Views Bangladesh Logo

তারেক রহমান, চাটুকার থেকে সাবধান

Rased Mehedi

রাশেদ মেহেদী

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখন অভিনন্দনের বন্যায় ভাসছেন। কারন তিনি দু’এক দিনের মধ্যেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। জাতীয় নির্বাচনে দলের এমন বিপুল বিজয়ের মধ্য দিয়ে দেশের সরকার প্রধান হওয়ার এই শুভক্ষণে আমরাও তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানাব, তবে তার তাগে একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে তাকে জাতীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্মরণ করিয়ে দেওয়াকে নিজের কর্তব্য বলে মনে করছি। কারন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে দেশের আর কোন সরকার প্রধানকে সরকারের মেয়াদ শেষে ‘অসম্মানিত’ চরিত্র হিসেবে দেখতে চাইনা। জানি আজকের দিনে এসব বিষয় ভালোলাগার কথা নয়। আজকের দিনে প্রশংসা বাক্য শুনতেই খুব বেশি ভাল লাগবে। তবুও কিছু ভিন্ন কথা শোনাতে চাই, কারন নিমোর্হভাবে সত্য তুলে ধরাই আমার পেশাগত দায়িত্ব।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বরাবরই প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বিরোধী দলে থেকে সফল হয়েছে। দলের প্রধানরাও বিরোধী দলের নেতা হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছেন। আর যখনই যে রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করেছে এবং দলের প্রধান সরকার প্রধান হয়েছেন, সরকারের মেয়াদ শেষে তাকে ‘নিন্দিত’ চরিত্র হতে হয়েছে। এর মূল কারন হচ্ছে, তারা যখন রাজপথে থাকেন, তখন তাদের চারপাশে মোসাহেব বা চাটুকারের দল থাকে না। কিন্তু সরকার প্রধান হওয়ার পর তারা চাটুকারের দল পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েন এবং এদের প্রশংসার আতিশয্যে চোখের সামনে একটি মায়াবী দেয়াল তৈরি হয়। যে দেয়ালে উন্নয়নের সাফল্যগাঁথার ফেনায়িত চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়, ফলে সরকার প্রধান বাস্তবতা থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যান। সামনে থেকেও তারা জনগণ থেকে যোজন মাইল দূরের কেউ একজন হয়ে ওঠেন। এরপর সরকার প্রধান নিন্দিত হতে শুরু করলে চাটুকারের দল সটকে পড়ে এবং নতুন সরকারে প্রধানের আশে পাশে ভিড়ে যাওয়ার ধান্দা শুরু করে।

উদাহরণস্বরূপ, স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়া আপোষহীন নেত্রী হিসেবে জাতির সামনে সুমহান উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। ওই আন্দোলনে শেখ হাসিনার গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহন থাকলেও ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশে নেওয়ার ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তিনি বিতর্কিত হয়েছিলেন। যে কারনে খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছিলেন নব্বই এর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পুরোধা নেতৃত্ব। যার ফল হিসেবে ১৯৯১ সালে বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অভূতপূর্ব জয় পায় এবং সরকার গঠন করে, খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন।

কিন্তু সরকার গঠনের পর তিন বছরের মাথায় চাটুকারদের পাল্লায় পড়ে ১৯৯৪ সালের ২০ মার্চ মাগুরা উপ নির্বাচনে জোর করে দলীয় প্রার্থীকে জেতাতে গিয়ে খালেদা জিয়া সরকার বিতর্কের মধ্যে পড়ল এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামীলীগসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো রাজপথে আন্দোলনে নামল। এখানেই শেষ নয়। সুযোগ সন্ধানী চাটুকারদের পাল্লায় পড়ে বিরোধী দলগুলোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিকে পাশ কাটিয়ে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতির প্রায় ভোটার শূন্য একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কলঙ্ক চাপল বিএনপি সরকারের উপর। সরকার প্রধান হিসেবে খালেদা জিয়াকেও সেই দায় বহন করতে হয়েছে। এর ফল হিসেবে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হয়।

১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের কিছু আঞ্চলিক নেতার নজিরবিহীন সন্ত্রাস এবং দূর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে খালেদা জিয়া আবারও দারুন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এর ফল হিসেবে ২০০১ সালের পহেলা অক্টোবরের জাতীয় নির্বাচনে ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করে বিএনপি এবং খালেদা জিয়া আবারও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। অথচ দেখুন ২০০১ সালের আকাশচুম্বী জনপ্রিয় নেত্রী খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাঁচ বছর মেয়াদ পর করার পর চাটুকারদের পাল্লায় পড়ে ২০০৬ সালে আবারও নিজেদের পক্ষে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে বিচারপতিদের চাকরির বয়স সংক্রান্ত বিধি সংশোধনের উদ্যেগ নিয়ে বড় বিতর্কের সৃষ্টি করলেন। যার ফল স্বরূপ দেশ দুই বছরের জন্য অনির্বাচিত সরকারের শাসনে চলে গেল।

এরপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়া বিরোধী দলের নেতা হিসেবেই আবারও জাতির সামনে অসামান্য জনপ্রিয় নেতা হয়ে ওঠেন। তার জানাযায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে আশির দশকের পর জনপ্রিয়তায় খালেদা জিয়ার সমান আর কেউ নেই। কোটি মানুষের হৃদয়ে তিনি শ্রদ্ধার আসনে বেঁচে থাকবেন যুগ যুগ ধরে।

আবার বিপরীত দিক থেকে দেখুন, ১৯৯৪ সাল থেকে তত্ত্ববধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে শেখ হাসিনা বিপুল জনপ্রিয়তা এবং গ্রহনযোগ্যতা পেয়েছিলেন। যে কারনে ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের জাতীয় নির্বাচনে তার নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ জয় পায়। কিন্তু চটুকারদের পাল্লায় তিনি নারায়ণগঞ্জ, লক্ষীপুর, ফেনী, পুরনো ঢাকায় চিহ্নিত দলীয় সন্ত্রাসীর পক্ষে কট্টর অবস্থান নিতে গিয়ে নিজেকে চরম বিতর্কিত চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দিলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সামনে। ২০০১ সালে একটি নিরপক্ষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবেই ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন শেখ হাসিনা। স্বাধীন বাংলাদেশে এটাই এখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের একমাত্র উদাহরণ। অথচ সেই উদাহরণ সত্ত্বেও ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের ভরাডুবি ঘটে পাঁচ বছর ধরে কিছু দলীয় সন্ত্রাসীর লাগাম ছাড়া সন্ত্রাসের কারনে। চাটুকারদের তোষামোদিতে শেখ হাসিনার চোখ বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল, সন্দেহ নাই।

২০০২ সাল থেকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নানা অনিয়ম, দূর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার শিকার হওয়া, ২০০৫ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা আবারও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামীলীগও ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করে। অথচ চাটুকারদের পাল্লায় পড়ে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার কল্পিত স্বপ্নে বিভোর হয়ে শেখ হাসিনা দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেন। এ ছাড়া চাটুকাররা ব্যাংক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে। এই চাটুকারদের পাল্লায় পড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রতিহত করতে চরম নির্মমতার পথ বেছে নেয় শেখ হাসিনা সরকার। ফলস্বরূপ শেখ হাসিনাকে জনরোষে দেশ ছেড়ে পালানোর কলঙ্ক মাথায় নিতে হয়, যে কলঙ্ক নব্বই এর আন্দোলনে এরশাদকেও নিতে হয়নি!

আওয়ামীলীগের তৃনমূলের নেতা-কর্মীরা দল ক্ষমতায় থাকতে কোন সুবিধা নেননি, আবার দলের সরকার পতনের পর তারাই সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অথচ চাটুকারদের দু’একজন আইনের আওতায় আসলেও বেশীরভাগকে দেখুন, তারা আওয়ামীলীগ সরকারেও ভালো ছিলেন, এখনও বিদেশে ভালো আছেন, ভিডিওতে তাদের আয়েশী চেহারা মাঝে মধ্যেই দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে চাটুকারদের দিন শেষ হয় না। তাদের কেউ কেউ কোন না কোনভাবে আবার নতুন সরকারের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। প্রতিটি সরকারের সময় নতুন একদল চাটুকারের জন্ম হতেও দেখা যায়। অতএব তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর এই চাটুকারদের আবারও ক্ষমতাবান হওয়ার আশংকা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সে কারনেই আজকের এই বেরসিক লেখার অবতারণা। জাতির ক্রান্তিকালে এক ঐতিহাসিক মুহুর্তে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন। তার সামনে পুরনো জঞ্জাল সরানোর পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে চাটুকাররা নতুন জঞ্জাল তৈরি করে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। আমরা বিশ্বাস করি তারেক রহমান চাটুকারদের থেকে সাবধান থাকবেন এবং আধুনিক, প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সরকার পরিচালনার মাধ্যমে এবং বাংলাদেশকে অগ্রগতি, সমৃদ্ধির নতুন মাত্রায় পৌঁছে দেবেন। আপনার জন্য শুভকামনা তারেক রহমান, অনেক অনেক অভিনন্দন।

রাশেদ মেহেদী,
সম্পাদক, ভিউজ বাংলাদেশ

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ