Views Bangladesh Logo

বুয়েটে শিক্ষক নিয়োগে কলঙ্কের দাগ!

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) শিক্ষক নিয়োগে প্রথমবারের মত গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এর আগ পর্যন্ত বুয়েটই দেশের এমন এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে কখনো প্রশ্ন ওঠেনি। তবে এবার শিক্ষক নিয়োগে সেই গৌরব ধরে রাখতে পারল না বর্তমান বুয়েট কর্তৃপক্ষ। ক্ষমতার অপব্যবহার করে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়োগ দেয়ার প্রচেষ্টায়, বুয়েটের নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও লাগল কলঙ্কের দাগ।

কিছুদিন আগে বুয়েটে তিনটি বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির কাছে লিখিত অভিযোগ দেন একজন সিনিয়র শিক্ষক। এরপর সাধারণ শিক্ষার্থীদের কয়েকজনও এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছে জানতে চেয়ে চিঠি দেন। এর সূত্র ধরেই ভিউজ বাংলাদেশের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বুয়েটের ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক সত্য। সর্বশেষ ব্যাপক সমালোচনার মুখে অনিয়মের মধ্যদিয়ে নতুন নিয়োগ পাওয়া একজন শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

বুয়েটে শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালা পর্যালোচনা করে জানা যায়, বুয়েটে যে কোন বিভাগে অনার্সে (সম্মান) সবচেয়ে ভালো ফল করা শিক্ষার্থীরাই প্রভাষক হওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পান। এ ক্ষেত্রে সর্বশেষ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। মাস্টার্সের ফলাফল এই নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পায় না। শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে।

এ নিয়ে আরও প্রায় দেড় মাস আগে বুয়েট শিক্ষক সমিতির কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ন্যানো ম্যাটেরিয়ালস ও সিরামিক বিভাগের অধ্যাপক ফখরুল ইসলাম। তিনি ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, তার চাওয়া ছিল বিষয়টি বুয়েট কর্তৃপক্ষই সমাধান করুক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা না হওয়ার কারনে শিক্ষক সমিতির কাছে লিখিত অভিযোগ করেন তিনি। তার প্রত্যাশা ছিল শিক্ষক সমিতি দ্রুত সভা বিষয়টি সুরাহা করবে। কিন্তু শিক্ষক সমিতির তৎকালীন সভাপতি কোনো সভা ডাকেননি। পরে বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তালুকদারের কাছে আবারও অভিযোগ করেন তিনি।

এ বিষয়ে বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘আমি শুনেছি সমিতির আগের সভাপতি বরাবর একটি অভিযোগ জমা পড়েছিল। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর আবার একই অভিযোগ জমা পড়েছে কি’না, সে বিষয়ে তিনি খোঁজ নেবেনে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন।


ডিনের ছেলেকে চাকরি দিতে পদ বাড়ানোর অভিযোগ

মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (যন্ত্রকৌশল) বিভাগে চারটি লেকচারার পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ছয় দিন পর ২৯ জুলাই একই রেফারেন্স নম্বর ও তারিখ রেখে, পদসংখ্যা বাড়িয়ে পাঁচটি করা হয়। কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ছিল ‘প্রযুক্তিগত সংশোধন’। বুয়েটের একজন জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি সংশোধন করে আগের তারিখ বসানো মানে প্রক্রিয়া আড়াল করা। উচ্চ পর্যায়ের ইশারা ছাড়া এমনটি হওয়া সম্ভব নয়।’

এই বিভাগের সর্বশেষ ব্যাচের (১৯তম) প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকারীরা বিদেশে চলে যাওয়ায় তারা আবেদন করেননি। তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ স্থান অধিকারী চারজনই আবেদন করেন। যন্ত্রকৌশল বিভাগের ডিন জহুরুল হকের ছেলে রাফিউল হক সপ্তম স্থান অধিকারী ছিলেন। তাকে নিয়োগ দেওয়ার জন্যই পদসংখ্যা চার থেকে বাড়িয়ে পাঁচ করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। রাফিউল হক নিয়োগ পেয়েছেন।

ওয়াটার রিসোর্সে অধ্যাপকের মেয়ের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন

গত বছর ২৩ জুলাই বিভিন্ন বিভাগে মোট ১৪ জন প্রভাষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয় বুয়েট। ওয়াটার রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা) ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে দুটি পদের বিপরীতে সর্বশেষ (১৯তম) ব্যাচের দ্বিতীয় স্থান অধিকারী মাহফুজুল ইসলাম আবেদন করেন। কিন্তু দেখা যায়, যে দ্বিতীয় তাকে বাদ দিয়ে পাঁচ ব্যাচ আগের তাসমিয়া আহসানকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাসমিয়া হলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক হাসিব মোহাম্মদ হাসানের মেয়ে। মাহফুজুল ইসলামের সিজিপিএ ছিল ৩ দশমিক ৯৪। তাসমিয়া আহসানের জিপিএও একই। সর্বশেষ ব্যাচ থেকে নিয়োগ না দিয়ে পাঁচ ব্যাচ আগের একজনকে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা বুয়েটে শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালার পরিপন্থী এবং এবারই প্রথম ঘটেছে বলে জানান একাধিক শিক্ষক।


অনিয়মে নিয়োগ, চাপের মুখে পদত্যাগ

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারং (পুরকৌশল) বিভাগে নিয়োগের পদসংখ্যা ছিল ছয়। ১৯তম ব্যাচের প্রথম থেকে ষষ্ঠ স্থান অধিকারী সবাই আবেদন করেন। মোট আবেদনকারী ছিলেন আটজন। কিন্তু ষষ্ঠ স্থান অধিকারী তৃষা শিকদারকে বাদ দেওয়া হয়। ১৪তম ব্যাচে সিজিপিএ ৩ দশমিক ৭৩ পাওয়া সিফাত আজাদ পাপড়ি নিয়োগ পান। অথচ তৃষা শিকদারের সিজিপিএ ছিল ৩ দশমিক ৯৫। পাপড়ির নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাশরুর হাসানের স্ত্রী।

বিভাগের শিক্ষকরা এই নিয়োগের বিরুদ্ধে গত ১৪ ডিসেম্বর উপাচার্যের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নবনিযুক্ত পাপড়িকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দেয় এবং তাকে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়। সম্প্রতি তিনি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছেন।

ন্যানো ম্যাটেরিয়ালসে নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা

ন্যানো ম্যাটেরিয়ালস ও সিরামিক ইঞ্জিনিয়ারিং (এনএমএসই) বিভাগে নতুন দুজন লেকচারার নিয়োগ পেয়েছেন। এর মধ্যে একজন যন্ত্র কৌশল থেকে সদ্য পাস করা গ্র্যাজুয়েট। অন্যজন বস্তু ও ধাতব কৌশল বিভাগের। তার সিজিপিএ কম এবং এক শিক্ষকের স্ত্রী বলে জনশ্রুতি আছে। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে বিভাগটি নতুন। এখান থেকে কোনো ব্যাচ এখনও বের হয়নি। এ জন্য অন্য ব্যাচের গ্র্যাজুয়েটকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে, অন্য বিভাগে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকা বা পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ দেওয়া হলো না কেন।

বুয়েটে শিক্ষক নিয়োগ কমিটির প্রধান হিসেবে পদাধিকার বলে দায়িত্বপালন করেন উপাচার্য। সদস্য হিসেবে থাকেন উপ-উপাচার্য, সংশ্লিষ্ট বিভাগের ডিন ও বিভাগীয় প্রধান। এ ছাড়া বাইরের দুজন বিশেষজ্ঞ থাকেন।

এ বিষয়ে বুয়েট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানার জন্য উপাচার্য ও উপ-উপচার্যর দপ্তরে একাধিকবার চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বুয়েট কর্তৃপক্ষ পরবর্তী সময়ে কোন বক্তব্য দিলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করবে ভিউজ বাংলাদেশ।


মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ