টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইস্যু: আইসিসির দ্বিমুখীতা, নাকি বিসিবির ব্যর্থতা?
বাংলাদেশ ক্রিকেট এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। আসন্ন টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত এখন চূড়ান্ত। আইসিসির দেওয়া ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটামের জবাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে জাতীয় দল ভারতের মাটিতে খেলতে যাবে না। এর পরপরই নিশ্চিত হয়েছে, বাংলাদেশের পরিবর্তে স্কটল্যান্ড এবারের টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নেবে। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ শুধু একটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে গেল না, বরং দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে যুক্ত হলো এক বড় ক্ষতির অধ্যায়।
বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা। বিসিবির অবস্থান ছিল, ভারতের মাটিতে বাংলাদেশ দলের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। এই উদ্বেগ একেবারে হঠাৎ করেই তৈরি হয়নি, পেছনে ছিল যথাযথ কারন- আইপিএলে মোস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স দলে নেওয়ার পর উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের বিক্ষোভের মুখে বিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। এই ঘটনাকে খেলোয়ারদের নিরাপত্তা ইস্যুতে বিসিবি বড় উদাহরণ হিসেবে দেখেছে—যেখানে একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগেও একজন বাংলাদেশি খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি, সেখানে পুরো জাতীয় দলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তো অমূলক নয়।
এই প্রেক্ষাপটেই বিসিবি আইসিসির কাছে একাধিক যুক্তি উপস্থাপন করে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের দাবি জানায়। ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি হওয়ায় শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ এবং বাস্তবসম্মত ভেন্যু হতে পারত। তবে বিসিবির এই আবেদন পরিশেষে প্রত্যাখ্যান করা হয়। এ বিষয়ে দফায় দফায় বৈঠক ও চিঠি চালাচালি হয় বিসিবি ও আইসিসির মধ্যে। বিসিবির আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রাথমিক চিঠিতে আইসিসির নিরাপত্তা টিম স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে ভারতে বাংলাদেশ খেললে তা নিয়ে ঝুঁকি রয়েছে, এমনকি কিছু জায়গা 'হাইলি রিস্কি' বলা হয়।
নানা জটিলতা শেষে বিষয়টি গড়ায় আইসিসির চূড়ান্ত বৈঠকে। ২১ জানুয়ারি ভিডিও কনফারেন্সে আইসিসি বোর্ড সভার আয়োজন করে। ১৫টি সদস্য দেশের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকেই কার্যত বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। বুধবার বোর্ড সভায় ভোট শেষে আইসিসি জানায়, বিশ্বকাপে অংশ নিতে হলে বাংলাদেশকে ভারতেই যেতে হবে। বাংলাদেশ না যেতে চাইলে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়তে পারে এবং সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিবর্তে অন্য একটি দল নেওয়া হতে পারে। আর, সেই র্যাংকিং অনুযায়ী স্কটল্যান্ডকে বাংলাদেশের পরিবর্তে নেওয়া হয়।
আইসিসির দ্বিমুখী নীতি
এই অবস্থান আইসিসির নীতিগত প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে আসে। কারণ, একই টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে পাকিস্তানের ম্যাচ ভারতের বাইরে, শ্রীলঙ্কায় আয়োজন করা হচ্ছে। অতীতে ভারতও পাকিস্তানে খেলতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের জন্য ভেন্যু পরিবর্তনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হয়নি। এখান থেকেই উঠে আসে আইসিসির দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ। অনেকের মতে, আইসিসিতে ভারতের প্রভাব এবং ক্ষমতার ভারসাম্যই এই সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রেখেছে।
বর্তমান ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় পরাশক্তি ভারত, এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কার্যত তারাই হয়ে উঠেছে মূল নিয়ন্ত্রক। আইসিসির নীতিনির্ধারণ থেকে শুরু করে বড় টুর্নামেন্টের ভেন্যু নির্বাচন—সব ক্ষেত্রেই ভারতের ইচ্ছা ও সুবিধার প্রতিফলন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ ২০২৫ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। আয়োজক ছিল পাকিস্তান, কিন্তু নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অজুহাতে সেখানে খেলতে অস্বীকৃতি জানায় ভারত। এতে ভারতের কোনো প্রতিযোগিতামূলক বা আর্থিক ক্ষতি হয়নি; বরং আইসিসি ভারতের অনুরোধে সব ম্যাচের ভেন্যু নির্ধারণ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন আচরণ স্বাভাবিকভাবেই অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
আইসিসির এই অবস্থানের বিরুদ্ধে সরব হন পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক রশিদ লতিফও। পাকিস্তানের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য নেশন-এর সম্পাদকীয়তে সরাসরি আইসিসিকে ‘করাপ্টেড’ বলে উল্লেখ করা হয় এবং সংস্থাটিকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর আহ্বান জানানো হয়।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসির বিরুদ্ধে দ্বিমুখী নীতি অনুসরণের অভিযোগ তোলে। বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেন, ভারতের অনুরোধে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ম্যাচ পাকিস্তানের বাইরে সরিয়ে নেওয়া গেলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগকে আমলে নেওয়া হয়নি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতে ১৯৯৬ ও ২০০৩ সালের বিশ্বকাপে একাধিক দেশ নির্দিষ্ট ভেন্যুতে খেলতে অস্বীকৃতি জানালেও আইসিসি তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েছিল। এমনকি সাম্প্রতিক সময়েও একটি দেশ নিরাপত্তাজনিত কারণে খেলতে না গেলে আইসিসি বিশেষ সুবিধা দিয়ে নিরপেক্ষ ভেন্যুর ব্যবস্থা করেছিল—যাকে তিনি সরাসরি ‘প্রিভিলেজ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
কী বলছে আইসিসি?
বোর্ড সভা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায় আইসিসি—নির্ধারিত সূচিতেই বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে। আইসিসি দাবি করেছে, তাদের মূল্যায়নে বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, সংবাদমাধ্যমকর্মী কিংবা দর্শকদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বা যাচাইযোগ্য নিরাপত্তা হুমকির তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া, টুর্নামেন্ট শুরুর এত কাছাকাছি সময়ে সূচি পরিবর্তনকে অবাস্তব বলেও উল্লেখ করা হয়। আইসিসি আরও জানায়, বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি ছাড়া ম্যাচ স্থানান্তর করলে ভবিষ্যৎ টুর্নামেন্টগুলোর জন্য তা নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করবে এবং বৈশ্বিক সংস্থা হিসেবে তাদের নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
আইসিসির একজন মুখপাত্র বলেন, “বিসিবি একটি বিচ্ছিন্ন ঘরোয়া লিগ-সংক্রান্ত ঘটনাকে বিশ্বকাপের নিরাপত্তা ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত করেছে, যার সঙ্গে টুর্নামেন্টের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো সম্পর্ক নেই। নিরপেক্ষ নিরাপত্তা মূল্যায়নের ভিত্তিতেই ভেন্যু ও সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সব অংশগ্রহণকারী দেশের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।”
বিসিবির ব্যর্থ ক্রিকেট কূটনীতি
আইসিসির বোর্ড সভায় বাংলাদেশের দাবির পক্ষে এক পাকিস্তান ছাড়া কোনো দেশই অবস্থান নেয়নি, এটি বাংলাদেশের ক্রিকেট কূটনীতিতে এক বড় পরাজয়। ভারতের বিপক্ষে গিয়ে পাকিস্তানের সমর্থন, যা ভারত-পাকিস্তান রাজনৈতিক বৈরিতার বাস্তবতায় খুব একটা ব্যতিক্রমী কিছু নয়। আশ্চর্যের বিষয়, যে শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তাব বাংলাদেশ দিয়েছিল, সেই শ্রীলঙ্কাও এই প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নেয়নি। এমনকি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও ক্রিকেটীয় বন্ধুত্বের দেশ হিসেবে পরিচিত জিম্বাবুয়েও কোনো সমর্থন জানায়নি।
এই ভোটাভুটির ফলাফল স্পষ্ট করে দিয়েছে—বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট রাজনীতিতে কার্যকর কোনো জোট গড়ে তুলতে পারেনি। নিরাপত্তা ঝুঁকি, ভেন্যু পরিবর্তন কিংবা হাইব্রিড মডেলের যুক্তি—সবকিছুই কাগজে যুক্তিসংগত হলেও, সেগুলো বোর্ডরুমে কনভিন্সিং কেস হিসেবে দাঁড় করাতে ব্যর্থ বিসিবি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আইসিসির নিজস্ব নিরাপত্তা মূল্যায়ন টিম মাঠপর্যায়ে কিছু ঝুঁকির কথা উল্লেখ করলেও বিসিবি সেই জায়গাটিকে সিদ্ধান্তের পর্যায়ে নেওয়ার মতো চাপ তৈরি করতে পারেনি। এখানে প্রশ্ন উঠছে—যদি নিরাপত্তা টিম ঝুঁকির কথা বলেই থাকে, তাহলে কেন তা আইসিসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হলো না? উত্তর একটাই—বাংলাদেশ সেই ঝুঁকিকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
অন্যদিকে, ভারত ও তাদের ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই–এর ক্ষেত্রে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ভারত অতীতে নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক কারণ দেখিয়ে ভেন্যু পরিবর্তনের দাবি তুললে, সেটিকে সমর্থন করার মতো দেশ এবং বোর্ড তারা পাশে পেয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোতেও দাবি করা হয়েছে, বড় দেশগুলোকে নিজেদের অবস্থানে আনতে তারা সফল হয়েছে। কিন্তু একই পথে হাঁটতে গিয়ে বাংলাদেশ কেন ব্যর্থ হলো—এই প্রশ্নই এখন বিসিবির কূটনৈতিক দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে দিয়েছে। এই ব্যর্থতা শুধু একটি সভা বা একটি সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনের দীর্ঘদিনের দূরদৃষ্টি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগহীনতারই প্রতিফলন। তবে, প্রশ্নের জায়গা থেকেই যায় যে ক্রিকেট পরাশক্তি ভারতের সাথে এই বৈরিতা বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য কতটা ক্ষতি বয়ে আনবে?
ভবিষ্যতের সংকট ও ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি
বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের বাদ পড়ার প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ হবে আর্থিকভাবে। এই সিদ্ধান্তে বিসিবির মোট আয়ের অর্ধেকের বেশি অংশ, যা মূলত আইসিসি থেকে আসে, অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, বিশ্বকাপে অংশ না নিলে বাংলাদেশ প্রায় ৩৩০ কোটি টাকা আয়ের সুযোগ হারাবে। কেবল অংশগ্রহণ ফি নয়, বরং ম্যাচ ফি, পারফরম্যান্স বোনাস, প্রাইজমানি, সম্প্রচার এবং স্পনসরশিপ—সবই হাতছাড়া হবে। মাঠের লড়াইয়ে অংশ না নেওয়ায় ক্রিকেটাররাও ব্যক্তিগতভাবে বড় অংকের ম্যাচ ফি ও বোনাস থেকে বঞ্চিত হবেন।
আর্থিক ক্ষতি কেবল বিসিবি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বেসরকারি সম্প্রচার মাধ্যম এবং বিজ্ঞাপনী সংস্থা প্রায় ৪০০ কোটি টাকার লোকসানের মুখে পড়তে পারে। স্পনসরদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় এবং দর্শকদের বিমুখতা এই ক্ষতির মূল কারণ। এছাড়া আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, বিশ্বকাপ বয়কট বৈধ কারণ প্রমাণ করতে না পারলে বিসিবিকে প্রায় ২৪.৫ কোটি টাকা জরিমানা গুণতে হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির পরিধি আরও বিস্তৃত। আইসিসির ভবিষ্যৎ রাজস্ব বণ্টন নীতিতে বাংলাদেশের বরাদ্দ কমে যাওয়ার এবং আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী ফোরামে বাংলাদেশের ভোটাধিকার সীমিত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বাতিল হলে আয়ের আরেকটি বড় উৎস বন্ধ হয়ে যাবে। সব মিলিয়ে, একটি নীতিগত অবস্থানের কারণে আর্থিক ও প্রশাসনিকভাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এখন এক ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জের মুখে। বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম আগেই জানিয়েছিলেন, বিসিবির মোট আয়ের ৫৫–৬০ শতাংশ আসে আইসিসি আয়োজিত বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট থেকে। প্রতিটি টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট ফি প্রদান করা হয় এবং পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে বোনাসের সুযোগ থাকে। টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেললে এই সমস্ত আয়ের খাত একটিও অর্থই বিসিবির কাছে পৌঁছাবে না, যা দেশের ক্রিকেট ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
এর পাশাপাশি সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও নীরব আঘাত আসবে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে। টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে অংশ না নিলে বাংলাদেশের র্যাংকিং পয়েন্টে বড় ধরনের পতন কার্যত অনিবার্য। এই টুর্নামেন্ট শুধু শিরোপার লড়াই নয়; এটি র্যাংকিং পয়েন্ট সংগ্রহের অন্যতম প্রধান মঞ্চ। সেখানে না খেললে বাংলাদেশ শুধু পয়েন্ট হারাবে না, বরং অন্য দলগুলো এগিয়ে যাবে—ফলে ব্যবধান আরও বাড়বে।
র্যাংকিংয়ে এই পতনের সরাসরি প্রভাব পড়বে ভবিষ্যৎ সূচি নির্ধারণে। শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে, বিশেষ করে যারা নিজেদের প্রস্তুতি ও বাণিজ্যিক গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে প্রতিপক্ষ নির্বাচন করে। এতে বাংলাদেশের ম্যাচ সংখ্যা যেমন কমতে পারে, তেমনি কমে যাবে বড় দলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলার সুযোগ।
এর ফলাফল আরও গভীরে যাবে। র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়লে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বড় টুর্নামেন্টগুলোর মূল আলোচনার বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। আইসিসির ভবিষ্যৎ ইভেন্ট পরিকল্পনা, সম্প্রচার সূচি কিংবা বিপণন কৌশলে বাংলাদেশের গুরুত্ব কমে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তখন বাংলাদেশ প্রান্তিক অংশগ্রহণকারী হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।
বর্তমান যুগে ক্রিকেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংস্করণ টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট, আর সেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে না পারা বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ক্যারিয়ারে নিঃসন্দেহে প্রভাব ফেলবে অতিমাত্রায়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তো বটেই, বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা বিদেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি লীগগুলোতে যে ব্রাত্য হয়ে হয়ে পড়বেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রভাব কেবল বর্তমান দলের খেলোয়ারদের পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে না। কম ম্যাচ, কম প্রতিযোগিতা এবং কম আন্তর্জাতিক উপস্থিতির ফলে তরুণ ক্রিকেটারদের বিকাশ ব্যাহত হবে। দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতিযোগিতামূলক মান ও গ্রহণযোগ্যতা—দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
আইসিসির ক্ষতি কেমন?
বাংলাদেশকে ছাড়া টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আয়োজন হলে সেটি আইসিসির জন্যও ক্ষতির কারণ হবে—এমনটাই মনে করেন বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ না খেললে প্রায় ২০ কোটি দর্শক হারাতে পারে এই টুর্নামেন্ট। তবে বাস্তবতা হলো, বিশ্বকাপের সম্প্রচার ও স্পনসরশিপ স্বত্ব আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। ফলে সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে আইসিসির চেয়ে বেশি পড়তে হবে সম্প্রচারক প্রতিষ্ঠান ও বিজ্ঞাপনদাতাদের। এছাড়াও, ভারত–বাংলাদেশ রাজনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েনের জেরে দুই দেশের মধ্যে ট্যুরিস্ট ভিসা সার্ভিস বন্ধ রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপে অংশ নিলেও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দর্শকদের পক্ষে ভারতে গিয়ে খেলা দেখা কার্যত অসম্ভব ছিল।
এই পুরো ঘটনায় দায় শুধু আইসিসির ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে সত্যের পুরোটা বলা হবে না। আইসিসির ক্ষমতার রাজনীতির প্রভাব যেমন দায়ী, তেমনি বিসিবির দুর্বল কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে ব্যর্থতা এবং সিদ্ধান্তগুলো যৌক্তিকভাবে উপস্থাপনে অক্ষমতাও বড় কারণ। টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের বাদ পড়া একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক দুর্বলতার ফল। মাঠের বাইরের খেলায় শক্ত না হলে, মাঠের ভেতরের অর্জনও যে টেকসই হয় না—এই ঘটনা আবারও সেটাই প্রমাণ করল।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়া শুধু একটি টুর্নামেন্ট মিস করার ঘটনা নয়। এটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান, বিসিবির কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং আইসিসির নীতিগত নিরপেক্ষতা—সবকিছুকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই সংকট থেকে শিক্ষা না নিলে ভবিষ্যতে এমন ক্ষতির পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিনই হবে।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে