Views Bangladesh Logo

মাননীয় প্রতিমন্ত্রী, আপনার বক্তব্য নাগরিকদের জন্য লজ্জার

Rased Mehedi

রাশেদ মেহেদী

দুজন বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করা হলো। তদন্ত হলো, অভিযোগপত্র দাখিল হলো, বিচারিক আদালতে মামলা গেল, রায় হলো। উচ্চতর কর্তৃপক্ষ সেই রায় বহাল রাখল, রাজকীয় ফরমান জারি হলো, তারপর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলো। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কোনো ধাপে বাংলাদেশ রাষ্ট্র কিছুই জানল না। জানল সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি আর গণমাধ্যমের খবর থেকে, যখন নজরুল ইসলাম আবদুল বশীর ও সিতি আক্তার আর বেঁচে নেই।

এরপর আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বললেন, এই মৃত্যুদণ্ড প্রবাসীদের জন্য ‘বড় শিক্ষা’। প্রবাসীদের যে দেশে থাকেন, সে দেশের আইন মেনে চলতে হবে। একই বক্তব্যে তিনি স্বীকার করলেন, সৌদি সরকার বিস্তারিত কিছু জানায়নি, মিশনও অবগত ছিল না, বাংলাদেশ চিঠি দিয়ে তথ্য চেয়েছে।

অর্থাৎ রাষ্ট্রের হাতে মামলার নথি নেই, অভিযোগের বিবরণ নেই, তাঁরা আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন কি না সেই তথ্যও নেই। তবু উপসংহার তৈরি: ‘এটি শিক্ষা।’ প্রশ্নটা এখানেই। শিক্ষাটা আসলে কার জন্য?

প্রবাসীদের জন্য শুধুই উপদেশ!
বিদেশে গিয়ে সে দেশের আইন মানতে হবে, এ কথা কেউ অস্বীকার করে না। কিন্তু একজন মন্ত্রীর কাছে প্রবাসী নাগরিকেরা নীতিবাক্য শুনতে চান না। তাঁরা জানতে চান, বিপদে পড়লে তাঁদের রাষ্ট্র পাশে দাঁড়াবে কি না। দূতাবাস ও কনস্যুলেট থাকে ঠিক এই কাজের জন্য।

কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী কোনো বিদেশি নাগরিক আটক হলে, তিনি চাইলে তাঁর দেশের কনস্যুলেটকে দেরি না করে জানানোর বাধ্যবাধকতা আছে। কনস্যুলার কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করার অধিকারও আছে। সৌদি আরব এই কনভেনশনের পক্ষভুক্ত দেশ। তাহলে দুটি সম্ভাবনার একটি সত্য।

প্রথম সম্ভাবনা, সৌদি কর্তৃপক্ষ আটক থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত কোনো পর্যায়ে বাংলাদেশকে জানায়নি। তাহলে এটি আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার স্পষ্ট লঙ্ঘন। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রথম কাজ ‘শিক্ষা’ ঘোষণা করা নয়, কূটনৈতিকভাবে কঠোর প্রতিবাদ জানানো।

দ্বিতীয় সম্ভাবনা, কোনো না কোনোভাবে তথ্য এসেছিল, কিন্তু মিশন বা শ্রম কল্যাণ উইং তা গুরুত্ব দেয়নি বা অনুসরণ করেনি। তাহলে ব্যর্থতা আমাদের নিজেদের।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেতরেই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা বলছেন, আটকের পর এত দ্রুত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা নয়। দুজনের পক্ষে কেউ মিশনে যোগাযোগ করেননি কেন, সেটিও প্রশ্ন। প্রশ্নগুলো সঠিক। কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে এসব প্রশ্নের জবাব নেই। আছে কেবল প্রবাসীদের প্রতি সতর্কবার্তা।

অভিযোগের ভাষা বদলে গেল কীভাবে
আরেকটি বিষয় লক্ষ করার মতো। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে অপরাধের বর্ণনা ছিল অস্পষ্ট: মসজিদে ‘অনৈতিক’ বা ‘অশালীন’ কাজ। কোন মসজিদ, ঠিক কী ঘটেছিল, দুজনের সম্পর্ক কী ছিল, কিছুই স্পষ্ট নয়। বিদেশি গণমাধ্যমও বলছে, তাঁরা বিবাহিত ছিলেন কি না নিশ্চিত নয়।

অথচ আমাদের প্রতিমন্ত্রী শ্রম উইংয়ের একটি বার্তার বরাতে প্রকাশ্যে ‘ব্যভিচার’ শব্দটি ব্যবহার করলেন। নিজের নাগরিক সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক নথি হাতে না পেয়েই রাষ্ট্রের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি এমন গুরুতর নৈতিক তকমা দিলেন। এর দায় পড়ল দুই মৃত মানুষের কাঁধে, আর তাঁদের পরিবারের কাঁধে, যারা দেশে বসে এখন সামাজিক লজ্জা আর শোক একসঙ্গে বইবে।

প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব কি বিদেশি সরকারের ভাষ্যের মুখপাত্র হওয়া? নাকি নিজের নাগরিকের পক্ষে তথ্য যাচাই করা, ন্যায়বিচার হয়েছে কি না খতিয়ে দেখা?

তা’জির, অর্থাৎ বিবেচনামূলক শাস্তি
সৌদি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী এই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে ‘তা’জির’ হিসেবে। এটি শরিয়াহর নির্ধারিত হদ্দ শাস্তি নয়, বিচারকের বিবেচনামূলক শাস্তি। অর্থাৎ আইনে মৃত্যুদণ্ড বাধ্যতামূলক ছিল না। আদালত বিবেচনা করে সর্বোচ্চ সাজা বেছে নিয়েছে।

একটি ‘অনৈতিক কাজ’, যেখানে কেউ খুন হননি, কেউ আহত হননি, তার জন্য প্রাণদণ্ড কতটা সমানুপাতিক? আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডে মৃত্যুদণ্ড কেবল ‘সবচেয়ে গুরুতর অপরাধে’, মূলত ইচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রে সীমিত রাখার কথা বলা হয়। বাংলাদেশ নিজে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে, তাই নৈতিক উচ্চাসন থেকে কথা বলার সুযোগ আমাদের সীমিত। কিন্তু অন্তত এই প্রশ্ন তোলার অধিকার আমাদের আছে: আমাদের নাগরিক কি আইনজীবী পেয়েছিলেন? দোভাষী পেয়েছিলেন? তিনি যে ভাষায় জবানবন্দি দিয়েছেন, তা কি বুঝেছিলেন? আপিলে তাঁর পক্ষে কেউ লড়েছিলেন কি?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না জেনে ঘটনাকে ‘শিক্ষা’ বলা মানে কার্যত প্রক্রিয়াটিকে বৈধতা দেওয়া।

একটি ভিডিও, একমাত্র প্রমাণ
দু-একটি গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, এই মামলায় দুজনের বিরুদ্ধে প্রমাণ বলতে ছিল কেবল একটি ভিডিও। ভিডিওটি ধারণ করেছিলেন একজন পাকিস্তানি নাগরিক। দুটি মানুষের জীবন শেষ পর্যন্ত ঝুলেছে মোবাইল ফোনে ধারণ করা এই একটি দৃশ্যের ওপর!

এখানেই প্রশ্নগুলো আরও গভীর হয়। ভিডিওটি কতটা দীর্ঘ ছিল, এর আগে-পরে কী ঘটেছিল, সেটি কি সম্পাদিত বা খণ্ডিত ছিল, তার ফরেনসিক যাচাই কি হয়েছিল? ভিডিওধারণকারী কেন, কোন উদ্দেশ্যে মসজিদের ভেতরে এই দৃশ্য ধারণ করলেন? তাঁর সঙ্গে অভিযুক্তদের কোনো পূর্বপরিচয়, বিরোধ বা স্বার্থের সম্পর্ক ছিল কি না, আদালত কি তা খতিয়ে দেখেছে? অভিযুক্তরা কি ভিডিওটি চ্যালেঞ্জ করার, নিজেদের ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন?

এখানে একটি বৈপরীত্যও চোখে পড়ার মতো। ইসলামি আইনে ব্যভিচারের হদ্দ শাস্তির জন্য প্রমাণের মানদণ্ড অত্যন্ত কঠোর: চারজন প্রত্যক্ষদর্শী অথবা স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি। এই কঠোরতা রাখা হয়েছে যাতে সন্দেহ, গুজব বা একক সাক্ষ্যে কারও জীবন না যায়। এই মামলায় সেই হদ্দের পথে যাওয়া হয়নি, শাস্তি দেওয়া হয়েছে তা’জিরের আওতায়, যেখানে প্রমাণের মানদণ্ড শিথিল। অর্থাৎ প্রমাণের কঠোর শর্ত এড়িয়ে যাওয়া হলো, অথচ শাস্তি হলো সর্বোচ্চটাই। একজন বিদেশি নাগরিকের ধারণ করা একটি ভিডিও তাই হয়ে উঠল মৃত্যুদণ্ডের একমাত্র ভিত্তি।

একক ডিজিটাল প্রমাণের ভিত্তিতে প্রাণদণ্ড যেকোনো বিচারব্যবস্থাতেই গুরুতর প্রশ্ন তোলে। আর বাংলাদেশ রাষ্ট্র যেহেতু পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে অন্ধকারে ছিল, ভিডিওটির পুনর্মূল্যায়ন চাওয়া, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দিয়ে যাচাইয়ের দাবি তোলা কিংবা ক্ষমার আবেদন করার কোনো সুযোগই সে নেয়নি। একটি ভিডিওর বিপরীতে দুজন মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিল না।

অন্য দেশ কী করে
মধ্যপ্রাচ্যে যেসব দেশের বিপুল শ্রমশক্তি কাজ করে, তাদের অনেকেই নিজের নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড ঠেকাতে সক্রিয় কূটনীতি চালায়। আইনজীবী নিয়োগ, মামলার নিয়মিত তদারকি, রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ে ক্ষমার আবেদন, প্রয়োজনে রক্তপণ পরিশোধে সহায়তা, এমন উদাহরণ এ অঞ্চলেই আছে। শ্রমিক পাঠানো দেশ হিসেবে তারা জানে, নাগরিকের জীবন দর-কষাকষির টেবিলে তোলার মতো বিষয়।

২০১০ সালে দুবাইয়ে একজন পাকিস্তানি নাগরিককে হত্যার দায়ে ছয়জন বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিল সে দেশের আদালত। তখন আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ই জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাঁদের জীবন রক্ষা করে দেশে ফিরিয়ে এনেছিল। আজ তাহলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যর্থ হলো কেন? ব্যর্থতা আড়াল করতেই কি প্রতিমন্ত্রীর উপদেশমূলক বাণী আর হতভাগ্যদের মাথায় ‘ব্যভিচারের’ তকমা?

বাংলাদেশের জন্য সৌদি আরব সবচেয়ে বড় শ্রমবাজারগুলোর একটি। প্রবাসী আয়ের বড় অংশ আসে সেখান থেকে। আমরা প্রবাসীদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলি। যোদ্ধা যখন বিপদে পড়েন, তখন রাষ্ট্রের কণ্ঠে যদি কেবল উপদেশ শোনা যায়, তাহলে সেই উপাধি নিছক অলংকার হয়ে যায়।

একই সপ্তাহে দুই রকম সুর
একই সপ্তাহে সৌদি আরবে বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তাঁদের মরদেহ দ্রুত দেশে আনতে প্রতিমন্ত্রী সৌদি রাষ্ট্রদূতের সহায়তা চেয়েছেন। সেটি যথাযথ পদক্ষেপ। কিন্তু মক্কার ঘটনায় একই রাষ্ট্রের সুর বদলে গেল। নিহত শ্রমিক রাষ্ট্রের সহানুভূতি পান, আর অভিযুক্ত শ্রমিক পান নৈতিক শিক্ষার উদাহরণ হওয়ার ভাগ্য।

অভিযুক্ত হলেই কেউ নাগরিকত্বের সুরক্ষা হারান না। বরং অভিযুক্ত অবস্থায়, বিদেশের আদালতে, অচেনা ভাষায় বিচারের মুখোমুখি হওয়া মানুষটিরই রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বেশি দরকার।

যা করা উচিত ছিল, যা এখনো করা যায়
প্রথমত, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে কেবল ‘তথ্য চেয়ে চিঠি’ নয়, কনস্যুলার নোটিফিকেশন না দেওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানানো দরকার।

দ্বিতীয়ত, আটক থেকে দণ্ড কার্যকর পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার নথি সংগ্রহ করে প্রকাশ করা উচিত, যাতে জানা যায় তাঁরা ন্যায্য বিচার পেয়েছিলেন কি না।

তৃতীয়ত, যে ভিডিওর ভিত্তিতে দণ্ড দেওয়া হয়েছে, সেটি আদালতে কীভাবে যাচাই হয়েছিল, ভিডিওধারণকারীর সাক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কীভাবে বিবেচিত হয়েছিল, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে তার আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়া দরকার।

চতুর্থত, জেদ্দা কনস্যুলেট ও রিয়াদ দূতাবাসের শ্রম উইং কেন জানল না, তার স্বাধীন তদন্ত দরকার। গাফিলতি থাকলে দায় নির্ধারণ করতে হবে।

পঞ্চমত, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর কারাগারে এই মুহূর্তে কতজন বাংলাদেশি মৃত্যুদণ্ড বা গুরুতর দণ্ডের মুখোমুখি, তার পূর্ণ তালিকা তৈরি করে প্রত্যেকের জন্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

ষষ্ঠত, দুই পরিবারের সঙ্গে রাষ্ট্রের যোগাযোগ, মরদেহ ফেরত বা অন্তত দাফনের তথ্য পাওয়া, এবং তাঁদের সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় সংবেদনশীল আচরণ নিশ্চিত করা দরকার।

শেষ কথা
শিক্ষা একটা আছে, ঠিকই। কিন্তু সেটি প্রবাসীদের জন্য যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি রাষ্ট্রের জন্য। দুজন নাগরিক আটক থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পুরো পথ পেরিয়ে গেলেন, আর তাঁদের রাষ্ট্র জানতেই পারল না। এই ঘটনা থেকে যদি কারও শিক্ষা নেওয়ার থাকে, তবে তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের, আমাদের মিশনগুলোর, আর সেই মন্ত্রীর, যিনি নথি হাতে আসার আগেই রায় মেনে নিয়েছেন।

প্রবাসী শ্রমিকেরা দেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখেন। বিনিময়ে তাঁরা চান কেবল এটুকু ভরসা, বিপদে পড়লে রাষ্ট্র তাঁদের নাম জানবে, তাঁদের পাশে দাঁড়াবে। সেই ভরসা ভেঙে গেলে কোনো উপদেশ দিয়েই তা জোড়া লাগানো যাবে না।

রাশেদ মেহেদী
সম্পাদক, ভিউজ বাংলাদেশ

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ