও বাস্তবায়নের সংকট আছে। গোয়াদরের স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে যথেষ্ট দূরত্ব। ফলে করিডোরের নাম ঘোষণা করলেই সমৃদ্ধি আসে, এমন সিদ্ধান্ত ভুল। বাংলাদেশের শিক্ষা হওয়া উচিত সাফল্য ও ব্যর্থতা দুটো থেকেই। কোন পথে যাব, তার পাশাপাশি কত খরচে যাব, কী পাব এবং ঝুঁকি কে বহন করবে—সেই হিসাবও চাই।

বাংলাদেশের হাতে কিছুই নেই, এমন কথা বলাও অন্যায়। সড়ক, সেতু, রেল, নৌপথ ও বন্দর আছে; আঞ্চলিক সংযোগের উদ্যোগও রয়েছে। সমস্যা হলো, এসবকে আমরা প্রায়ই আলাদা প্রকল্প হিসেবে দেখি। একটি সেতুর উদ্বোধন হয়, একটি সড়কের কাজ এগোয়, একটি বন্দরের পরিকল্পনা আসে। কিন্তু সব মিলিয়ে কোন বাজারের সঙ্গে কোন শিল্পকে যুক্ত করব, সেই সামগ্রিক ছবিটি অস্পষ্ট থেকে যায়।

আমাদের লক্ষ্য হতে পারে নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য কার্যকর সমুদ্রদ্বার হওয়া। হতে পারে আঞ্চলিক উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণের কেন্দ্র হওয়া। সে জন্য শুধু অন্যের গাড়ি চলার অনুমতি যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান কত কাজ পাবে, শ্রমিকের কত কর্মসংস্থান হবে, স্থানীয় শিল্প কত নতুন ক্রেতা পাবে—এসবকে চুক্তি ও পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে।

করিডোর নিয়ে আমাদের বিতর্ক অবশ্য দ্রুত টোলের ঘরে ঢুকে পড়ে। কত টাকা পাওয়া গেল, কে রাস্তা ব্যবহার করল—এসব জরুরি হিসাব। কিন্তু দোকান খুলে শুধু দরজার প্রবেশমূল্য গুনলে ব্যবসা বড় হয় না। পণ্য এখানে সংরক্ষিত হলে, প্রক্রিয়াজাত হলে, বাংলাদেশের ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠান যুক্ত হলে, স্থানীয় সরবরাহকারী কাজ পেলে সংযোগের অর্থনৈতিক মূল্য বাড়ে। টোল তখন বড় আয়ের একটি ছোট অংশ।
এই সুবিধা আপনা থেকে জন্মাবে না। দরকার নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, দক্ষ শ্রমিক, বিনিয়োগের নিশ্চয়তা, সহজ শুল্কপ্রক্রিয়া ও সময়মতো পণ্য খালাস। সীমান্তে একই তথ্য বারবার জমা দিতে হলে দ্রুতগামী ট্রেনেরও লাভ কমে যায়। পণ্য ঘণ্টায় যত গতিতে চলুক, কাগজ যদি টেবিলে হাঁটু গেড়ে বসে থাকে, গন্তব্য পিছিয়েই যাবে। অবকাঠামোর সঙ্গে প্রশাসনের গতিও বাড়াতে হবে।

তাই প্রয়োজন বাস্তবসম্মত জাতীয় করিডোর কৌশল। কোন পণ্য কোথা থেকে আসবে, কোথায় মূল্য সংযোজন হবে, কোন পথে বন্দরে পৌঁছাবে—তার নির্দিষ্ট পরিকল্পনা চাই। নেপাল-ভুটান সংযোগকে বৈঠকের কাগজ থেকে নিয়মিত পণ্য পরিবহনে আনতে হবে। বিমসটেকের সহযোগিতাও সম্মেলনের ছবি ছাড়িয়ে কার্যকর ব্যবস্থায় নামাতে হবে। মিয়ানমারের অনিশ্চয়তা বিবেচনায় রেখে পূর্বমুখী সংযোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি রাখতে হবে।

এর সঙ্গে দরকার ধারাবাহিক কূটনীতি। সরকার বদলালে বাণিজ্যের গন্তব্য বারবার বদলাতে থাকলে বিনিয়োগকারী নিশ্চিন্ত হন না। প্রতিবেশীর সঙ্গে সহযোগিতায় বাংলাদেশের স্বার্থ, নিরাপত্তা ও ন্যায্য আয় নিশ্চিত করতে হবে সুস্পষ্ট শর্তে। আবেগ দিয়ে সম্পর্কের বক্তৃতা লেখা যায়; পণ্যের সময়সূচি চলে নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থায়। বিদেশি অংশীদারও জানতে চাইবে, আজ যে নিয়মে পণ্য পাঠাল, আগামীকাল সেই নিয়ম থাকবে কি না।

সিল্ক রুটের কাফেলা যেখানে থামত, সেখানে সরাইখানা, বাজার ও কারিগরের পাড়া গড়ে উঠত। আজ কাফেলার জায়গায় কনটেইনার এসেছে, অর্থনীতির মূল সূত্র বদলায়নি। পথের পাশে কাজ ও বাজার তৈরি করতে হয়। বাংলাদেশের সামনে তাই কাজ শুধু আরও রাস্তা বানানো নয়; তৈরি রাস্তার সঙ্গে জীবিকার সম্পর্ক গড়া। সবচেয়ে ভয়ংকর হলো রাস্তা না থাকা নয়, গন্তব্যের সিদ্ধান্ত না থাকা। মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকলে সব গাড়িই দেখা যায়। কেবল নিজের যাত্রাটি শুরু হয় না।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ