Views Bangladesh Logo

তত্ত্বে স্পেনকে থামানো সহজ, বাস্তবে যেন গোলকধাঁধা

বিশ্বকাপের ফাইনাল শুধু দুটি দলের লড়াই নয়, দুটি ফুটবল দর্শনেরও সংঘর্ষ। একদিকে ইউরোপীয় কৌশল, অন্যদিকে লাতিন আমেরিকান সৃজনশীলতা। তবে এই দুই ধারার মাঝেও স্পেন ও আর্জেন্টিনার একটি বড় মিল আছে—দুই দলই বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ম্যাচের ছন্দ গড়তে ভালোবাসে। তাই নিউ জার্সিতে ২০ জুলাই (বাংলাদেশ সময় রাত ১টা) অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফাইনালকে ঘিরে কৌশলগত লড়াই নিয়েও চলছে বিস্তর আলোচনা।

এই আলোচনার মাঝেই স্পেনের সাবেক কোচ হুলেন লোপেতেগি এমন একটি মন্তব্য করেছেন, যা ফুটবলবিশ্বের দৃষ্টি কেড়েছে। তার ভাষায়, স্পেনকে উচ্চ প্রেসিংয়ে আটকে ফেলার পরিকল্পনা শুনতে যত সহজ, বাস্তবে তা কার্যকর করা ততটাই কঠিন। বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে লোপেতেগির বিশ্লেষণ— বল দখল, জ্যামিতিক পাসিং আর ব্যক্তিগত দক্ষতাই স্প্যানিশদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

আট বছর আগের স্মৃতি, কিন্তু ভিন্ন বাস্তবতা
লোপেতেগির কথার পেছনে রয়েছে বাস্তব অভিজ্ঞতা। ২০১৮ সালে মাদ্রিদের নতুন মেত্রোপলিতানো স্টেডিয়ামে তার অধীনেই স্পেন ৬-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল লিওনেল মেসিহীন আর্জেন্টিনাকে। সেই ম্যাচে স্প্যানিশদের পাসিং, বল দখল আর মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এতটাই নিখুঁত ছিল যে, অনেকের কাছেই মনে হয়েছিল আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা যেন ছায়ার পেছনে ছুটছে।

তবে সেই ম্যাচের সঙ্গে বিশ্বকাপ ফাইনালের কোনো তুলনা টানতে নারাজ ৫৯ বছর বয়সী এই স্প্যানিশ কোচ।

লোপেতেগির মতে, প্রীতি ম্যাচে কৌশল পরীক্ষা করা যায়, কিন্তু বিশ্বকাপের ফাইনাল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানসিক ও প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতা। এখানে প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি সিদ্ধান্ত ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।

ফ্রান্সের বিপক্ষে স্পেনের আধিপত্য
স্পেনের শক্তির সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে সেমিফাইনালে। গত দুই বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নেয় লা রোজা। আরও বিস্ময়কর বিষয়, কিলিয়ান এমবাপ্পেদের মতো আক্রমণভাগকে প্রায় পুরো ম্যাচই নিষ্ক্রিয় করে রাখে স্পেন। ফ্রান্স ৮০ মিনিট পার হওয়ার আগে লক্ষ্যে উল্লেখযোগ্য শটই রাখতে পারেনি।

ম্যাচ শেষে ফরাসি শিবিরের কয়েকজনের মত ছিল, শুরু থেকেই আরও ওপরে উঠে স্পেনকে চেপে ধরা উচিত ছিল। কিন্তু লোপেতেগির মতে, বিষয়টি কাগজে-কলমে যতটা সহজ মনে হয়, মাঠে বাস্তবতা ঠিক ততটাই ভিন্ন।

শুধু একজন নয়, পুরো ব্যবস্থাকে থামাতে হয়

লোপেতেগির ব্যাখ্যায়, স্পেনের বিপক্ষে প্রেসিং মানে একজন মিডফিল্ডার বা একজন ডিফেন্ডারকে চেপে ধরা নয়। বরং বল যে কোনো মুহূর্তে যাদের কাছে যেতে পারে, সেই একাধিক খেলোয়াড়কে একই সঙ্গে সঠিক দূরত্ব, সঠিক সময় ও নিখুঁত সমন্বয়ে ঘিরে ফেলতে হয়।

এ কাজের জন্য প্রয়োজন পুরো দলের সম্মিলিত শৃঙ্খলা। একজনের সামান্য ভুল অবস্থানও স্পেনের জন্য নতুন পাসিং লেন খুলে দেয়। আর একবার সেই ফাঁক তৈরি হলে স্প্যানিশরা মুহূর্তের মধ্যেই চাপ কাটিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে পৌঁছে যেতে পারে।

ব্যক্তিগত দক্ষতাও বড় অস্ত্র
লোপেতেগি মনে করেন, স্পেনের সাফল্য শুধু দলগত সমন্বয়ে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের অনেক ফুটবলার ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দিয়েও কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন।

চাপের মুখে প্রথম স্পর্শ, শরীরের ভারসাম্য, দ্রুত সিদ্ধান্ত কিংবা ছোট জায়গায় বল নিয়ন্ত্রণ—এসব গুণ স্প্যানিশ ফুটবলারদের আলাদা করে তোলে। ফলে প্রতিপক্ষ পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রেসিং করলেও অনেক সময় সেই চাপ ভেঙে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয় স্পেন।

ফাইনালে কার কৌশল সফল হবে?
স্পেন ও আর্জেন্টিনা—দুই দলই বল দখলে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করতে ভালোবাসে। তবে নিচ থেকে ধৈর্য ধরে আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে স্পেনকে সামান্য এগিয়ে রাখছেন লোপেতেগি। তার মতে, প্রতিপক্ষ যত বেশি প্রেসিং করবে, স্পেন তত বেশি ফাঁকা জায়গা খুঁজে বের করার সুযোগ পাবে।

এ কারণেই বিশ্বকাপের ফাইনাল শুধু ট্রফির লড়াই নয়, হবে কৌশল, ধৈর্য, বলের নিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতারও পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় কে শেষ পর্যন্ত সফল হবে—স্পেনের জ্যামিতিক পাসিং, নাকি আর্জেন্টিনার সৃজনশীলতা—তার উত্তর মিলবে নিউ জার্সির সবুজ গালিচায়।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ