শুভেন্দুর রাজনীতিতে উত্থান: তৃণমূল নেতা থেকে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী
প্রায় ১৫ বছর ধরে চলা তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের ইতি টেনে অপেক্ষা এবং সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী।
কলকাতায় শুক্রবার (৮ মে) বিকেলে বিজেপির নির্বাচিত বিধায়কদের বৈঠকে অধিকারীকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করেন অমিত শাহ। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহচর এবং ‘পরিবর্তন’ আন্দোলনের প্রধান মুখগুলোর একজন ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। ২০১১ সালের ক্ষমতা পরিবর্তনের পেছনে নন্দীগ্রাম আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
রাজনৈতিক জীবনে পদার্পণ
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় মূলত কংগ্রেস দলের হাত ধরে ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে। তাঁর বাবা শিশির অধিকারী একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ হওয়ায়, ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির আবহে বেড়ে ওঠেন তিনি। কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন ছাত্র পরিষদ দিয়ে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়। ১৯৯৫ সালে তিনি প্রথমবার কাঁথি পৌরসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের কাউন্সিলর হিসেবে জয়লাভ করেন। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর, তিনি এবং তাঁর পরিবার কংগ্রেসে ছেড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে যোগ দেন। ২০০৬ সালে তিনি প্রথমবার কাঁথি দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন। পরবর্তীকালে তিনি তমলুক কেন্দ্র থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন এবং রাজ্য সরকারের পরিবহণ মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মোড় ছিল নন্দীগ্রামের ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ আন্দোলন, যা তাঁকে তৃণমূলের ক্ষমতায় আসার অন্যতম প্রধান সেনাপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। পরবর্তীতে ২০২০ সালে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন এবং ২০২১ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতার দায়িত্ব পালন করছেন।
রাজনীতিতে শুভেন্দুর সাফল্যের সূচনা
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে শুভেন্দু অধিকারীর সাফল্যের সূচনা এবং উত্থান মূলত তৃণমূল কংগ্রেসে থাকাকালীন পূর্ব মেদিনীপুরে তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতা এবং নন্দীগ্রাম আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। ২০০৬ সালের বিধানসভা ভোটে দক্ষিণ কাঁথি কেন্দ্র থেকে জিতে প্রথমবারের জন্য বিধায়ক হন শুভেন্দু অধিকারী। এরপর আসে ২০০৭। বলা চলে এই বছর থেকেই গোটা রাজ্যে ব্যাপকভাবে পরিচিতি পান শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠে অধিকারী পরিবারের মেজ ছেলে। ২০০৭ সালে ২৫ নভেম্বর নন্দীগ্রামে তৃণমূল কর্মীদের উপর হামলার অভিযোগ ওঠে সিপিএমের বিরুদ্ধে। সেই সময় অধিকারী পরিবার পাল্টা কর্মসূচির মূল কেন্দ্রে ছিল।
এরপর ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে শুভেন্দুর নেতৃত্বে সিপিএমকে হারিয়ে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদ দখল করে তৃণমূল কংগ্রেস। ওই বছরই মদন মিত্রকে সরিয়ে শুভেন্দু অধিকারীকে যুব তৃণমূলের সভাপতি করেন মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়। ২০০৯ সালে পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বী লক্ষ্মণ শেঠকে হারিয়ে তমলুক থেকে প্রথমবারের জন্য সাংসদ হন শুভেন্দু অধিকারী। সে বছর কাঁথি পুরসভার চেয়ারম্যান পদেও বাবার স্থলাভিষিক্ত হন শুভেন্দু। এরপর আসে ২০১১ সাল। পশ্চিমবঙ্গে ঘটে ক্ষমতার পালাবদল। বামেদের হারিয়ে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস। মেদিনীপুরে বাড়ে অধিকারী পরিবারের দাপট। ২০১৪ সালে প্রত্যাশা মতোই পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি তমলুক কেন্দ্র থেকে জেতেন শুভেন্দু অধিকারী। তবে এরপরেই শুরু হয় ডামাডোল। আচমকাই শুভেন্দুকে যুব তৃণমূলের সভাপতি পদ থেকে সরিয়ে সৌমিত্র খাঁকে বসান মমতা। একইসঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ‘যুবা’ নামে একটি সমান্তরাল সংগঠনও তৈরি করা হয়। সেই সময় প্রথম দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি 'শুভেন্দুর ক্ষোভ'এর খবর সামনে আসে।
তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন
শুভেন্দু অধিকারী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের বা টিএমসির মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়, যা ২০২০ সালের শেষদিকে চূড়ান্ত রূপ নেয় এবং এখনও অব্যাহত রয়েছে। ২০১৬ সালে নন্দীগ্রাম থেকে বিধায়ক হয়ে মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় জায়গা হয় অধিকারী পরিবারের এই ছেলেটির। কিন্তু এরপর ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় তৃণমূলের ফল ভাল না হওয়ায় পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব থেকে শুভেন্দুকে সরানো হয়।
এমনকি, ২০২০-র অগস্টে তৃণমূলের রাজ্য সরকারি কর্মী সংগঠনের দায়িত্ব থেকে সরানো হয় শুভেন্দুকে। পাশাপাশি, তুলে দেওয়া হয় জেলা পর্যবেক্ষকের পদও। মনে রাখতে হবে, এই সময় একাধিক জেলার পর্যবেক্ষক পদে ছিলেন শুভেন্দু। সেই পদগুলিও হারান তিনি। শুভেন্দু অধিকারীর পিতা, শিশির অধিকারী, দীর্ঘদিন ধরে কাঁথির তৃণমূল সাংসদ ছিলেন, তবে শুভেন্দু দলত্যাগের পর পরিবারের সঙ্গে তৃণমূলের সম্পর্কেও স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়।
তৃণমূল ত্যাগ করে বিজেপিতে যোগদান
শুভেন্দু অধিকারী ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে তৃণমূল কংগ্রেস ত্যাগ করে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-তে যোগদান করেছিলেন, যা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই পদক্ষেপটি ছিল ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূলের জন্য একটি বড় ধাক্কা। ২৬ নভেম্বর শুভেন্দু হুগলি রিভার ব্রিজ কমিশনার্সের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ২৭ নভেম্বর তিনি রাজ্যের পরিবহণ মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
এরপর ১৬ ডিসেম্বর তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য(এমএলএ) হিসেবেও পদত্যাগ করেন। ১৭ ডিসেম্বর তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯ ডিসেম্বর: কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে মেদিনীপুরের এক জনসভায় তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগ দেন। তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধ, বিশেষ করে অভিষেক ব্যানার্জীর উত্থানকে কেন্দ্র করে শুভেন্দু অধিকারীর দলত্যাগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এরপর ২০২১ সালে ফের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম থেকেই জয়ী হন শুভেন্দু অধিকারী। সেইবার মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়কে হারিয়ে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম তোলেন তিনি। পরবর্তীতে হন বিরোধী দলনেতা এবং ক্রমশ রাজ্য বিজেপির অন্যতম প্রধান ‘মুখ’ হয়ে ওঠেন তিনিই।
মুখ্যমন্ত্রিত্বের লড়াইয়ে এগিয়ে ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের প্রেক্ষিতে এবং বিজেপির অন্দরমহলের খবর অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রিত্বের লড়াইয়ে শুভেন্দু অধিকারী সবচেয়ে এগিয়ে থাকার পেছনে বেশ কিছু প্রধান কারণ রয়েছে।২০২১ সালের পর ২০২৬ সালেও নন্দীগ্রামের পাশাপাশি ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করার ফলে শুভেন্দু অধিকারী বিজেপির অন্যতম 'নায়ক' হিসেবে উঠে এসেছেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এবং দল ও দলের বাইরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তিনি তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে আসার পর নিজের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করেছেন এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন তৃণমূল নেতা হিসেবে পরিচিত।
এছাড়াও রাজ্যে বিজেপি বিরোধী দলের নেতা হিসেবে তিনি তৃণমূলের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও তীব্র রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন। দলের ভেতরের বিভিন্ন গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশে তিনি বিজেপিকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিয়েছেন। মূলত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বারবার প্রমাণিত হওয়া এবং দলের অন্দরে সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে শুভেন্দু অধিকারীই বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রথম পছন্দের তালিকায় ছিলেন।
উল্লেখ্য, শুভেন্দু অধিকারী তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় অংশ জুড়ে তৃণমূলের হয়ে কাজ করলেও, বর্তমানে বিজেপির তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। শাসকদলের বিরুদ্ধে কড়া মনোভাব এবং সাংগঠনিক ক্ষমতার কারণে তিনি বিরোধী রাজনীতির অঙ্গনে নিঃসন্দেহে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অপরিহার্য নাম।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে