সুপ্রিম কোর্টের মামলাও নিষ্পত্তি হবে আদালতের বাইরে, প্রস্তুত লিগ্যাল এইড
বাংলাদেশের বিচার মানেই যেন বছরের পর বছর অপেক্ষা। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে একই চিত্র। এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের বারান্দায় অসংখ্য মানুষের দীর্ঘশ্বাস, একের পর এক তারিখ, আইনজীবীর ফি, জেলা থেকে রাজধানীতে বারবার ছুটে আসার ক্লান্তি- অনেকটা স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এমনও হয়, যে টাকার জন্য মামলা করা হয়েছে শেষ পর্যন্ত সেই টাকার চেয়ে অনেক বেশি খরচ হয়ে যায় মামলা চালাতে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে চালু হচ্ছে আদালতের বাইরে মামলা নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিস বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে এ কার্যক্রাম পরিচালনা করবে।
মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার রমজানপুর গ্রামের এক নারীর ৩ লাখ টাকার দেনমোহরের মামলার গত ২ বছর যাবৎ হাইকোর্টে বিচারাধীন। মামলাটি নিষ্পত্তি হতে আরও কতদিন সময় লাগবে বলতে পারছে না তার আইনজীবীও। এই সময়ে তাকে বারবার মাদারীপুর থেকে ঢাকায় আসতে হচ্ছে। যাতায়াত, থাকা, খাওয়া ও আইনজীবীর খরচ- সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ সইতে হচ্ছে ওই নারীকে। অথচ দুই পক্ষকে একটি টেবিলে বসিয়ে মাত্র কয়েক মিনিটের আলোচনায় যদি সমাধান সম্ভব হয় তাহলে কি সেই দীর্ঘ বিচারযাত্রার প্রয়োজন থাকে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) বা আদালতের বাইরে আপস-মীমাংসার ব্যবস্থা চালু হচ্ছে। বহু বছর ধরে জেলা পর্যায়ে চালু থাকা এই ব্যবস্থা এবার দেশের সর্বোচ্চ আদালতের লিগ্যাল এইড শাখাতেও চালু হলে বিচারপ্রার্থীর ভোগান্তি কমার পাশাপাশি মামলার জট হ্রাস এবং আদালতের সময়কে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ৪৫ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন। এই বিশাল চাপ সামাল দিতে সরকার বিচারব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নিচ্ছে। সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী শুধু সুপ্রিম কোর্টে মোট বিচারাধীন মামলা ৫ লাখ ৬১ হাজার ৪৪টি। এর মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে ৫ লাখ ২২ হাজার ৩৩১টি মামলা বিচারাধীন আছে। এসব মামলার মধ্যে দেওয়ানি ১ লাখ ১ হাজার ১৬৮ ও ফৌজদারি ৪ লাখ ২১ হাজার ১৬৩টি। এছাড়া আপিল বিভাগে ৩৮ হাজার ৭১৩টি বিচারাধীন মামলার মধ্যে দেওয়ানি ২১ হাজার ৬৫২ ও ফৌজদারি ১৭ হাজার ৬১টি মামলা। অন্যদিকে লিগ্যাল এইড অফিস ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত মোট ২ লক্ষ ৩০ হাজার ৫০৩টি মামলা নিষ্পত্তি করেছে। এ অবস্থায় মামলা জট কমাতে সুপ্রিম কোর্টেও শুরু হচ্ছে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থা।
সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসের প্রধান কর্মকর্তা ইমতেয়াজুল ইসলাম ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, বর্তমানে সারা দেশের মতো সুপ্রিম কোর্টেও লাখ লাখ মামলা ঝুলে আছে বিচারের অপেক্ষোয়। প্রতিদিই নতুন মামলা আসছে শত শত। এ অবস্থায় সুপ্রিম কোর্টেও মামলা নিষ্পত্তির জন্য সেই উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে এডিআর। জেলা লিগ্যাল এইড পারিবারিক, দেওয়ানি, বাটোয়ারা এমনকি কিছু ফৌজদারি বিরোধও মধ্যস্থতার মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি করেছে। সুপ্রিম কোর্টের এই ব্যবস্থা চালু হচ্ছে, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর ফলে সর্বোচ্চ আদালতেও মামলা জট কমতে শুরু করবে, ভোগান্তি দূর হবে বিচারপ্রার্থীদের।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টে এডিআর চালুর ক্ষেত্রে এখন আর কোনো আইনি কোনো বাধা নেই। বিষয়টি প্রধান বিচারপতির নজরে আনার পর প্রয়োজনীয় প্রস্তাব তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে শুধু চার ধরনের পারিবারিক বিরোধে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও কিছু আপসযোগ্য ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা এই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। প্রস্তাব অনুযায়ী প্রথম ধাপে দেনমোহর, ভরণপোষণ, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জিম্মাসংক্রান্ত বিরোধ এডিআরের আওতায় আসতে পারে। পাশাপাশি যৌতুক দাবি, পিতামাতার ভরণপোষণ এবং যৌতুকের কারণে সাধারণ আঘাতের কিছু মামলাও যুক্ত করার চিন্তাভাবনা চলছে। আরও পরে আপসযোগ্য দণ্ডবিধির কিছু ধারা এবং দেওয়ানি প্রকৃতির বাটোয়ারা ও ঘোষণামূলক মামলাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।’ মন্ত্রী জানান, এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো- বিচারিক ক্ষমতা আদালতের কাছেই থাকবে। লিগ্যাল এইড শুধু দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসাবে। সমঝোতা হলে তার প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে পাঠানো হবে, আর সমঝোতা না হলে মামলাটি আগের নিয়মেই চলবে। অর্থাৎ আদালতের কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ন রেখেই বিচারপ্রার্থীদের জন্য দ্রুত সমাধানের একটি অতিরিক্ত পথ তৈরি হবে।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকার নেত্রী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ এ ব্যাপারে ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘আদালতে জেতা-হারার লড়াইয়ের চেয়ে অনেক সময় আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান সমাজের জন্য বেশি ইতিবাচক। স্বামী-স্ত্রীর ছোটখাটো বিরোধ কিংবা সামান্য জমি নিয়ে বিরোধও বছরের পর বছর আদালতে ঝুলে থাকে। এতে কেবল অর্থ নয়, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক মর্যাদা এবং মানসিক শান্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এডিআর সেই অচলাবস্থা ভাঙতে পারে। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তবতার প্রশ্নও সামনে চলে এসেছে। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসে একজন কর্মকর্তা এবং মাত্র পাঁচজন কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন। অবকাঠামোও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অফিসে দীর্ঘদিন কম্পিউটার পর্যন্ত ছিল না। প্রয়োজনীয় কক্ষ, রেকর্ড সংরক্ষণ ব্যবস্থা কিংবা সেবাগ্রহীতাদের জন্য মৌলিক সুযোগ-সুবিধাও এখনও সীমিত। এডিআর চালু হলে সারা দেশ থেকে আরও বেশি মানুষ এই অফিসে আসবেন। তখন এই সীমিত জনবল দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা কতটা সম্ভব হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।’
এদিকে লিগ্যাল এইডের প্যানেল আইনজীবীদের অবস্থাও খুব স্বস্তিদায়ক নয় বলে জানা গেছে। একটি মামলা বছরের পর বছর পরিচালনা করেও একজন আইনজীবী মাত্র ছয় হাজার টাকা সম্মানী পান। ফলে অধিকাংশই আর্থিক লাভের জন্য নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই এই কাজে যুক্ত থাকেন। অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিমের মতে, আইনজীবীদের নির্দিষ্ট অংশের কাজ প্রো বোনো বা বিনামূল্যে আইনি সেবা হিসেবে বাধ্যতামূলক করা গেলে লিগ্যাল এইড আরও শক্তিশালী হবে। তিনি মনে করেন, শুধু নতুন ব্যবস্থা চালু করলেই হবে না। লিগ্যাল এইডের আইনজীবী নিয়োগে আরও স্বচ্ছতা এবং প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতি প্রয়োজন। দক্ষ আইনজীবী এবং যথাযথ সম্মানী নিশ্চিত না করলে এডিআরের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ধারণা নতুন নয়। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালতের লিগ্যাল এইড শাখায় এই ব্যবস্থা চালু হলে সেটি বিচারপ্রার্থীদের জন্য একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। দীর্ঘ মামলা, অনিশ্চয়তা এবং বিপুল ব্যয়ের পরিবর্তে যদি আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত ও গ্রহণযোগ্য সমাধান পাওয়া যায় তাহলে উপকৃত হবেন বিচারপ্রার্থী, স্বস্তি পাবে আদালত, আর কিছুটা হলেও কমবে বিচারব্যবস্থার দীর্ঘদিনের মামলার পাহাড়।’
মতামত দিন