Views Bangladesh Logo

চার খুনের রাত, রংপুরের সেই বাড়িতে সেদিন কী ঘটেছিল?

Masum   Hossain

মাসুম হোসেন

রংপুরের দাসপাড়া গ্রামে একই পরিবারের চার সদস্য খুন হওয়ার পরও যেন নীরব পুরো পাড়া। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একটি বাড়িতে চারজন মানুষ খুন হলেন, অথচ পাশের বাড়ির বাসিন্দারা বলছেন—তাঁরা কিছুই জানেন না, কোনো চিৎকারও শোনেননি।

নিহতরা হলেন গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী এবং ছেলে আয়ুষ চক্রবর্তী প্রীয়ম। পুলিশ জানায়, শুক্রবার (২১ আগস্ট) সকাল ৬টার দিকে তাঁদের হত্যা করা হয়। একই এলাকার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাঁরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে পুলিশের দাবি। পরে ২২ আগস্ট রাত ১১টার দিকে কামালকাছনা মাছুয়াপাড়ার (দাসপাড়া) গণপতির বাড়ি থেকে লাশগুলো উদ্ধার করা হয়।

শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেলে দাসপাড়া গ্রামে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও কেউই এ বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি।

গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির মূল ফটকের পাশের বাসিন্দারাও জানান, এসব বিষয়ে তাঁরা কিছুই জানেন না। শুধু শনিবারই নয়, এর আগের দিন শুক্রবার সন্ধ্যায়ও গ্রামের এক যুবকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তাঁর মা এসে বাধা দেন। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একই বাড়িতে চারজন খুন হলেন, অথচ প্রতিবেশীদের কেউ কিছু জানলেন না—এই প্রশ্নই এখন সবার সামনে।

খুনে ব্যবহৃত পথ
পুলিশের দাবি, মাদক সেবনকে কেন্দ্র করেই গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, গণপতির বাড়ির পাশেই দেবু নামের এক ব্যক্তির নির্মাণাধীন বাড়ি রয়েছে, যার ছাদ দিয়ে গণপতির বাড়ির ছাদে যাতায়াত করা যায়। সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ সেখানে গিয়ে ইয়াবা সেবন করতেন এবং বৃহস্পতিবার রাতে তাঁরা ওই পথেই গণপতির বাড়ির ছাদে যান। এক পর্যায়ে গণপতি ছাদে এলে তাঁকে ও পরিবারের অন্য সদস্যদের একে একে হত্যা করা হয়।

তবে সরেজমিনে গিয়ে ওই পথ ও বাড়িগুলোর অবস্থান পর্যালোচনা করে কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে। দেবুর নির্মাণাধীন বাড়িতে যেতে হলে বাইরের মূল ফটক দিয়েই প্রবেশ করতে হয়, যা সরেজমিনে বন্ধ পাওয়া গেছে। বিকল্প হিসেবে সীমান্ত দাসের বাড়ির সামনের প্রাচীর টপকে যাওয়ার একটি পথ থাকলেও সেটি মূলত সীমান্তের বাড়ির ভেতর থেকেই ব্যবহারযোগ্য—বাইরের দিক থেকে প্রাচীর টপকে সেখানে প্রবেশের সুযোগ নেই।

প্রশ্ন ওঠে, দেবুর বাড়ির ছাদ দিয়ে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ যদি মাঝেমধ্যে গণপতির বাড়ির ছাদে যাতায়াত করতেন, তবে পাশের বাড়ির বাসিন্দারা বিষয়টি জানতেন কি না। এ বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, স্থানীয়রা এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারেন না। নির্মাণাধীন বাড়ির ভাড়াটিয়াও জানান, তাঁদের ছাদে ওঠা অন্য কারও পক্ষে সম্ভব নয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, দেবুর নির্মাণাধীন বাড়ির দ্বিতীয় তলা পুরোপুরি নির্মিত এবং সেখানে দুটি ইউনিট রয়েছে। একটিতে দেবু পরিবার নিয়ে থাকতেন, অন্যটিতে ভাড়া থাকে আরেকটি পরিবার। তবে প্রায় চার মাস ধরে দেবু সেখানে থাকেন না। ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া হেমান সুকুমার মণ্ডল জানান, বৃহস্পতিবার তাঁরা বাসাতেই ছিলেন এবং গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি পাশাপাশি হলেও ওই রাতে কোনো চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শোনেননি। তাঁর বাসার ছাদে নিয়মিত মাদকের আড্ডা বসত কি না জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করেন এবং বলেন, নিচের দরজা বন্ধ থাকলে সেখানে কারও ওঠার সুযোগ নেই। তিনি জানান, গণপতির বাড়িতে বর্তমানে পুলিশ পাহারা রয়েছে এবং এমন ঘটনার পর কীভাবে তাঁরা ওই বাড়িতে থাকছেন, তা নিয়ে পুলিশও তাঁদের প্রশ্ন করেছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে তাঁরা বাসা পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন।

সিসি ক্যামেরা ছিল, ফুটেজ নেই
গণপতির বাড়ির পাশেই একটি কালীমন্দির রয়েছে, যার দেয়ালে লেখা আছে পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায়। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের দিনের কোনো সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পাওয়া যায়নি। মন্দির কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ধীমান ভট্টাচার্য জানান, ক্যামেরাটি চার-পাঁচ দিন ধরে নষ্ট ছিল, তাই ঘটনার দিনের কোনো ফুটেজ তাঁদের কাছে নেই; তবে নতুন ক্যামেরা লাগানোর প্রস্তুতি চলছে। দাসপাড়ার কয়েকজন বাসিন্দাও ক্যামেরা নষ্ট থাকার কথা জানিয়েছেন। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় হত্যাকাণ্ডের পর আশপাশের সিসি ক্যামেরা থেকে ফুটেজ চাওয়া হলেও কেউ তা দেননি—দুজন বাড়ির মালিক জানান, তাঁদের ক্যামেরাও নষ্ট।

দুপুরে এলাকা ফাঁকা, কেউ কিছু দেখেননি
শুক্রবার দুপুরে ওই এলাকার পরিবেশ কেমন থাকে জানতে চাইলে স্থানীয়রা জানান, এটি মূলত হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা, মুসলিম পরিবারের সংখ্যা কম, আর দুপুরের দিকে এলাকা সাধারণত ফাঁকাই থাকে—শুক্রবার বলে বিশেষ কিছু নেই। তবে হত্যাকাণ্ডের আগে বা পরে গণপতির বাড়ি থেকে কেউ বের হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য তাঁরা দিতে পারেননি। পুলিশের দাবি, শুক্রবার দুপুরে গণপতির বাড়ি থেকে বের হন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। তবে ভিন্ন কথা জানান সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় চন্দ্র দাস। তিনি বলেন, ওই রাতে সিদ্ধার্থ ছিলেন গণপতির বাড়ির পাশে সীমান্ত দাসের বাড়িতে, যেখানে তিনি মাঝেমধ্যে থাকতেন। শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে সেখান থেকে বাড়ি ফেরেন সিদ্ধার্থ, এরপর আবার বের হয়ে যান।

রাতের বিদ্যুৎ নিয়েও প্রশ্ন
স্থানীয়রা জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একবার বিদ্যুৎ চলে গেলেও কিছুক্ষণ পর তা ফিরে আসে, আর মধ্যরাত কিংবা গভীর রাতে এলাকায় বিদ্যুৎ ছিলই। তবে গণপতির বাড়িতে তখন বিদ্যুৎ ছিল কি না, তা কেউ লক্ষ্য করেননি, কারণ রাত ১০-১১টার পর তাঁরা সাধারণত বাড়ির বাইরে বের হন না। অন্যদিকে জানা গেছে, গভীর রাতে গণপতির বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না।

গণপতির ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীর অভিযোগ, বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকেই গণপতির বাড়ির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং সেই সুযোগেই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। তিনি মনে করেন, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; এর পেছনে বড় একটি চক্র রয়েছে।

তবে পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন—তাদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর সিসি ক্যামেরায় ভিডিও ধারণ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ বাড়ির মিটার থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিলেন।

কিন্তু স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, বাড়ির মিটার নয়, বরং বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল।

মরদেহ উদ্ধারের সময় দেখা যায়, বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন—তখন পুলিশ স্থানীয় ইলেকট্রিশিয়ান উজ্জ্বল কুমারকে ডেকে নেয়। উজ্জ্বল কুমার জানান, শনিবার মধ্যরাতে মই দিয়ে বৈদ্যুতিক খুঁটিতে উঠে তিনি দেখেন, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সংযোগ খুঁটি থেকেই বিচ্ছিন্ন করা ছিল।

মুগ্ধর স্বীকারোক্তি নিয়েও ভিন্ন তথ্য
পুলিশ জানায়, আটকের আগে মুগ্ধ রংপুর মহানগরের দখিগঞ্জ কালিমন্দির ও শ্মশানের দেখভালের দায়িত্বে থাকা বিশ্বজিৎ মোহন্তের কাছে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছিলেন। তবে বিশ্বজিৎ মোহন্তের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি জানান, রাত সাড়ে ৩টার দিকে মুগ্ধ দৌড়ে শ্মশানে আসেন এবং পানি খেতে চান; এর কিছুক্ষণ পরই পুলিশ এসে তাঁকে ধরে নিয়ে যায়।

বিশ্বজিৎ আরও জানান, মুগ্ধ তখন বলেছিলেন যে পুলিশ তাঁকে ধাওয়া করছে এবং পথে তিনি দুটি বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কেউ আশ্রয় দেয়নি। তবে সেখানে মুগ্ধ হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেননি বলে জানান বিশ্বজিৎ।

খুনের রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধর অবস্থান
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকাল ১০টায় এক সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) তৎকালীন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, রাত ১২টার পর সিদ্ধার্থ ইয়াবাসহ মুগ্ধকে নিয়ে সীমান্তদের বাড়িতে যান, যেখানে দুজন মিলে তিনটি ইয়াবা সেবন করেন। রাত ৩টার দিকে আরও ইয়াবার প্রয়োজন হলে তাঁরা ইয়াবা ব্যবসায়ী শান্তর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে তাঁর বাড়ির সামনে থেকে আরও চারটি ইয়াবা সংগ্রহ করেন—এ সময় তাঁরা মোবাইল ফোন বন্ধক রেখেছিলেন। এরপর তাঁরা আবার সীমান্তদের বাসায় ফিরে যান এবং রাত ৩টার পর সেখান থেকে বের হন।

তবে সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় চন্দ্র দাস জানান, সীমান্তের বাড়িতে তাঁর ছেলে মাঝেমধ্যেই থাকতেন এবং সেদিনও তিনি সেখানেই ছিলেন। পরদিন বেলা ১১টার দিকে বাড়িতে ফিরে নাশতা করে আবার বের হয়ে যান তিনি। অন্যদিকে মুগ্ধর মা সেনা রানী দাস জানান, বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর ছেলে বাড়িতেই ছিলেন, তবে গভীর রাতে তিনি বের হয়েছিলেন কি না, তা তিনি জানেন না।

খুন হওয়ার আগে ১৪ লাখ ৫৯ হাজার টাকা উত্তোলন
জানা গেছে, গত ২৯ জুলাই গণপতি চক্রবর্তী ট্রেজারি থেকে প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১৪ লাখ ৫৯ হাজার টাকার চেক উত্তোলন করেন। এই বিপুল অর্থ তিনি পরবর্তীতে কোথায় বা কোন খাতে ব্যয় করেছিলেন, সে বিষয়ে পুলিশের কাছে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) সনাতন চক্রবর্তী জানান, টাকাটি কোন খাতে ব্যয় হয়েছে নাকি এখনো আছে—তা তাঁরা জানতে পারেননি, তবে খোঁজ চলছে।

তিনি আরও জানান, এই টাকাসহ আরও কয়েকটি বিষয়ে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করা হতে পারে।

গণপতির স্বজনরা জানান, বাড়ির নিচতলার নির্মাণকাজের জন্যই তিনি ব্যাংক থেকে টাকা তুলেছিলেন—এর বেশি কিছু তাঁরা জানেন না।

পানি দিয়ে আলামত নষ্টের অভিযোগ
গত ২৬ আগস্ট সন্ধ্যায় হঠাৎ গণপতির বাড়ির সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হয় এবং একই সময় পানির মোটর চালু করা হলে ছাদ থেকে পানি পড়তে দেখা যায়। এ নিয়ে অভিযোগ ওঠে, হত্যাকাণ্ডের আলামত নষ্ট করতেই পুলিশ পানি ব্যবহার করেছে।

গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ চন্দ্র দাসের বড় ভাই পার্থ চন্দ্র দাস অভিযোগ করেন, শুধু পানি চালানোর ঘটনাই নয়, ২৫ আগস্ট রাত ১টার দিকে কয়েকজন পুলিশ সদস্য গণপতির বাড়িতে প্রবেশ করেছিলেন এবং পরে কয়েকটি ব্যাগে করে কিছু নিয়ে বের হয়ে যান। তাঁর অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের পেছনে বড় কোনো কারণ থাকতে পারে এবং সেই বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা চলছে।

হঠাৎ আইনজীবী সমিতির সিদ্ধান্ত
রংপুরে একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পক্ষে মামলা পরিচালনা না করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে জেলা আইনজীবী সমিতি। একই সঙ্গে ঘটনাটি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার না করার আহ্বানও জানিয়েছে সংগঠনটি। ২৯ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টায় জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনে সংবাদ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফতাব উদ্দিন।

এর আগের দিন, ২৮ আগস্ট সন্ধ্যায় গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সামনে উপস্থিত হন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী চৈতালি চক্রবর্তী। তিনি বলেন, গণপতির মেয়ে আগামীর ঘাড়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং ঘটনাটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এ সময় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের ভাই পার্থ দাসকে সঙ্গে নিয়ে চৈতালি চক্রবর্তী ঘোষণা দেন, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে তিনি বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেবেন। এর ঠিক পরদিনই জেলা আইনজীবী সমিতি ঘোষণা দেয়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পক্ষে মামলা পরিচালনা করা হবে না।

পুলিশের বয়ান ও গণপতির স্বজনদের অবস্থান
নিহত গণপতির ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, গণপতিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং শুধু দুজন ছেলে যে এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তা তিনি বিশ্বাস করেন না।

গণপতির স্ত্রীর বড় বোন পূজা চক্রবর্তী বলেন, পুলিশ ঘটনা ধামাচাপা দিচ্ছে কি না, বুঝতে পারছি না। পুলিশের ভাষার অর্থ বুঝি না। পুলিশ এগুলো কী বলছে, এসব বিশ্বাসযোগ্য নয়।

তিনি আরও বলেন, ঘটনার রাত ২টা ৪০ মিনিটে আমার বোন প্রীতিলতা চক্রবর্তী আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করেছিল। কিন্তু সেই ফোন আমি রিসিভ করতে পারিনি। শুক্রবার বোনের সঙ্গে কথা হয়নি। তাকে আর ফোন দেওয়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি।

আগামীর হবু স্বামীর মাধ্যমে মেলে মরদেহের খোঁজ
পূজা চক্রবর্তী জানান, আদিত কর নামে এক তরুণের সঙ্গে আগামীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং তাঁর সঙ্গেই সামাজিকভাবে বিয়ের আলোচনা চলছিল, যা পারিবারিকভাবেও মেনে নেওয়া হয়েছিল। শুক্রবার থেকে আদিত আগামীকে ফোনে পাচ্ছিলেন না, এমনকি পরিবারের কারও সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেননি। দাসপাড়ায় গিয়েও তিনি আগামীদের দেখা পাননি। পরে বিষয়টি পূজাকে জানালে তিনি গণপতির বাড়িতে গিয়ে ভয়াবহ অবস্থা দেখেন এবং পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

গণপতির বাড়িতে রক্তের দুর্গন্ধ
পুলিশ জানায়, গণপতিসহ চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী চৈতালি চক্রবর্তীর দাবি, আগামীর ঘাড়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তবে আগামীর সুরতহাল প্রতিবেদনে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের কথা উল্লেখ নেই—সেখানে বলা হয়েছে, তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে হালকা আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মুখমণ্ডল বিকৃত ও ঝলসানো, চোখ ঘোলাটে ও কোটর থেকে বের হওয়া, এবং মুখের একপাশ থেকে অন্যপাশে লাল রশি দিয়ে বাঁধা ছিল। এক ভিডিওতে দেখা যায়, প্রীয়মের মরদেহ যে ঘরে পড়ে ছিল, সেখানকার মেঝেতে অনেক রক্ত লেপটে আছে।

মরদেহ উদ্ধারের পরদিন সকালে গণপতির বাড়িতে যান রংপুর ব্রাহ্মণ সংসদের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ রায়। প্রথমবার পুলিশ তাঁদের বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেয়নি; পরে দুপুরের দিকে আবার গিয়ে তিনি বাড়ির ভেতরে রক্তের তীব্র দুর্গন্ধ পান। তিনি বলেন, শনিবার (২২ আগস্ট) দিবাগত রাতে খবর পেয়ে পরদিন সকাল হতেই ছুটে যাই গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি। কিন্তু ওই সময় পুলিশ আমাদের বাড়ির ভেতর ঢুকতে দেয়নি, তখন ফিরে আসি। পরে বেলা ১২টার পরে আবার ওই বাড়িতে যাই। গণপতির বাড়িতে এত রক্তের দুর্গন্ধ যে বাড়িতে ঢোকাই যাচ্ছিল না। এগুলো এত তাড়াতাড়ি নিশ্চিহ্ন করে ফেলার কারণ কী, আমরা বুঝতে পারছি না।

তিনি অভিযোগ করেন, পানি দিয়ে রক্তের দাগসহ হত্যার আলামত নষ্ট করা হয়েছে।

রংপুর মহানগর ডিবি পুলিশের ইনচার্জ জিনাত আলী জানান, গণপতির বাড়িতে রক্ত ছিল কি না তা তাঁর জানা নেই, তবে সিআইডি ঘটনাস্থল থেকে নিহতদের মুখের লালাসহ প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করেছে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ