স্প্যানিশ আর্মাডার বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন যাত্রা শুরু আজ
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু দল আছে, যাদের নাম উচ্চারিত হলেই ফুটবলপ্রেমীদের চোখে ভেসে ওঠে সৌন্দর্য, শৈল্পিকতা আর আধিপত্যের ছবি। স্পেন সেই তালিকার উজ্জ্বলতম নাম। একসময় ‘টিকিটাকা’ ফুটবলের জাদুতে পুরো বিশ্বকে মুগ্ধ করা দলটি আবারও বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামছে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে আজ নিজেদের যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে শৈল্পিক ফুটবলের সঙ্গে ঝড়ের গতিতে আক্রমনে অভ্যস্ত নতুন স্প্যানিশ আর্মাডা। তাদের প্রথম প্রতিপক্ষ বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া আফ্রিকার দল কেপ ভার্দে।
সোমবার (১৫ জুন) বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে দুই দল। শক্তি আর সামর্থে স্পেন অনেক এগিয়ে থাকলেও বিশ্বকাপের মঞ্চে কোনো প্রতিপক্ষকেই হালকাভাবে নিচ্ছেন না কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তিনি ম্যাচটিকে দেখছেন অত্যন্ত গুরুত্ব হিসেবে।
স্পেনের বর্তমান দলটি যেন অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের এক অসাধারণ মিশ্রণ। ২০০৮ ইউরো, ২০১০ বিশ্বকাপ এবং ২০১২ ইউরো জয়ের ঐতিহাসিক কীর্তির পর ২০২৪ সালে আবারও ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধার করে লা রোজারা। সেই ধারাবাহিকতাকে বিশ্বকাপের মঞ্চেও ধরে রাখতে চায় তারা।
দলের মাঝমাঠের সবচেয়ে বড় ভরসা বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার রদ্রি। ম্যানচেস্টার সিটির এই ডিপ-লাইং মিডফিল্ডার শুধু বল নিয়ন্ত্রণই করেন না, পুরো দলের ছন্দও নিয়ন্ত্রণ করেন। তার সঙ্গে থাকবেন বার্সেলোনার সৃজনশীল মিডফিল্ডার পেদ্রি এবং তরুণ তারকা গাভি। আক্রমণ গঠন, পাসিং এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার ক্ষেত্রে এই ত্রয়ী স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
আক্রমণভাগে স্পেনের সবচেয়ে আলোচিত নাম অবশ্যই লামিন ইয়ামাল। মাত্র কিশোর বয়সেই বিশ্ব ফুটবলে আলোড়ন তোলা এই উইঙ্গারকে ঘিরে সমর্থকদের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। ডান প্রান্ত থেকে তার গতি, ড্রিবলিং এবং গোল তৈরির ক্ষমতা যেকোনো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। বাম প্রান্তে থাকবেন নিকো উইলিয়ামস, যিনি গত দুই বছরে ইউরোপের অন্যতম ভয়ংকর উইঙ্গারে পরিণত হয়েছেন। গত ২২ এপ্রিল বার্সেলোনার হয়ে খেলতে গিয়ে চোট পেয়েছিলেন তিনি। ফলে তার বিশ্বকাপ খেলা নিয়েও তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা। কিন্তু সব উদ্বেগ দূর করে এখন পুরোপুরি ফিট এই তরুণ ফরোয়ার্ড।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে স্পেন কোচ দে লা ফুয়েন্তে বলেন, ‘সবচেয়ে ভালো খবর হলো লামিন এখন শতভাগ প্রস্তুত। আমরা তাকে যে অবস্থায় দেখতে চেয়েছিলাম, সে ঠিক সেই অবস্থাতেই আছে। নিকো উইলিয়ামস ও ভিক্টর মুনোজও ভালো আছে। সবাই খেলার জন্য প্রস্তুত।’ যদিও কোচ ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রথম ম্যাচে ইয়ামালকে পুরো ৯০ মিনিট খেলানো নাও হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে ব্যবহার করা হবে।
স্পেনের সম্ভাব্য আক্রমণভাগে আরও থাকছেন ইউরো ২০২৪ ফাইনালের নায়ক মিকেল ওয়ারজাবাল। সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে তার গোল করার দক্ষতা এবং বড় ম্যাচে পারফর্ম করার সামর্থ্য স্পেনকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে। বিকল্প হিসেবে রয়েছেন আলভারো মোরাতা এবং দানি ওলমোর মতো অভিজ্ঞ তারকারাও।
রক্ষণভাগেও রয়েছে নির্ভরতার প্রতীক কয়েকজন ফুটবলার। বাম প্রান্তে খেলবেন মার্ক কুকুরেল্লা, যিনি আক্রমণ ও রক্ষণ—দুই দায়িত্বই সমান দক্ষতায় পালন করেন। সেন্টার ডিফেন্ডার রবিন লে নরমঁ, পাও কুবারসি এবং দানি ভিভিয়ানের মতো ফুটবলাররা আছেন। গোলবারের নিচে স্পেনের ভরসা অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের উনাই সিমন।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচটি স্পেনের জন্য শুধু তিন পয়েন্ট পাওয়ার লড়াই নয়; এটি পুরো বিশ্বকাপের জন্য নিজেদের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ। নতুন প্রজন্মের ইয়ামাল, গাভি, পেদ্রি আর অভিজ্ঞ রদ্রি, ওয়ারজাবাল, কুকুরেল্লাদের সমন্বয়ে গড়া এই দলটিকে এবার দেখা হচ্ছে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে।
২০১০ সালে জাভি হার্নান্দেসের যাদুকরি ফুটবল আর আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার পায়ে ভর করে যে স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকায়, সেই স্বপ্ন যুক্তরাষ্ট্রে আবারও জাগিয়ে তুলেছে নতুন প্রজন্মের স্প্যানিশ আর্মাডা। এখন দেখার বিষয়, টিকিটাকার উত্তরসূরিরা কি পারেন স্পেনকে এনে দিতে দ্বিতীয় বিশ্বকাপের সোনালি মুকুট।

মতামত দিন