চিপ যুদ্ধের গল্প: পর্ব-১৯
হুয়াওয়ের উত্থান
হুয়াওয়ের প্রতিষ্ঠাতা রেন ঝেংফেইকে দেখলে প্রথমটায় তাঁকে সিলিকন ভ্যালির শান্ত-স্বভাবের কোনো নির্বাহীর মতোই মনে হয়। কিন্তু তাঁর কোম্পানির বৈশ্বিক প্রভাব এই সরল চেহারার থেকে অনেক গুণ বড়। বিশ্বের অসংখ্য দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক - যা আমাদের প্রতিদিনকার ভয়েস কল, মেসেজ আর ডেটা বহন করে - তার বিরাট অংশই দাঁড়িয়ে আছে হুয়াওয়ের ইকুইপমেন্টের ওপর। বহু জায়গায় হুয়াওয়ের নেটওয়ার্ক ব্যবহার না করে মোবাইল ফোনের সেবা পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
কিন্তু চীনের আলিবাবা বা টেনসেন্টের মতো কোম্পানির চেয়ে হুয়াওয়ের সাফল্যের কাহিনি অনেকটাই দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং-এর মতো। স্যামসাং প্রতিষ্ঠাতা লি বিয়ং-চুল তাঁর কোম্পানিকে দাঁড় করিয়েছিলেন তিনটি কৌশল কাজে লাগিয়ে: শক্তিশালী রাজনৈতিক যোগাযোগ, পশ্চিমা প্রযুক্তির অনুকরণ - তবে সস্তায় উন্নত পণ্য তৈরি, আর বৈশ্বিক বাজারে আগ্রাসী সম্প্রসারণ। রেন ঝেংফেইও ঠিক একই পথে হেঁটেছেন।
রেন ঝেংফেই-এর জন্ম গুয়েইজো প্রদেশের এক গ্রামীণ পরিবারে। শিক্ষক বাবা-মায়ের সন্তান তিনি। প্রকৌশল ডিগ্রি লাভের পর তিনি চীনা সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন। এরপর ১৯৮০-এর দশকে তিনি শেনজেনে পাড়ি জমান, যে শহরটি তখন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছিল।
মাত্র ৫,০০০ ডলারের মতো সামান্য পুঁজি নিয়ে রেন তাঁর ব্যবসা শুরু করেন। শুরুতে হংকং থেকে টেলিকম সুইচ আমদানি করলেও, সরবরাহকারীরা যখন দেখল রেন ভালো লাভ করছেন, তারা সরবরাহ বন্ধ করে দিল। এই পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে রেন নিজেই সুইচ বানানোর সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতেই হুয়াওয়ের কয়েকশ’ প্রকৌশলী টেলিকম সরঞ্জাম তৈরিতে কাজ করছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন ভয়েস কমিউনিকেশন ডিজিটাল ডেটার সঙ্গে মিশে গেল, হুয়াওয়েও সেই পরিবর্তনের তালে তাল মিলিয়ে দ্রুত এগিয়ে চলল।
হুয়াওয়ের এই দ্রুত উত্থান অবশ্য বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। তাদের বিরুদ্ধে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন বা ‘ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি (আইপি)’ চুরির অভিযোগ বারবার উঠেছে। ২০০৩ সালে হুয়াওয়ে নিজেই স্বীকার করে নেয় যে, তাদের একটি রাউটারের কিছু কোড সিসকোর কোডের অনুলিপি ছিল। তবে শুধু আইপি চুরি করে এত বড় সাম্রাজ্য তৈরি করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ উৎপাদন, বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দাম, শক্তিশালী গ্রাহক পরিষেবা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গবেষণা ও উন্নয়নে বিশাল বিনিয়োগ। হুয়াওয়ে প্রতি বছর প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করে গবেষণা ও উন্নয়নে, যা অ্যামাজন বা গুগলের মতো বৈশ্বিক কোম্পানির সমতুল্য।
রেন ঝেংফেই দ্রুতই বুঝতে পারেন, কেবল প্রযুক্তি নয়, উন্নত ব্যবস্থাপনার জ্ঞানও সফলতার চাবিকাঠি। ১৯৯৭ সালে তিনি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে আমেরিকায় এইচপি, আইবিএম ও বেল ল্যাবসের মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানি পরিদর্শনে যান। এরপর ১৯৯৯ সাল থেকে তাঁরা আইবিএম-এর কনসালটিং টিমকে ভাড়া করে এনে নিজেদের সাপ্লাই চেইন, মার্কেটিং কৌশল ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো পুরোপুরি ঢেলে সাজান। একসময় তো ১০০ জন আইবিএম কর্মী হুয়াওয়ের ভেতরে বসেই কাজ করত! রেন পশ্চিমে শেখা এই আধুনিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির সঙ্গে নিজস্ব সামরিক-ধাঁচের কড়া অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতির সফল সম্মিলন ঘটান।
হুয়াওয়ে চীনা সরকারের কাছ থেকেও বিশেষ সুবিধা পেয়েছে। শেনজেন নগর প্রশাসনের সস্তা জমি, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে বিশাল ঋণ এবং কর-ছাড় তাদের শক্তি জুগিয়েছে। 'ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল'-এর এক রিপোর্ট অনুযায়ী, হুয়াওয়ে প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ সরকারি সুবিধা লাভ করেছে। রেন-এর সামরিক বাহিনীতে কাজ করার অতীত, কোম্পানির অস্বচ্ছ মালিকানা এবং কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই হুয়াওয়েকে সন্দেহের চোখে দেখে আসছে। তবে এটি স্পষ্ট যে, হুয়াওয়ের সাফল্য চীনের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে নিঃসন্দেহে শক্তিশালী করেছে।
মার্কিন সতর্কতার মাঝেও হুয়াওয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিমা টেলিকম কোম্পানিগুলো একে একে পিছিয়ে যেতে থাকে। নরটেল দেউলিয়া হলো, আর আলকাটেল-লুসেন্টকে কিনে নিল নকিয়া। এরপর হুয়াওয়ে স্মার্টফোন বাজারে ঢুকে পড়ে এবং ২০১৯ সালের মধ্যেই স্যামসাংয়ের পরেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্মার্টফোন নির্মাতা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে।
২০১০-এর দশকে এসে হুয়াওয়ে কেবল ফোন তৈরি না করে, নিজেদের জন্য চিপ ডিজাইনও শুরু করে। তারা বুঝতে পারে, বিদেশি সরবরাহকারীর ওপর, বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টরের মূল উপাদানগুলোতে, অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বিপজ্জনক। এই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নেয় তাদের চিপ ডিজাইন শাখা ‘হাইসিলিকন’। এই শাখা দ্রুতই বিশ্বমানের স্মার্টফোন প্রসেসর ডিজাইন করতে থাকে, যা মার্কিন-প্রভাবিত চিপ ডিজাইন শিল্পের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
(ক্রিস মিলারের সাড়াজাগানো বই ‘চিপ ওয়ার’-এর ৪৬তম অধ্যায় “দ্য রাইজ অফ হুয়াওয়ে” থেকে পরিবর্তিত ও সংক্ষেপিত অনুলিখন)
লেখক পরিচিতি: মাহমুদ হোসেন, বুয়েটের একজন স্নাতক, বাংলাদেশের টেলিকম ও আইসিটি খাতে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশের মোবাইল প্রযুক্তি প্রচলনের সময়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বিটিআরসি’র কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, এর আগে তিনি বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে ঊর্ধ্বতন পদে কর্মরত ছিলেন।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে