Views Bangladesh Logo

ভূমির মামলার জট যেন খুলেই না

জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের শুরুটা অনেক সময় হয় কয়েক শতক জমির সীমানা নিয়ে। কিন্তু সেই বিরোধ যখন আদালতে গড়ায়, তখন তা কেবল একটি জমির মামলা থাকে না, এক প্রজন্মের মামলা গিয়ে দাঁড়ায় আরেক প্রজন্মের ঘাড়ে। খতিয়ান, দাগ, নামজারি, বণ্টন, দখল, উত্তরাধিকার কিংবা জমির জরিপ- একটির সঙ্গে আরেকটি বিরোধ জড়িয়ে মামলা দীর্ঘ হতে থাকে। আর আদালতের নথিতে জমে থাকা মামলার পাহাড়ে হারিয়ে যায় বিচারপ্রার্থীর অপেক্ষা।

সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য বলছে, দেশে ভূমি-সংক্রান্ত ২ লাখ ৯৩ হাজার ১২৭টি মামলা এখনো আদালতে বিচারাধীন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাব তুলে ধরে জাতীয় সংসদে এ তথ্য জানিয়েছেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু। যদিও চলতি বছর ভূমি বিরোধের ৩৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ সালিস ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধান হয়েছে। অর্থাৎ বিরোধের বড় একটি অংশ আদালতে যাওয়ার আগেই মীমাংসার সুযোগ তৈরি হলেও প্রায় তিন লাখ ভূমি মামলা এখনো বিচারব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করে আছে।

সমস্যাটির ব্যাপ্তি বুঝতে হলে ভূমি মামলাকে দেশের সামগ্রিক দেওয়ানি মামলার জটের সঙ্গে দেখতে হয়। সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা গেছে, ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত অধস্তন আদালতে ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৪৩টি দেওয়ানি মামলা। একই সময়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মোট ৩৯ হাজার ১১৩টি মামলার মধ্যে ২২ হাজার ২০৮টি দেওয়ানি এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৫ লাখ ২২ হাজার ৩৩১টি মামলার মধ্যে ১ লাখ ৬ হাজার ১০৯টি দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন ছিল। অর্থাৎ ভূমির ২ লাখ ৯৩ হাজারের বেশি মামলা আসলে একটি বিশাল দেওয়ানি মামলার জটের অংশ। কোনো জমির মামলা জেলা জজ আদালত বা দেওয়ানি আদালতে শুরু হয়ে আপিল, রিভিশন কিংবা রিটের মাধ্যমে উচ্চ আদালতে উঠলে একই বিরোধ বছরের পর বছর বিভিন্ন স্তরে ঘুরতে থাকে। যেন অদৃশ্য এক গোলকধাঁধা।

এক মামলার সঙ্গে আরেক মামলা, বাড়ছে জট

ভূমি বিরোধের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো- একটি মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে যায় একাধিক সরকারি ও বেসরকারি পক্ষ। ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, জেলা প্রশাসন, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দেওয়ানি মামলা, রিট বা ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালে মামলা হতে পারে। ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে অতীতের একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আইন অনুযায়ী মামলা এক বছরের মধ্যে নিষ্পত্তির কথা থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। বিচারক সংকট, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সহযোগিতার অভাব এবং অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ বাস্তবায়নে বিলম্ব মামলাকে দীর্ঘ করে। এছাড়া তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্ব, সাক্ষ্যগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা ও বারবার মুলতবিকে মামলাজটের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টেও জমে থাকা দেওয়ানি মামলা

ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের চূড়ান্ত চাপ গিয়ে পড়ে উচ্চ আদালতেও। ৩০ জুন ২০২৬-এর হিসাব অনুযায়ী, আপিল বিভাগে ২২ হাজার ২০৮ এবং হাইকোর্ট বিভাগে ১ লাখ ৬ হাজার ১০৯টি দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন ছিল। যদিও ২০২৬ সালেই আপিল বিভাগ ৭ হাজার ৫৫৩টি এবং হাইকোর্ট বিভাগ ৫৫ হাজার ৭৫৬টি মামলা নিষ্পত্তি করেছে।

তবে বিপুল সংখ্যক পুরোনো মামলা নিষ্পত্তির পাশাপাশি নতুন মামলা ও আপিল যুক্ত হওয়ায় জট কিছুতেই কমছে না। সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব বার্ষিক প্রতিবেদনগুলোতেও বছরের পর বছর দেওয়ানি মামলার বড় বোঝা থাকার চিত্র পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য উচ্চ আদালতে পুরোনো মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট সূত্র জানায়, ২০২৬ সালের মে মাসে হাইকোর্ট একদিনেই ৭ হাজার ১০৪টি দীর্ঘদিনের পুরোনো মামলা নিষ্পত্তি করে। এবছরই প্রায় ৫০ হাজার পুরনো মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। যার প্রায় অর্ধেকই দেওয়ানি মামলা। আর এসব দেওয়ানী মামলার অধিকাংশই ভূমি সংক্রান্ত।

বিচারক কম, মামলা বেশি

মামলাজটের আরেকটি বড় কারণ বিচারকের তুলনায় মামলার অস্বাভাবিক চাপ। ২০২৬ সালের সংসদীয় তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন আদালতে অনুমোদিত ২ হাজার ৬২০টি বিচারক পদের বিপরীতে কর্মরত ছিলেন ১ হাজার ৯৬৪ জন। অর্থাৎ ৬৫৬টি পদ এখনো শূন্য। একই সময়ে আপিল বিভাগে বিচারক আছেন ৬ জন এবং হাইকোর্ট বিভাগে ১০১ জন। এই ঘাটতি শুধু সংখ্যার সমস্যা নয়, প্রতিটি বিচারকের ওপর বিপুলসংখ্যক মামলা জমে গেলে শুনানির তারিখ দীর্ঘ হয়। একটি মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হতে সময় লাগে, একটি পক্ষ সময় চাইলে পরবর্তী তারিখ চলে আসে কয়েক সপ্তাহ বা মাস পরে। এভাবেই একটি জমির বিরোধ দশক পেরিয়ে যায়।

ভূমি মামলা কমানোর পথ কি

চলতি বছর সরকার ২০টি জেলায় বাধ্যতামূলক প্রাক-মামলা মধ্যস্থতা চালু করেছে। যার সুফলও মিলেছে। আইনমন্ত্রীর মো. আসাদুজ্জামান ভিউজ বাংলাদেশকে এ ব্যাপারে বলেন, ‌‌‘বাধ্যতামূলক প্রাক-মামলা মধ্যস্থতা চালু হওয়া জেলাগুলোতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত নতুন মামলা দায়েরের হার গড়ে ৬২ দশমিক ০২ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে দেওয়ানি আদালতের বণ্টন মামলা ৬৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ কমেছে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ ভূমি বিরোধের একটি বড় অংশ আদালতে যাওয়ার আগেই স্থানীয় সালিস, মধ্যস্থতা বা আইনি সহায়তার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা গেলে নতুন মামলার প্রবাহ কমানো সম্ভব।’

তবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোতাহার হোসেন এ ব্যাপারে ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘যা কিছুই করা হোক, পুরোনো ২ লাখ ৯৩ হাজারের বেশি ভূমি মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংকট কাটবে না। প্রয়োজন ভূমি রেকর্ডের দ্রুত ডিজিটাল যাচাই, একই জমি নিয়ে একাধিক মামলা শনাক্ত করার ব্যবস্থা, ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালে পর্যাপ্ত বিচারক, সরকারি দপ্তরের সময়মতো প্রতিবেদন এবং অযথা মুলতবির ঘটনা কমাতে হবে। কারণ জমির বিরোধে সময় শুধু একটি মামলার আয়ু বাড়ায় না- বাড়ায় খরচ, বাড়ায় পারিবারিক দ্বন্দ্ব, অনিশ্চিত করে মালিকানা এবং অনেক ক্ষেত্রে জমিটির অর্থনৈতিক ব্যবহারও আটকে দেয়। তাই ভূমির মামলার জট খুলতে শুধু আদালতে মামলা নিষ্পত্তির গতি বাড়ালেই হবে না; মামলা যেন আদালতেই না আসে, সেই পথও শক্ত করতে হবে।’

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ